মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি: প্রেম ও দ্রোহের কবি হেলাল হাফিজ
প্রকাশ: ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৯:১১
ছবি: কবি হেলাল হাফিজ
আনোয়ার হোসেন রনি::
বাংলা কবিতার আকাশে কিছু নাম থাকে, যারা কেবল কবি নন-তারা সময়, তারা চেতনা, তারা প্রজন্মের স্পন্দন। হেলাল হাফিজ ঠিক তেমনই এক নাম। আজ প্রেম ও দ্রোহের এই অমর কবির আজই মৃত্যুবার্ষিকী।
দিনটি ফিরে আসে বেদনাহত হৃদয় নিয়ে, আবার ফিরে আসে গর্ব নিয়েও-কারণ তিনি রেখে গেছেন এমন সব পঙ্ক্তি, যা যুগের পর যুগ মানুষের কণ্ঠে কণ্ঠে ঘুরবে, মিছিলে মিছিলে উচ্চারিত হবে, প্রেমে-বিদ্রোহে অনিবার্য হয়ে থাকবে।
`এখন যৌবন যার, মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়'- এই একটি পঙ্ক্তিতেই যেন ধরা আছে একটি সময়, একটি আন্দোলন, একটি প্রজন্মের রক্তচাপ। আজ আমরা কবি হেলাল হাফিজকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি এবং অনন্তলোকে তাঁর চিরশান্তি কামনা করছি।
শৈশব, শেকড় ও হারানোর বেদনা হেলাল হাফিজ জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৮ সালের ৭ অক্টোবর, নেত্রকোনা জেলার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। তাঁর বাবা খোরশেদ আলী তালুকদার ছিলেন একজন নামকরা শিক্ষক- শিক্ষা ও শৃঙ্খলার কঠোরতায় গড়া মানুষ। মায়ের নাম কোকিলা বেগম। কিন্তু নিয়তি বড় নিষ্ঠুর; মাত্র তিন বছর বয়সেই মায়ের স্নেহছায়া হারান হেলাল হাফিজ।
এই মাতৃবিয়োগের ক্ষত তাঁর জীবনে এক গভীর শূন্যতা তৈরি করে, যা কোনো দিনই পুরোপুরি পূরণ হয়নি। এই শৈশবের অভাবই হয়তো তাঁকে আজীবন একটু মমতা, একটু ভালোবাসার খোঁজে ছুটিয়ে বেড়িয়েছে। কবিতার পঙ্ক্তিতে পঙ্ক্তিতে সেই শূন্যতার আর্তনাদ শোনা যায়। মায়ের অনুপস্থিতি, ভালোবাসার কাঙালপনা- সব মিলিয়েই গড়ে উঠেছে এক সংবেদনশীল কবি মানস।
খেলাধুলা থেকে কবিতার পথে শৈশব ও কৈশোরে হেলাল হাফিজ ছিলেন দুর্দান্ত ক্রীড়াপ্রেমী। ক্রিকেট, ফুটবল, ভলিবল, ব্যাডমিন্টন- সবখানেই তাঁর সমান আগ্রহ। এমনকি নেত্রকোনার মতো মফস্বল শহরে তিনি লন টেনিসও শিখেছিলেন, যা সে সময় ছিল বেশ বিরল। কিন্তু জীবনের গভীর বেদনা তাঁকে ধীরে ধীরে ঠেলে দেয় কবিতার আশ্রয়ে।
কবিতাই হয়ে ওঠে তাঁর মুক্তির পথ, আত্মপ্রকাশের ভাষা, জীবনের সঙ্গে বোঝাপড়ার একমাত্র মাধ্যম। কাগজ-কলমে তিনি ঢেলে দেন অব্যক্ত যন্ত্রণা, প্রেমের উন্মাদনা আর দ্রোহের আগুন।‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ এবং রাতারাতি খ্যাতি ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান বাংলা ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সেই উত্তাল সময়ে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্র হেলাল হাফিজ লিখে ফেললেন এক বিস্ফোরক কবিতা-‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’।
এই একটি কবিতাই তাঁকে রাতারাতি পরিচিত করে তোলে সারাদেশে। আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার মুখে মুখে ফিরতে থাকে তাঁর পঙ্ক্তি। তখন থেকে হেলাল হাফিজ আর কেবল একজন কবি নন-তিনি হয়ে ওঠেন প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলে বসেই গড়ে উঠছিল তাঁর রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক চেতনা। চারপাশে তখন দাপুটে ছাত্রনেতা, আন্দোলনের উত্তাপ, সময়ের ডাক- সবকিছু মিলেই কবিকে তৈরি করছিল ভেতর থেকে। ২৫ মার্চের ভয়াল রাত ও বেঁচে ফেরার গল্প ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ- কালরাত। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বর গণহত্যার সূচনা। সেই রাতে হেলাল হাফিজ ছিলেন ইকবাল হলের বাইরে, নেত্রকোনার এক বন্ধুর সঙ্গে ফজলুল হক হলে আড্ডায়। রাত এগারটার দিকে গুলির শব্দ শুরু হলে আর বের হতে পারেননি।
কারফিউ শেষে ২৭ মার্চ ইকবাল হলে ফিরে যে দৃশ্য তিনি দেখেন, তা ভাষায় প্রকাশের অযোগ্য- ৩০ থেকে ৩৫টি লাশের স্তূপ। মৃত্যুর গন্ধে ভারী বাতাস। কোনোমতে কিছু জিনিসপত্র নিয়ে বের হতেই হলের গেটে দেখা হয় কবি নির্মলেন্দু গুণের সঙ্গে। হেলাল হাফিজকে খুঁজতেই গুণ সেখানে এসেছিলেন। দুঃসময়ের সেই মুহূর্তে দুই কবি একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠেছিলেন। তারপর তাঁরা কেরানীগঞ্জে চলে যান।
এই অভিজ্ঞতা হেলাল হাফিজকে আজীবনের জন্য বদলে দেয়। তাঁর কবিতায় মুক্তিযুদ্ধ আর মানবিক বিপর্যয়ের ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।‘যে জলে আগুন জ্বলে’- এক অনন্য কাব্যগ্রন্থ হেলাল হাফিজের সারা জীবনের সবচেয়ে আলোচিত ও অমর সৃষ্টি ‘যে জলে আগুন জ্বলে’। দীর্ঘ সতেরো বছর কবিতা লেখার পর, ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয় এই বইটি। প্রায় তিনশ’ কবিতা থেকে মাত্র ৫৬টি কবিতা বাছাই করেছিলেন তিনি- এটাই প্রমাণ করে, নিজের লেখার ব্যাপারে তিনি কতটা খুঁতখুঁতে ছিলেন। এই বইয়ের বেশিরভাগ কবিতাই লেখা হয়েছে ঢাকা প্রেস ক্লাবের লাইব্রেরিতে বসে। বইটি প্রকাশের পর পাঠক মহলে যে সাড়া পড়ে, তা ছিল অভাবনীয়। আজ পর্যন্ত বইটির প্রায় ২৬টি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে- বাংলা কবিতার ইতিহাসে যা বিরল ঘটনা। এর বাইরে রয়েছে অসংখ্য অনলাইন সংস্করণ ও পাইরেটেড কপি। এই বইই হেলাল হাফিজকে করে তোলে প্রজন্মের কবি।
খ্যাতির শিখর থেকে স্বেচ্ছা নিঃসঙ্গতা যখন খ্যাতি তাঁর পায়ের নিচে, তখনই হেলাল হাফিজ হঠাৎ করে চলে যান লোকচক্ষুর আড়ালে। দীর্ঘদিন আর কোনো বই প্রকাশ করেননি। কেন এই নীরবতা- প্রশ্ন উঠেছিল বহুবার। এর জবাবে তিনি বলেছিলেন- `আমার কবিতা যখন অসম্ভব জনপ্রিয় হয়ে উঠলো, তখন আমার একটা সন্দেহ জাগলো। আমি চলে গেলে মানুষ কি আমাকে ভুলে যাবে? আমার কবিতা কি টিকবে? সেই পরীক্ষার জন্যই এই জুয়াটুকু খেলেছি।'
এটা ছিল সময়ের ওপর, পাঠকের ওপর, আর নিজের সৃষ্টির ওপর এক অদ্ভুত আস্থা।
প্রেম, নারী ও উদ্ধার হেলাল হাফিজের কবিতায় প্রেম এক অনিবার্য অনুষঙ্গ। তিনি প্রেমে পড়েছেন অসংখ্য নারীর। হেলেন, হিরণবালা, সাবিতা- সবাই বাস্তব মানুষ। কবিতায় তাঁদের রূপ পেয়েছে এক ভিন্ন মাত্রা। তসলিমা নাসরিনকে নিয়ে তাঁর লেখা পঙ্ক্তি আজও আলোচিত- ‘ভালোবেসেই নাম দিয়েছি ‘তনা’,মন না দিলে ছোবল দিও তুলে বিষের ফণা ‘
কবির কাছে নারী ছিল কেবল প্রেমিকা নয়- দুঃসময়ে উদ্ধারকারী। ‘আমাকে স্পর্শ করো, নিবিড় স্পর্শ করো নারী…তোমার স্পর্শেই আমার উদ্ধার।’ হেলাল হাফিজ বিশ্বাস করতেন- শিল্পের জন্য সুখ নয়, প্রয়োজন বেদনা। তিনি বলতেন,‘বেদনা আমার খুব প্রিয়। সুখ আমার জন্য অতটা জরুরি নয়।’ এই দুঃখ থেকেই জন্ম নিয়েছে তাঁর কবিতার গভীরতা। তাঁর বিখ্যাত ‘ফেরিওয়ালা’ কবিতায়।
তিনি বলেন- ‘কষ্ট নেবে কষ্ট,হরেক রকম কষ্ট আছে।’
দীর্ঘ ২৬ বছর পর, ২০১২ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর দ্বিতীয় বই ‘কবিতা একাত্তর’। মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক এই বই আবারও প্রমাণ করে, হেলাল হাফিজ কেবল প্রেমের কবি নন-তিনি ইতিহাসের কবি। ২০১৩ সালে তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কারে ভূষিত হন। তবে অনেকের মতে, এই স্বীকৃতি এসেছে বেশ দেরিতে।
শেষ বেলায় নিঃসঙ্গতার স্বীকারোক্তি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে কবি স্বীকার করেছিলেন- ‘নিঃসঙ্গতা আমার ভালো লাগে… তবে মন তো চায়, কেউ একজন পাশে থাকুক।’- এই কথার ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক চিরনিঃসঙ্গ মানুষের আর্তি।
হেলাল হাফিজ চলে গেছেন, কিন্তু রেখে গেছেন এমন সব পঙ্ক্তি- যা আমাদের আয়নায় চোখ রেখে প্রশ্ন করতে শেখায়: ‘নিউট্রন বোমা বোঝ,মানুষ বোঝ না।’- এই প্রশ্নই তাঁর উত্তরাধিকার।
প্রেম ও দ্রোহের এই কবিকে আমরা ভুলবো না। তাঁর কবিতা আমাদের পথ দেখাবে, সাহস দেবে, ভালোবাসতে শেখাবে। হেলাল হাফিজ- তুমি কবিতার ভেতরেই অমর।
