কে হচ্ছেন সিসিকের আগামী মেয়র: প্রশাসক নিয়োগ নাকি ‘ড্রেস রিহার্সাল’?
প্রকাশ: ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ১৪:৪৭
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর বদলে যাওয়া রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের (সিসিক) মসনদে বসেছেন নতুন ‘নগরপিতা’। তবে তিনি নির্বাচিত মেয়র নন, বরং সরকার নিযুক্ত প্রশাসক। রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি ও সদ্য সমাপ্ত জাতীয় নির্বাচনের দলীয় সমন্বয়ক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীকে সিসিকের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় স্থবির হয়ে পড়া নাগরিক সেবা এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির অভাব, সব মিলিয়ে নগরবাসীর যখন নাভিশ্বাস, ঠিক তখনই একজন রাজনীতিবিদকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলো। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আমলাদের হাত থেকে রাজনীতিবিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের এই প্রক্রিয়াটি আসন্ন সিটি নির্বাচনেরই একটি ‘ড্রেস রিহার্সাল’ হতে পারে। প্রশ্ন উঠছে, তবে কি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীই হতে যাচ্ছেন সিসিকের আগামী দিনের নির্বাচিত মেয়র, নাকি এটি কেবল অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা?
গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সিসিকের মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীসহ কাউন্সিলরদের অপসারণ করা হয়। এরপর থেকে বিভাগীয় কমিশনার প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছিলেন। তবে রোববার স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে আমলাতন্ত্রের বদলে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। শুধু সিলেট নয়, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ, খুলনা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরেও বিএনপি ও সমমনা দলের সিনিয়র নেতাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
সিলেটের নতুন প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী সদ্য সমাপ্ত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-৩ আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। মনোনয়ন না পেলেও তিনি জেলার ছয়টি আসনে দলীয় নির্বাচনী সমন্বয়কের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তাকে প্রশাসকের চেয়ারে বসানোকে দলের হাইকমান্ডের ‘গ্রিন সিগন্যাল’ হিসেবেই দেখছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। অনেকের মনে প্রশ্ন জেগেছে এটা কি ড্রেস রিহার্সাল বা আসন্ন সিসিক নির্বাচনে বিএনপির আগাম প্রস্তুতি?
সদ্য গঠিত বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ইতোমধ্যেই দ্রুততম সময়ের মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন। সচিবালয়ে তিনি জানান, ঈদের পরপরই ধাপে ধাপে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন কমিশন (ইসি) সূত্রে জানা গেছে, আইনি বাধ্যবাধকতা মেনে প্রথমে ঢাকা ও চট্টগ্রামের পর সিলেটসহ অন্যান্য সিটিতে ভোট হতে পারে।
পরিসংখ্যান ও ভোটের মাঠ: সিলেটের ৪২টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত বর্তমান সিসিকের আয়তন ৭৯.৫০ বর্গকিলোমিটার। মোট ভোটার ৫ লাখ ২৫ হাজার ৩৮৮ জন। সদ্য সমাপ্ত জাতীয় নির্বাচনে সিলেট-১ (সদর-নগর) ও সিলেট-৩ (দক্ষিণ সুরমা) আসনে বিএনপির প্রার্থীরা বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন। সংসদ নির্বাচনের এই হাওয়া সিটি নির্বাচনেও বিএনপির পালে লাগবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীও বসে নেই। তারাও মেয়র পদের জন্য ভেতরে ভেতরে প্রস্তুতি শুরু করেছে।
সিসিকের নেতৃত্বের ইতিহাস: ২০০২ সালে সিলেট সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত হওয়ার পর থেকে নগর পিতার চেয়ার খুব বেশি হাতবদল হয়নি। বদর উদ্দিন আহমেদ কামরান প্রথম ও দ্বিতীয় মেয়াদে (২০০৩-২০১৩) নগরপিতা ছিলেন। আরিফুল হক চৌধুরী টানা দুই মেয়াদে (২০১৩-২০২৩) মেয়রের দায়িত্ব পালন করেন। আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী ২০২৩ সালের নির্বাচনে জয়ী হলেও ২০২৪-এর পটপরিবর্তনে অপসারিত হন। অবশেষে আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পেলেন।
নগরবাসীর প্রত্যাশা, নতুন প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর হাত ধরে স্থবির হয়ে পড়া জন্মনিবন্ধন, ট্রেড লাইসেন্সসহ নাগরিক সেবাগুলো আবার গতি পাবে। আর এই ‘প্রশাসক পর্ব’ শেষেই হয়তো নগরবাসী ফিরে পাবেন তাদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে। এখন দেখার বিষয়, এই ‘ড্রেস রিহার্সাল’ শেষ পর্যন্ত ব্যালট বিপ্লবে রূপ নেয় কি না।
