ঘন কুয়াশায় সিলেট বিএনপি : ক্রমেই ঘোলাটে হচ্ছে রাজনীতি আর ভোটের মাঠ
প্রকাশ: ০১ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৪:১০
সিলেটের বিএনপিতে যেন এখন ঘন কুয়াশার চাদর নেমে এসেছে। চারদিকে ধোঁয়াশা, বিভ্রান্তি আর জটিলতার এমন স্তূপ তৈরি হয়েছে যে, রাজনীতির মাঠ যেমন ঘোলাটে, তেমনি ভোটের মাঠও ক্রমেই দ্বিধা-দ্বন্দ্বের দিকে ঢলে পড়ছে। নির্বাচনের ঢোল বাজতেই দলীয় হাইকমান্ড যখন প্রার্থী মনোনয়ন দিতে শুরু করল, তখন সিলেটের ছয়টি আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত করতে গিয়ে প্রায় গলদঘর্ম হতে হয়েছে কেন্দ্রকে। তবুও সব আসনে প্রার্থী ঘোষণা সম্ভব হয়নি; দুটি আসন এখনো ফাঁকা। সেখানে চলছে ‘আমিই প্রার্থী’ দাবির নীরব প্রতিযোগিতা। অন্যদিকে যেসব আসনে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে, তার কয়েকটিতে আবার উঠেছে ‘রিভিউ’র সুর। এমন পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ পুরনো ফাটল সামনে চলে এসেছে নতুন করে।
তার উপর আরও এক ধুম্রজাল ছড়িয়ে পড়েছে- সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি কে? নাছিম না লোদী? পরপর দুটি বিপরীতধর্মী বিজ্ঞপ্তির পর তৃণমূলের সাধারণ নেতাকর্মীরা যেন বুঝে উঠতে পারছেন না কার গোলার ধান কার গোলায় যাচ্ছে, কার চেয়ারে কে বসছে, কাকে অভিভাবক মানবেন বা কার পক্ষে মাঠে নামবেন।
নগর বিএনপির সভাপতি প্রসঙ্গ : বিজ্ঞপ্তিতে বিজ্ঞপ্তি, বিভ্রান্তিতে নেতাকর্মী
সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি পদ নিয়ে বিরাজ করছে জটিলতা। ২৬ ও ২৭ নভেম্বর পরপর দুটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হওয়ায় তৃণমূল নেতাকর্মীরা দ্বিধায় পড়ে যান, বর্তমানে সভাপতির দায়িত্বে কে আছেন—নাছিম হোসেইন, নাকি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী?
২৬ নভেম্বর রাতে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভীর স্বাক্ষরে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়—সিলেট মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি নাছিম হোসেইনের প্রাথমিক সদস্যসহ সকল পর্যায়ের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর নাছিম হোসেইন দাবি করেন, তিনি পূর্বে সভাপতি ছিলেন কিন্তু দায়িত্বে ছিলেন না; স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের মাধ্যমে তিনি দায়িত্ব ফিরে পেয়েছেন।
কিন্তু পরদিন ২৭ নভেম্বর একই নেতার স্বাক্ষরেই আরেকটি বিজ্ঞপ্তি আসে, যেখানে বলা হয়—ভুলবশত আগের বিজ্ঞপ্তিতে নাছিম হোসেইনের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের বিষয়টি উল্লেখ হয়েছিল, বাস্তবে তার কোনো পদই স্থগিত ছিল না। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, প্রথম তথ্যটি ভুল ছিল—এমনটাই সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়।
২০২৩ সালের ১০ মার্চের সম্মেলনে নির্বাচিত কমিটিতে সভাপতি ছিলেন নাছিম হোসেইন। কিন্তু ২০২৪ সালের ১ আগস্ট তাকে সরিয়ে কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ৪ নভেম্বর ঘোষিত ১৭০ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করা হয় সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক প্যানেল মেয়র রেজাউল হাসান কয়েস লোদীকে। সে কমিটিতে নাছিম হোসেইনের নাম ছিল না।
ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী জানান, ভুলবশত নাছিম হোসেইনের নাম যুক্ত হওয়ায় তৃণমূলে সাময়িক বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছিল, যা ২৭ নভেম্বরের বিজ্ঞপ্তিতে পরিষ্কার করা হয়েছে। তার ভাষ্য, নতুন কোনো পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত কেন্দ্র থেকে আসেনি।
অন্যদিকে নাছিম হোসেইন দাবি করেন, তার পদ কখনোই স্থগিত করা হয়নি, দ্বিতীয় বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি পরিষ্কার হয়েছে। তার বক্তব্য—পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে সভাপতি পদটি ‘শূন্য’ রাখা হয়েছিল, তাই তিনি সভাপতির দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
তবে কেন্দ্রীয় সূত্র বলছে—২০২৪ সালের ৪ নভেম্বর অনুমোদিত পূর্ণাঙ্গ কমিটিই বলবৎ আছে, আর সেই অনুযায়ী বর্তমানে দায়িত্বে রয়েছেন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী। পরিবর্তন এলে কেন্দ্রই তা আনুষ্ঠানিকভাবে জানাবে।
ছয় আসনে ছয় ছবি : কোথাও শূন্যপদ, কোথাও রিভিউয়ের দাবি
সিলেটের ৬টি আসনের মধ্যে চারটিতে এখন পর্যন্ত প্রার্থী ঘোষণা করেছে বিএনপি। একটি আসনে একাধিক প্রার্থী প্রচারণায় ব্যস্ত, আরেকটি আসন নিয়ে চলছে জমিয়তকে ছাড় দেওয়ার গুঞ্জন। কয়েকটি আসনে আবার তৃণমূল নেতাকর্মীরা প্রার্থী পরিবর্তনের দাবি তুলেছেন।
সিলেট-১ আসন
এই মর্যাদাপূর্ণ আসনে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। সভা, সেমিনার ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে তিনি তরুণ ভোটারদের কাছে আধুনিক ভাবনা তুলে ধরছেন। তার প্রয়াত বাবা সাবেক এমপি খন্দকার আবদুল মালিকের ইতিবাচক ইমেজকেও তিনি কাজে লাগাচ্ছেন। প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের জেলা আমীর মাওলানা হাবিবুর রহমানও প্রথমবার এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মাঠ গরম করছেন।
সিলেট-২ আসন
গুম হওয়া বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর স্মৃতি ও ইমেজকে সামনে রেখে জনপ্রিয় অবস্থানে আছেন তার সহধর্মিণী তাহসিনা রুশদীর লুনা। প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন জামায়াতের অধ্যক্ষ আবদুল হান্নান; মাঠে কাজ করছেন তার ছাত্ররাও। এ আসনে খেলাফত মজলিস নেতা মুহাম্মদ মুনতাসির আলীও সক্রিয়।
সিলেট-৩ আসন
এ আসনে যুক্তরাজ্য বিএনপির সভাপতি এম এ মালিক প্রার্থী হলেও জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ূম চৌধুরী ও কেন্দ্রীয় নেতা ব্যারিস্টার এম সালামের অনুসারীরা প্রার্থী বদলের দাবি তুলছেন।
প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা লোকমান আহমদ এ আসনে শক্ত অবস্থানে।
সিলেট-৪ আসন
এ আসনে এখনও আনুষ্ঠানিক প্রার্থী ঘোষণা হয়নি। তবে বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা আরিফুল হক চৌধুরী নিজেকে প্রার্থী দাবি করে প্রচারণায় ব্যস্ত। অপরপক্ষে প্রতিদিন শোডাউন করছেন জেলা বিএনপির উপদেষ্টা আবদুল হাকিম চৌধুরী। মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তালিকায় আছেন কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকীও। এ আসনেও বিএনপি–জামায়াত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার সম্ভাবনা।
সিলেট-৫ আসন
এ আসনে বিএনপি এখনো প্রার্থী ঘোষণা করেনি। জোট হলে আসনটি জমিয়তকে ছাড় দেওয়া হতে পারে—এমন ধারণা তৃণমূলের। জমিয়তের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক প্রচারণায় সক্রিয়। জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন মাওলানা আনোয়ার হোসেন খান।
সিলেট-৬ আসন
মনোনয়ন পেয়েছেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এমরান আহমদ চৌধুরী। বিয়ানীবাজার ও গোলাপগঞ্জে শোডাউন ও প্রচার চালাচ্ছেন তিনি। তবে মনোনয়ন ‘রিভিউ’র প্রত্যাশায় আছেন ২০১৮ সালের প্রার্থী ফয়সল আহমদ চৌধুরীর অনুসারীরা। প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের প্রার্থী মো. সেলিম উদ্দিন মাঠে সক্রিয়।
মহানগর কমিটির ধোঁয়াশা, কয়েকটি আসনে প্রার্থী নিয়ে অনিশ্চয়তা, আর তৃণমূলে রিভিউ দাবির চাপ—সব মিলিয়ে সিলেট বিএনপির রাজনীতিতে ঘন কুয়াশা কাটার কোনো লক্ষণ এখনও স্পষ্ট নয়। বিভ্রান্তি আর জটিলতার এই পরিবেশে তৃণমূলে প্রশ্ন- কুয়াশা কাটিয়ে সূর্য কবে উঠবে? নাকি কুয়াশার চাদর মুড়িয়ে দাঁড়াতে হবে ভোটের লাইনে।
