সিটি কর্পোরেশন আইনে মেয়রের প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা পাওয়ার কোনো লাইনই নেই! পুরোটাই নির্ভর করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটা 'ম্যাজিক' প্রজ্ঞাপনের ওপর। সরকার চাইলে মন্ত্রী, না চাইলে সাধারণ মেয়র। ঠিক এই রাজনৈতিক আশীর্বাদেই গত এপ্রিলে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা পেয়েছিলেন আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী। কিন্তু ক্ষমতার পটপরিবর্তনে মাত্র ৪ মাসের মাথায় সেই প্রটোকল তো গেলই, হারাতে হলো মেয়রের চেয়ারও।
নিয়মানুযায়ী টানা দুইবার সিলেট সিটির মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর আরিফুল হক চৌধুরীরও প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার প্রধান শেখ হাসিনা বিরোধী দলের এই জনপ্রিয় নেতাকে সেই সুযোগ দেননি। আরিফের ভাগ্যে জোটেনি পতাকাবাহী গাড়ি।
তবে সেই আক্ষেপ এখন আর নেই আরিফের। কারণ, তিনি এখন আর 'প্রতিমন্ত্রী' নন, বরং সরাসরি বসেছেন পূর্ণমন্ত্রীর চেয়ারে! ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যেন তার কপাল খুলে দিয়েছে, যাকে বলে একেবারে ‘উঠান কপালি’।
সংসদ সদস্য হিসেবে জীবনের প্রথম জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়েই বাজিমাত করেছেন সিলেটের রাজনীতির এই পরিচিত মুখ। দলীয় ও বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, নতুন মন্ত্রিসভায় তাকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আজ বিকেলেই নতুন মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সিলেটের মতো প্রবাসী-অধ্যুষিত এলাকার একজন নেতার এই মন্ত্রণালয় পাওয়াটা বৃহত্তর সিলেটের জন্য এক বিরাট চমক।
সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-৪ (কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর) আসনে ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন আরিফুল হক চৌধুরী। বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী, তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৮৮ হাজার ৩৪৬ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জয়নাল আবেদীন দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পেয়েছেন ৬৯ হাজার ৯৭৫ ভোট। দুই প্রার্থীর মধ্যে ব্যবধান বিশাল ১ লাখ ১৮ হাজার ৩৭১ ভোট!
১৯৫৯ সালের ২৩ নভেম্বর সিলেটের কুমারপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন আরিফুল হক চৌধুরী। তার পিতা মো. শফিকুল হক চৌধুরী এবং মাতা আমিনা খাতুন। ছাত্রজীবনে ছাত্রদলের মাধ্যমে রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে ধাপে ধাপে উঠে এসেছেন তিনি।
২০০৩ সালে সিসিকের ওয়ার্ড কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে তার জনপ্রতিনিধিত্বের শুরু। সেসময় নগর উন্নয়ন ও পরিকল্পনা কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেন। এরপর টানা দুই মেয়াদে (২০১৩-২০২৩) সিলেট সিটির সফল মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করে নগরবাসীর মন জয় করেন। বর্তমানে তিনি বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য। নির্বাচনী প্রচারণাকালে খনিজসম্পদ ও পর্যটন সম্ভাবনাময় সিলেট-৪ আসনে পাথর কোয়ারি পুনরায় চালু করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পর্যটন খাতের উন্নয়নের যে রূপরেখা তিনি দিয়েছিলেন, তাতেই আস্থা রেখেছেন সাধারণ ভোটাররা।
সিসিকের ইতিহাস ও বর্তমান সমীকরণ: ২০০২ সালে সিলেট সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত হওয়ার পর থেকে নগর পিতার চেয়ার খুব বেশি হাতবদল হয়নি। বদর উদ্দিন আহমেদ কামরান প্রথম ও দ্বিতীয় মেয়াদে (২০০৩-২০১৩) নগরপিতা ছিলেন। এরপর আরিফুল হক চৌধুরী টানা দশ বছর (২০১৩-২০২৩) মেয়রের দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৩ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী জয়ী হলেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনে তিনি অপসারিত হন। সর্বশেষ গত ২২ ফেব্রুয়ারি জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী সিসিকের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন।
তবে সিসিকের গণ্ডি পেরিয়ে আরিফুল হক চৌধুরী এখন জাতীয় রাজনীতির মূল মঞ্চে। স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে- ওয়ার্ড কাউন্সিলর থেকে মেয়র, এরপর সংসদ সদস্য হয়ে সরাসরি মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া; আরিফের এই ধারাবাহিক উত্থান সিলেটের রাজনীতিতে এক নতুন ইতিহাস তৈরি করেছে। শেখ হাসিনা একদিন যাকে প্রতিমন্ত্রীর প্রটোকল দেননি, আজ তিনি পূর্ণমন্ত্রী!
