তেলের আশীর্বাদ থেকে অভিশাপ: ভেনেজুয়েলার উত্থান-পতন ও সাম্প্রতিক সংকট
প্রকাশ: ০৯ জানুয়ারী ২০২৬ ১৮:৩৯
ছবি: সংগৃহীত
সারা বিশ্বে জ্বালানী তেলের বৃহত্তম মজুদ রয়েছে ল্যাটিন আমেরিকার দেশ ভেজেুয়েলায়। তাছাড়া ল্যাটিন আমেরিকার সবচে ধনী ও স্থীতিশীল রাস্ট্রও ছিল ভেনেজুয়েলা। জ্বালানী তেলের জন্যই ভলিভিয়ান বিপ্লবের স্বপ্নদ্রষ্টা হোগো শ্যাভেজ- এর সমাজতান্ত্রিক স্বর্গ মানবিক নরকে পরিনত হয়। একসময় জ্বালানী তেলের ভান্ডার আর্শীবাদের বিপরীতে পরিণত হয় অভিশাপে, কারণ ভূরাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক খেলার বেড়াজালে পড়ে দেশটি। জ্বালানী তেলের মজুদের অনিশ্চয়তার আগ পর্যন্ত বিংশ শতাব্দির শুরুতে কফি, কোকো এবং গবাদি পশুর অনুন্নত কৃষি ভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যাবস্থা ছিল। যেখানে আন্দিজ পর্বতমালার ছায়ায় দেশটি দারিদ্রের মধ্য বাস করতো।
১৯২২ সালের ১৪ ই ডিসেম্বর মারাকাতিব্বয় লেকের তীরে রয়েল-ডাচ সেলের একটি কূপ বিষ্ফোরিত হয়। এক টানা নয় দিন! প্রতিদিন প্রায় ১ লক্ষ ব্যারেল তেল উদগিরন হয়! এই ঘটনা সারা বিশ্বকে জানিয়ে দেয় ভেনেজুয়েলার মাটির নিচে লুকিয়ে আছে তরল সোনার এক মহাসাগর। খবর ছড়িয়ে পড়তেই আমেরিকা ও ইউরোপের তেলের জায়ান্টরা ভেনেজুয়েলায় ছুটে আসেন। রাতারাতি বদলে যায় দেশটির ভাগ্য। ৫০ ও ৬০ এর দশকে ভেনেজুয়েলা বিশ্বের অন্যতম তেল রপ্তানিকারক দেশ। ফলে পেট্রোডলারের স্রোতে দেশটির অর্থনীতি ফুলেফেঁপে উঠে। দেশটির রাজধানী কারাকাস পরিণত হয় ল্যাটিন আমেরিকার এক আধুনিক মেট্টো প্যালেস। বিশাল অট্টালিকা এবং আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন বিলাস বহুল জীবন ব্যাবস্থা। ভেনেজুয়েলা তখন পরিচিত লাভ করে সৌদি ভেনেজুয়েলা নামে। ১৯৭৩ সালে আরব ইসরাইল যুদ্ধের পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম যখন আকাশচুম্বী, তখন ভেনেজুয়েলা তার স্বর্নযুগের শিখরে পৌঁছায়।
১৯৭৬ সালে দেশটি তেল শিল্পকে জাতীয়করণ করে। Petroleos De Venezuela (PDVSA) নামে রাষ্ট্রীয় একটি তেল কোম্পানি গঠন করে। তখন ভেনেজুয়েলার GDP ল্যাটিন আমেরিকার যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি ছিল। এমনকি স্পেনের GDP- কেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু এই প্রাচুর্যের মাঝেই লুকিয়ে ছিল এক মারাত্মক বিপদ। যা অর্থনীতিবিদদের কাছে ডাচ ডিজিজ বা সম্পদের অভিশাপ নামে পরিচিত। আর এই ধারনাটি এসেছিল ১৯৬০ এর দশকে নেদারল্যান্ডের অভিজ্ঞতা থেকে। যেখনে প্রাকৃতিক গ্যাস আবিষ্কারের পর অন্যান্য শিল্পখাত ধ্বংস হয়ে গিওয়ছিল। ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছিল। যখন তেল রপ্তানি করে সহজেই বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করা সম্ভব, তখন কঠিন পরিশ্রম কফি চাষ করা ও টেক্সটাইল কারখানা পরিচালনা করা কে আর অনুভব করে। সে সময় থেকে ভেনেজুয়েলার কৃষি ও উৎপাদন খাত ধীরে ধীরে ধ্বংস হয়ে যায়। একসময় দেশটি নিজের প্রয়েজনীয় খাদ্য শস্য নিজে উৎপাদন করতো সেই দেশ চাল, চিনি থেকে শুরু করে গুড়ো দুধ পর্যন্ত প্রায় সবকিছুই বিদেশ থেকে আমদানী করতো।
সরকারী আয়ের ৯৫ শতাংশ এবং রপ্তানি আয়ের ৯৬ শতাংশ আসতো শুধুমাত্র তেল থেকে। এই একক নির্ভরতার প্রভাব ছিল ব্যপক ভয়াবহ। ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি হয়ে উঠেছিল আন্তর্জাতিক তেলের বাজারের এক অসহায় পুতুল। যখন তেলের বাজারে দামকমে যেত তখন দেশের অর্থনীতি সংকটে পড়তো। এই সংকটের কারনে রাষ্ট্রীয় কোষাগারও খালি হয়ে যেত। যা ৯০ এর দশকে বারবার আঘাত হেনেছে। আর ৮০ দশকে তেলের দামের পতনের কারনে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে পড়ে যা La Decada Perdida বা হাড়ানো দশক নামে পরিচিত।
দেশটির অর্থনীতির আরেকটি অন্ধকার দিক ছিল- সম্পদের বন্টন ব্যবস্থা, যা দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থা। ১৯৫৮ সাল থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত Coal of Puntofijismo নামক আপাত গনতান্ত্রিক ব্যবস্থার শাসন। এটি ডেমোক্রেটিক অ্যাকশন এবং ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক পার্টি এর মধ্যকার ক্ষমতা ভাগাভাগি চুক্তি যেটি পালাক্রমে দেশ শাসন করতো। তবে তেল থেকে অর্জিত অর্থ এই দলের নেতা, তাদের সমর্থক এবং দেশের এক ক্ষুদ্র অভিজাত শ্রেনীর মধ্যে বন্টিত হতো। দুর্নীতি ছিল সর্বব্যাপী। কারাকাসের পূর্বাঞ্চল যখন বিলাসবহুলরা ইউরোপিয়ান ফ্যাশন হাউস থেকে কেনাকাটা করতো এবং নিয়মিত ছুটি কাটাতে যেত। তখন শহরের চারপাশশে গড়ে উঠা বস্তি গুলোতে লক্ষ লক্ষ মানুষ বিদ্যুত, পানি, সেনিটেশনের মত মৌলিক সুবিধা ছাড়াই বসবাস করতো। এই বৈষম্য সাধারন মানুষের কাছে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশার জন্ম দিচ্ছিল। ১৯৮৯ সালে আইএমএফ এর পরামর্শে সরকার জ্বালানীর দাম বাড়ালে কারাকাসে এক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। যা কারাকাসো নামে পরিচিত। সেনাবাহিনী কঠোর হস্তে দাঙ্গা দমন করলে প্রায় প্রায় হাজারের বেশি লোক নিহত হয়। আপাত এই কারাকাসো ছিল ভেনেজুয়েলার স্থীতিশীলতার কফিনে শেষ পেরেক। এটি তেখিয়ে দেয় তেলের উপর নির্ভর অর্থনীতি কতটা ঠুনকো এবং এর ভিত্তি কততা অবিচার এবং বৈষম্যের উপর দাড়িয়ে আছে! জনগন প্রচলিত রাজনীতির উপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছিল। তারা এমন একজন ত্রানকর্তার সন্ধান করছিল যিনি দুর্নীতিগ্রস্থ আভিজাত্যের ক্ষমতা হটিয়ে তাদের কাছে ফিরিয়ে দিবেন এবং দেশের সম্পদকে সাধারন মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করবেন। আর এই ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলে রাজনৈতিক মঞ্চে আবির্ভাব ঘটে এক ক্যারেশম্যাটিক ভাগ্মি নেতার, যিনি রাজনৈতিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তাঁর নাম ছিল হুগো শ্যাভেজ।
আমেরিকা থেকে ভেনেজুয়েলার দূরত্ব ৩০০০ কিলোমিটার। যার মাঝখানে রয়েছে ক্যারাবিয়ন সাগর। এর সুবাদে ৯০ দশক পর্যন্ত ভেনেজুয়েলা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান তেল সরবরাহকারী দেশ। শ্যাভেজ মনে করতেন, তেল কেবল সরকারের নয় সকল ভেজেুয়েলাবাসীর সম্পদ। এই অর্থ দিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সাাজিক কল্যাণ ও দারিদ্রতা হ্রাসে বিনিয়োগ করা। বিদেশী কোম্পানীর কাছে এই তেল থাকলে এর রাজস্ব দেশেই আসেনা। তাই শ্যাভেজ চাইতেন ভেনেজুয়েলার তেল বিদেশী শক্তির প্রভাব মুক্ত হোক। যেহেতু যুক্তরাষ্ট্র তেলের প্রভাবে দেশটির উপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করতো তাই জাতীয়করনের মাধ্যমে সেই প্রভাব কমাতে চেয়েছিলেন। হুগো শ্যাভেজ ১৯৯৯ সালে ক্ষমতায় আসার পরই তিনি ঘোষনা দিলেন, তেল যেহেতু তাদেরর ব্যাক্তিগত সম্পদ, সুতরাং তেল দিয়ে তারা কি করবে সেটা তাদের ব্যাক্তিগত বিষয় । তার এই বক্তব্য শুনে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক ব্যাক্তিকদের ভ্রু কুচকে গেল। দীর্ঘ দিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র তেল আমদানী করে বিশাল মুনাফা করে আসছিল। কিন্তু শ্যাভেজ শুরু করলেন যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীলতা কমানোর নীতি। তেল রপ্তানির দিক ঘুরিয়ে চায়না, রাশিয়া ও ইরানের মত দেশগুলোর কাছে। যাদের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক তিক্ত ছিল। এর পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের টার্গেটে পরিনত হয় ভেনেজুয়েলা। চায়নার সাথে সম্পর্ক হুগো শ্যাভেজ আমল (১৯৯৯–২০১৩) থেকে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পায় মূলত যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব মোকাবিলা যা কৌশলগত অংশীদারত্ব। চায়না ভেনেজুয়েলাকে বিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়ে অর্থনৈতিক সহযোগীতা, তেলের বিনিময়ে ঋণ (Oil-for-loan) ব্যবস্থা, অবকাঠামো, বিদ্যুৎ ও পরিবহন খাতে চায়নার বিনিয়োগ এবং রাশিয়া ভেনেজুয়েলাকে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করে থাকে, যৌথ সামরিক মহড়া অনুষ্ঠিত হয়েছে কয়েকবার। জ্বালানী ও অর্থনীতিতে ভেনেজুয়েলায় রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানির বিনিয়োগ, তেল ও গ্যাস খাতে প্রযুক্তিগত সহায়তা করে চলছে। ভেনেজুয়েলার সাথে চায়না ও রাশিয়ার সম্পর্কের গুরুত্ব অনেক বেশি। এই সস্পর্ক গুলো ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের বিকল্প শক্তি, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক নিঃসঙ্গতা কমানো।
‘বলিভারিয়ান বিপ্লব’-এর সুতিকাগার শ্যাভেজ এর শাসনের মূল লক্ষ্য ছিল যেহেতু সমাজতান্ত্রিক আদর্শ প্রতিষ্ঠা, দারিদ্র্য বিমোচন এবং তেল সম্পদের রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ। প্রথম দিকে শ্যাভেজ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি করেন। তবে ধীরে ধীরে তাঁর শাসনামলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়ে। বিচার বিভাগ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব হয় এবং বিরোধী মত দমন করা শুরু হয়। তেলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল অর্থনীতি ভবিষ্যৎ সংকটের ভিত্তি রচনা করে।
২০০২ সালের বিদ্রোহ ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত অধ্যায়। হুগো শ্যাভেজের শাসনামলে সংঘটিত এই বিদ্রোহ মূলত একটি সামরিক–বেসামরিক অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা ছিল, যা অল্প সময়ের জন্য সফল হলেও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়। এই ঘটনা ভেনেজুয়েলার রাজনীতিকে আরও মেরুকৃত করে তোলে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটায়।
১৯৯৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর হুগো শ্যাভেজ একাধিক সমাজতান্ত্রিক সংস্কার গ্রহণ করেন। তেল শিল্পের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ জোরদার করেন। সংবিধান পরিবর্তন করেন । সামরিক বাহিনীর রাজনৈতিক ভূমিকা বৃদ্ধি করেন।
এসব নীতির ফলে ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, মধ্যবিত্ত শ্রেণি, বেসরকারি গণমাধ্যম এবং সেনাবাহিনীর একটি অংশ শ্যাভেজের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। ২০০১–২০০২ সালে রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি PDVSA নিয়ে সরকারের হস্তক্ষেপ বিদ্রোহের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে ওঠে।
২০০২ সালের ১১ এপ্রিল রাজধানী কারাকাসে শ্যাভেজবিরোধী বিশাল বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। বিক্ষোভ চলাকালে সংঘর্ষে বহু মানুষ নিহত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের অজুহাতে সামরিক বাহিনীর একটি অংশ শ্যাভেজকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করে। শ্যাভেজকে আটক করে একটি সামরিক ঘাঁটিতে নিয়ে যাওয়া হয়। ১২ এপ্রিল ব্যবসায়ী নেতা পেদ্রো কারমোনা নিজেকে অন্তর্বর্তী রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন। সংবিধান ও জাতীয় পরিষদ স্থগিত করা হয়। আর এই পদক্ষেপগুলো দ্রুতই জনগণের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করে।
কারমোনা সরকারের স্বৈরাচারী সিদ্ধান্ত, সেনাবাহিনীর পূর্ণ সমর্থন না পাওয়া এবং শ্যাভেজপন্থী জনগণের ব্যাপক আন্দোলনের ফলে বিদ্রোহ মাত্র ৪৮ ঘন্টার মধ্যে ব্যর্থ হয়। ১৪ এপ্রিল ২০০২ শ্যাভেজ পুনরায় ক্ষমতায় ফিরে আসেন। সামরিক বাহিনীর একটি বড় অংশ তাঁর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে। বিদ্রোহের পর যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে কারমোনা সরকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার ইঙ্গিত দেয়। পরে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে অবস্থান পরিবর্তন করে যুক্তরাষ্ট। যদিও সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততার প্রমাণ নেই, তবু এই ঘটনা শ্যাভেজের যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অবস্থানকে আরও দৃঢ় করে তোলে।
২০০২ সালের বিদ্রোহ ভেনেজুয়েলার রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে– শ্যাভেজ আরও শক্তভাবে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করেন। বিরোধী দল ও গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি পায় । সামরিক বাহিনীর রাজনৈতিক গুরুত্ব বেড়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক আরও অবনতিশীল হয়।
২০১৩ সালে শ্যাভেজের মৃত্যুর পর নিকোলাস মাদুরো ক্ষমতায় আসেন। কিন্তু তাঁর নেতৃত্বে ভেনেজুয়েলার সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করে। মুদ্রাস্ফীতি ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। কারন ২০১৬ সালে হাইপার ইনফ্লেশনে (চরম মুদ্রাস্ফীতি) পড়ে দেশটি। ভেনেজুয়েলার আয়ের প্রধান উৎস তেল আর তেলের দাম পতনের ফলে বৈদেশিক আয় মারাত্মকভাবে কমে যায় এবং বিকল্প উৎপাদন খাত গড়ে না ওঠায় অর্থনীতি ভেঙে পড়ে। সরকারের বাজেট ঘাটতি পূরণে অতিরিক্ত টাকা ছাপানো হলে, উৎপাদন না বাড়লেও মুদ্রার সরবরাহ বেড়ে যাওয়ার ফলে মুদ্রার মান দ্রুত পতন ঘটে। এতেকরে, শিল্প ও কৃষিখাতে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণকরন, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ হ্রাসকরন, খাদ্য ও ভোগ্যপণ্যের ঘাটতি সৃষ্টি হয় ব্যপকভাবে। তাছাড়া সরকার কৃত্রিমভাবে ডলারের দাম নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করে, অফিসিয়াল ও কালোবাজারি দরের মধ্যে বিশাল ব্যবধান সৃষ্টি হয়, ফলে দুর্নীতি ও মজুদদারি বৃদ্ধি পায়। আর এদিকে যুক্তরাষ্ট্র তেল রপ্তানি ও আন্তর্জাতিক লেনদেনে বাঁধা দিলে বৈদেশিক মুদ্রা সংকট আরো তীব্র হয় যার ফলে আমদানি ব্যাহত হয়। PDVSA– এ রাজনৈতিক নিয়োগ ও দুর্নীতির কারনে তেল উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে যায়, যার দরুন সরকারি রাজস্ব আরও হ্রাস পায়। ফলস্বরূপ,সরকারের উপর জনগণের আস্থা হারানো, মানুষ দ্রুত টাকা খরচ বা ডলারে রূপান্তর করা শুরু করে, যাতে মুদ্রাস্ফীতি আরও ত্বরান্বিত হয়, অন্যদিকে খাদ্য, ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চরম সংকট দেখা দেয় । লাখ লাখ মানুষ দেশত্যাগে বাধ্য হয়।
মাদুরো সরকারের নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক বৈধতা নিয়ে দেশ-বিদেশে প্রশ্ন ওঠে। বিরোধী দল দমন এবং সামরিক বাহিনীর ওপর নির্ভরতা মাদুরো সরকারকে আরও কর্তৃত্ববাদী করে তোলে।
হুগো শ্যাভেজের আমল থেকেই যুক্তরাষ্ট্রকে “সাম্রাজ্যবাদী শক্তি” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। শ্যাভেজ ও মাদুরো উভয়েই মার্কিন নীতির তীব্র সমালোচক ছিলেন। এর প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার ওপর একাধিক অর্থনৈতিক ও তেল-সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
মাদুরো সরকারের সময় এই বৈরিতা চরমে পৌঁছায়। যুক্তরাষ্ট্র একসময় বিরোধী নেতা হুয়ান গুয়াইদোকে বৈধ প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং মাদুরোর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ায়। ফলে ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি আরও দুর্বল হয়ে পড়ে।
একপর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক পাচার ও দুর্নীতির অভিযোগ এনে মামলা করেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলেছে। এর ফলে মাদুরো সরকার আন্তর্জাতিক পরিসরে একঘরে হয়ে পড়েছিল।
ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্ব আজ বহুমাত্রিক সংকটে আবদ্ধ। একদিকে বিদেশি নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বৈধতার অভাব রাষ্ট্রের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে ক্ষুণ্ণ করেছে। সরকার যেখানে বিদেশি ষড়যন্ত্রকে দায়ী করছে, সেখানে বিরোধীদের মতে স্বৈরাচারী শাসনই প্রকৃত সংকটের মূল কারণ।
শ্যাভেজ থেকে মাদুরো– এই দীর্ঘ শাসনকাল ভেনেজুয়েলাকে সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন দেখালেও বাস্তবে তা গভীর সংকটে নিক্ষেপ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৈরিতা, অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করেছে।
৩ জানুয়ারি, ২০২৬ যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভিযান করে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ভেনেজুয়েলায় হামলা ও বোমাবর্ষণ চালায়, বিশেষ করে রাজধানী ৳কারাকাসসহ উত্তরাঞ্চলে। এই অভিযানে নিকোলাস মাদুরোও তার স্ত্রীকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয় ।
আমেরিকা দাবি করে, অভিযানে নিকোলাস মাদুরোকে মাদকপাচার ও অপরাধের জন্য অ্যারেস্ট ও বিচার করতে নেওয়া হয়েছে।
অভিযানের পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন করে মার্কিন ডিফেন্স ডিপার্টমেন্ট।
লেখক: তপন দেববর্মা
রেফারেন্স:-
ক. প্রাচীন ইতিহাস ও ঔপনিবেশিক যুগ
মূল উৎস: Encyclopaedia Britannica
আদিবাসী জনগোষ্ঠী (Carib, Arawak ইত্যাদি)
স্পেনীয় উপনিবেশ (১৬শ–১৮শ শতক)
অর্থনীতি: কোকো, কৃষি, দাসপ্রথা
সিমন বলিভার ও গ্রান কলোম্বিয়া
১৮১১–১৮২১: স্বাধীনতা সংগ্রাম
রাজনৈতিক অস্থিরতা ও কডিল্লো শাসন
খ. তেল আবিষ্কার ও আধুনিক রাষ্ট্রের ভিত্তি (২০শ শতকের শুরু–মাঝামাঝি)
মূল উৎস: Britannica, Wikipedia
১৯২০–৩০ দশক: তেল অর্থনীতির উত্থান
সামরিক শাসন বনাম গণতন্ত্র
১৯৫৮ পরবর্তী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা
গ. শ্যাভেজ যুগ (১৯৯৯–২০১৩)
মূল উৎস: Wikipedia, BBC, Al Jazeera
হুগো শ্যাভেজ ও “Bolivarian Revolution”
সমাজতান্ত্রিক সংস্কার, রাষ্ট্রীয়করণ
জনপ্রিয়তা বনাম প্রতিষ্ঠান দুর্বলতা
ঘ. মাদুরো যুগ ও বর্তমান সংকট (২০১৩–বর্তমান)
মূল উৎস: BBC News, Reuters, Al Jazeera
নিকোলাস মাদুরো
অর্থনৈতিক সংকট, মুদ্রাস্ফীতি
নির্বাচন বিতর্ক, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা
যুক্তরাষ্ট্র–রাশিয়া–চীন সম্পর্ক।