অতিথি পাখির কিচিরমিচিরে ঘুম ভাঙ্গে না হাওর পাড়ের মানুষদের
নেপথ্যে অবাধে পাখি শিকার ও বনভূমি উজাড় হওয়ার প্রভাব
প্রকাশ: ২৭ নভেম্বর ২০২৫ ১৯:১৪
ছবি: সংগৃহিত
বিয়ানীবাজার উপজেলার ৩টি ইউনিয়নের বেশিরভাগ এলাকাই মুড়িয়া হাওর ঘেষা। হাওর পাড়ের মানুষেরা শুকনো মৌসুমে ধান এবং সবজি উৎপাদন এবং বর্ষা মৌসুমে হাওর থেকে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করেন। শীতকালে তাদের কাছে অতিথির আগমন ঘটে। বছরের এই সময়টাতে হাওরপাড়ের মানুষের ঘুম ভাঙতো অতিথি পাখির কিচিরমিচির ডাকে। কিন্তু বিগত ২ বছর থেকে মুড়িয়া হাওরের কোথাও দেখা মিলছে না অতিথি পাখির। জলাশয়, জলাধার, খাল, বিল, নদী-নালা যাই বলি না কেন, এখন আর কোনো স্থানেই অতিথি পাখির কলরব নেই।
গত ২ বছর আগেও উপজেলার বিভিন্ন বিল, ঝিল, নদীনালা ও খালগুলোতে শীতের মৌসুম আসতে না আসতেই নানা রকম ও নানা আকৃতির অতিথি পাখিতে আনাগোনা থাকতো। প্রকৃতিবিনাশী বিয়ানীবাজারে পাখিরা কিচিরমিচির করতে যেন অভিমান করেছে।
এখানকার বনভূমি উজাড় হচ্ছে, কংক্রিটের ভারে তলিয়ে যাচ্ছে ঘাসভরা মাটি। ফসলের ক্ষেত দখল করছে কীটনাশক। উন্নয়নের কাছে প্রতিবছর হারিয়ে যাচ্ছে অসংখ্য গাছ। ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে পাখিদের কোলাহলমুখর সবুজ দুনিয়া।
বিয়ানীবাজারের গ্রামাঞ্চলে এখন আর আগের মতো পাখির ডাকে মানুষের ঘুম ভাঙে না। বাড়ির আঙিনায় পাখিদের কিচিরমিচির ডাক, গাছের ডালে ডালে ঝাঁক বেঁধে উড়ে আসা পাখিদের সেই কলকাকলি নেই। অথচ একসময় ছিল যখন গাছে গাছে, ঝোপে-ঝাড়ে, মাঠে-ঘাটে, বিলে-ঝিলে, বাগানে কিংবা বাড়ির আঙিনায় দোয়েল, টিয়া, ঘুঘু, কাক, কোকিলসহ বিভিন্ন দেশি প্রজাতির বিচরণ চোখে পড়তো।
উপজেলার চিরচেনা অভয়ারণ্যগুলোতেও এবার পাখির বিচরণ নেই। শীতের আমেজ শুরু হলেই উপজেলার মুড়িয়ার হাওরসহ ছোট-বড় বিলে বিভিন্ন অতিথি পাখির ঢল নামতো। আশ্বিন মাসের শেষের দিকে হাওর ও বিলের পানি শুকাতে শুরু করেলে সেখানে পুঁটিসহ ছোট ছোট মাছ খেতে ঝাঁকে ঝাঁকে নামতো অতিথি পাখি। নভেম্বরের শেষ দিকে রেশমি শীতের ছোঁয়া গায়ে লাগিয়ে আবারো ভবঘুরে হয় অতিথি পাখিগুলো। কিন্তু বর্তমানে আশঙ্কাজনক হারে অতিথি পাখি আসার হার কমে গেছে।
আইন অনুযায়ী, অতিথি পাখি ধরা আর শিকার নিষিদ্ধ হলেও বিয়ানীবাজারের বিভিন্ন এলাকায় শিকার করা হয় পাখি।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, শিকারিরা ধান ক্ষেতগুলোতে নানা ধরনের রাসায়নিক বিষ প্রয়োগ করেই পাখিদের কাবু করে। পাশাপাশি আছে জালের মাধ্যমে পাতা ফাঁদ, যেগুলোতে খুব সহজেই পাখি ধরা পড়ে।
প্রকৃতিপ্রেমী আবুল হাসান বলেন, ‘বছরের সময়টাতে অতিথি পাখি দেখতে মুড়িয়া হাওরে ছুটে যেতাম। পাখির কলতানে হাওরের পরিবেশটা অন্যরকম লাগলো কিন্তু গত বছর মুড়িয়া হাওরের দুবাগে গিয়ে দেখি অতিথি পাখি আসেনি।’
মুড়িয়া হাওরের ছোটদেশ গ্রামের শাহীন আহমদ বলেন, ‘শীতের শুরুতে আমাদের গ্রামে প্রায় প্রতিদিন গাছেই অতিথি পাখি এসে বসতো। বিকেলবেলা হাওরের পানিতে তাদের গোসল করার দৃশ্য দেখে যে কারো ভালো লাগবে। তাছাড়া সকালে ঘুম ভাঙতো পাখির কিচিরমিচির ডাকে। একটা অন্যরকম ভালো লাগতো। কিন্তু বছর আমাদের হাওরে অতিথি পাখির বিচরণ দেখতে পাইনি। এবছরও এখনো পর্যন্ত অতিথি পাখি আসেনি।’
দুবাগ গ্রামের বাসিন্দা খসরু উদ্দিন বলেন, ‘অতিথি পাখি আসবে কিভাবে আমরা যদি তাদের অভয়ারণ্য ধ্বংস করে দেই। হাওরে উৎপাদিত ধানের উপর অতিরিক্ত হারে কীটনাশক প্রয়োগ করার কারণে পাখি মারা যায়। তাছাড়া অবাধে পাখি শিকার বন্ধ করতে পারেনি প্রশাসন। সেজন্য অতিথি পাখি আসা কমে গেছে। পাখিরা যেসব গাছে বসে থাকতো সেইসব গাছ কাটা হয়েছে। আমার মনে হয় সেই কারণে এবছর এখন পর্যন্ত অতিথি পাখি দেখতে পাচ্ছি না।’
বিয়ানীবাজার উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ মবিন হাই বলেন, ‘আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া, নগরায়ন, বনাঞ্চল উজাড়, জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ দূষণ, নির্বিচারে গাছ কাটা, জমিতে কীটনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহার, পাখির বিচরণ ক্ষেত্র, বাসস্থান ও খাদ্য সংকট, অবাধ শিকার ও আইনের সঠিক প্রয়োগ না থাকা এবং যথাযথ সংরক্ষণের অভাবই পাখি বিলুপ্তির মূল কারণ।’
উপজেলা প্রাণিসম্পদ সম্প্রসারণ কর্মকর্তা ডা. শামীম হোসেন জানান, নির্বিচারে বন-জঙ্গল কেটে আবাসভূমি হ্রাস করা হচ্ছে। এর ফলে পাখির বিচরণ ও বৈচিত্র্য কমে যাচ্ছে।
বিয়ানীবাজার উপজেলা নির্বাহী অফিসার গোলাম মুস্তাফা মুন্না বলেন, ‘অতিথি পাখিরা এ এলাকায় এসে তাদের প্রয়োজনীয় খাবার আগের মতো পায় না। শীতের কারণেই কিন্তু অতিথি পাখিগুলো এ এলাকায় আসতো। জলবায়ুর পরিবর্তনও এলাকায় অতিথি পাখির বিচরণ কমে যাওয়ার একটি উল্লেখযোগ্য কারণ।’
