https://www.emjanews.com/

7937

sylhet

প্রকাশিত

০১ আগস্ট ২০২৫ ১৮:৩৭

সিলেট

হাওরের মাছই তাদের জীবিকা

প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৫ ১৮:৩৭

মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার কাউয়াদিঘী হাওরবেষ্টিত গ্রামগুলোয় জীবনের সব ব্যস্ততা মাছ ঘিরে।

মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার কাউয়াদিঘী হাওরবেষ্টিত গ্রামগুলোয় জীবন শুরু হয় জাল হাতে। কাউয়াদীঘি হাওর জেলার অন্যতম একটি মিঠাপানির জলাশয়। হাওর-সংস্কৃতিতে হাওরপারের মানুষের কাছে মাছ জীবিকার একটি বড় উপায়। বংশ পরম্পরায় অনেকেরই পেশা মাছ শিকার। রাজনগরের কাউয়াদিঘী হাওর ঘেঁষা চানপুর, চেতরগাঁও, পশ্চিমভাগ, জামিরগাঁও প্রভৃতি গ্রামে অধিকাংশ মানুষ হাওরনির্ভর পেশায় জড়িত। সঠিক চাষযোগ্য জমির অভাবে মাছ ধরা তাদের প্রধান জীবিকা। ভোর হতেই পুরুষেরা নৌকা আর জাল হাতে নামেন হাওরের পানিতে। সারা দিন ধরে চলে মাছ ধরার অভিযান, আর সন্ধ্যায় যে মাছ উঠে, তা দিয়েই চলে পরিবারের দিনরাত।যেন হাওরের জলে বাধা জেলেদের জীবন।

জালের ফাঁকে অনিশ্চয়তা: হাওরে মাছ ধরার কাজ যতটা রোমাঞ্চকর, তার চেয়েও বেশি কষ্টসাধ্য। প্রতিদিন মাছ মিলবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বর্ষা মৌসুমে জলভরা হাওর কিছুটা আশার প্রতীক হলেও শুষ্ক মৌসুমে তা হয়ে ওঠে মরুভূমি। অনেক সময় শিশু-কিশোররাও মাছ ধরার কাজে নেমে পড়ে। স্কুল বাদ দিয়ে তারা যায় নৌকা টানতে। পরিবারের টিকে থাকার সংগ্রামে তাদেরও অংশ নিতে হয়।

চানপুর গ্রামের লুৎফুর রহমান (৪৫) পেশায় একজন মৎস্যজীবী। দুই দশক ধরে হাওরের জলে ভাসছে তাঁর জীবনের নৌকা। তিনি বলেন, “আমার ছেলেটা চাইতো স্কুলে যেতে। ফাইভ পর্যন্ত পড়াইছি, এরপর ওকেও সঙ্গে নিতে হইছে। মাছ বেচে যা পাই, তাতে কারেন্ট বিল-চাল-চিকিৎসা কিছুই হয় না।” লুৎফুরের স্ত্রী রাবেয়া বলেন, “মেয়েরা স্কুলে যায় না। সকালে ভাত রান্না করে, তারপর মাছ কুড়ায়। আমরা চাই না ওরাও এই কষ্টটা পাক।” এই পরিবার দৈনিক মাছ বিক্রি করে গড়ে ৬০০-৭০০ টাকা আয় করে। কিন্তু অনেক দিন এক কেজিও মাছ ওঠে না।

শিশুদের স্বপ্ন হাওরে ভেসে যায়: অভাবের তাড়নায় অনেক শিশুই পড়াশোনা ছেড়ে দেয়। তাদের ছোট হাতেও তুলে দেওয়া হয় জাল। শিশুশ্রম এবং শিক্ষাবঞ্চনা এই এলাকায় একটি প্রচ্ছন্ন বাস্তবতা, যার প্রতিকার নেই বললেই চলে।
সহায়তা নেই, বিকল্পও নেই: বর্ষা মৌসুমে মাছের প্রজননকালে জাল ফেলা নিষিদ্ধ হলেও সরকারের পক্ষ থেকে বিকল্প কোনো সহায়তা কার্যকরভাবে পৌঁছে না। ফলে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে অনেকে বাধ্য হয়ে মাছ ধরেন। এতে প্রাকৃতিক ভারসাম্য যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তেমনি দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রও ঘনীভূত হয়।

জলবায়ু বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হাওরবাসী: হাওর এলাকার জীবন প্রকৃতিনির্ভর। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বর্তমানে আগের মতো মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। হাওরের গভীরতাও কমছে। ফলে বছরে মাছ ধরা সময় কমে যাচ্ছে, বাড়ছে অভাব।

আলোর খোঁজে কিছু উদ্যোগ: এ অবস্থার মাঝেও অনেকে খাঁচায় মাছ চাষ, হাঁস-মুরগি পালন কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসার দিকে ঝুঁকছেন। তবে এসব উদ্যোগ টেকসই করতে দরকার প্রশিক্ষণ, অর্থায়ন ও বাজারসংযোগ।
রাজনগর উপজেলার বর্তমান মৎস্য কর্মকর্তা এ.কে.এম মহসীন বলেন, “হাওরাঞ্চলের জেলেরা আমাদের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে যাচ্ছেন। সরকার প্রতি বছর প্রজনন মৌসুমে নিষেধাজ্ঞা জারি করে এবং কিছু পরিমাণে ভিজিএফ চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়।

তিনি আরও বলেন, “আমরা জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান, প্রশিক্ষণ ও খাঁচায় মাছ চাষের বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করছি। অনেকেই ধীরে ধীরে এই দিকে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।

মৌলভীবাজারের জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. শাহনেওয়াজ সিরাজী বলেন, এবারের বন্যায় হাওরে বেশি পানি হওয়ায় দেশি জাতের ছোট মাছ প্রচুর পরিমাণে ধরা পড়ছে। জেলার হাওরগুলোতে দীর্ঘ সময় পানি থাকার সুবাদে মাছের উৎপাদন আরও বাড়বে বলে তিনি আশা করেন।

জালেই তাদের জীবনবিন্দু: কাউয়াদিঘী হাওরের মানুষ রোজ জাল ফেলে নতুন আশায়। কখনো খালি হাতে ফেরে, কখনো অল্প কিছু পেয়ে খুশি হয়। জীবনের এই নৌকা টেনে তোলা কঠিন, কিন্তু থেমে যাওয়া তাদের অভিধানে নেই।
হাওরের পানির মতোই তাদের জীবনও টলমল। তবু প্রতিদিন তারা জালের ফাঁকে খোঁজে নতুন সকাল, নতুন পেট ভরানোর আশা।