ছবি: সাজু মারছিয়াং
প্রকৃতি যখন আপন খেয়ালে নিজেকে সাজায়, তখন তার রূপের কাছে হার মানে মানুষের তৈরি শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্মও। চায়ের রাজধানীখ্যাত মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে প্রকৃতির এমনই এক অনন্য উপহার হিসেবে দেখা দিয়েছে বিরল প্রজাতির ‘নাগলিঙ্গম’ বৃক্ষ। বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিটিআরআই) এলাকায় এই বৃক্ষের রক্তিম আভা এখন মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে পর্যটক ও স্থানীয়দের মনে। বিটিআরআই-এর প্রধান ফটক পেরিয়ে পুকুরপাড়ের শান্ত পরিবেশে দাঁড়িয়ে থাকা এই গাছটি এখন ফুলে ফুলে সুশোভিত। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন কোনো নিপুণ শিল্পী পরম যত্নে লাল রঙের আল্পনা এঁকে দিয়েছেন গাছের ডালে ডালে।
জেলার দুটি স্থানে বর্তমানে নাগলিঙ্গম গাছে ফুল ও ফল ধরার খবর পাওয়া গেছে। এর একটি শ্রীমঙ্গলস্থ বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিটিআরআই) ও অন্যটি মির্জাপুর ইউনিয়নের শহরশ্রী গ্রামে অবসরপ্রাপ্ত নৌ কর্মকর্তা দেওয়ান গউছউদ্দিন আহমদের বাড়িতে। এই দুই স্থানেই গাছগুলো এখন ফুলে-ফলে ভরপুর, যা দেখতে প্রতিদিন ভিড় করছেন প্রকৃতিপ্রেমীরা।
নাগলিঙ্গমের বৈজ্ঞানিক নাম Couroupita guianensis। বাংলাদেশে নাগলিঙ্গম বৃক্ষ বেশ বিরল। এর বিচিত্র গড়ন এবং গুচ্ছবদ্ধ রক্তিম পুষ্পরাজি একে অন্য সব গাছ থেকে আলাদা করেছে। বাতাসের সাথে মিশে থাকা এই ফুলের হালকা সুবাস দর্শনার্থীদের এক অদ্ভুত প্রশান্তি দেয়।
এই গাছের সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হলো- ফুল ও ফল শাখা-প্রশাখায় নয়, সরাসরি কাণ্ডে জন্মায়। গাঢ় গোলাপি ও হালকা হলুদের মিশেলে গড়া ফুলগুলো দেখতে যেমন আকর্ষণীয়, তেমনি এর সৌরভে মিশে থাকে গোলাপ ও পদ্মের ঘ্রাণ। ফুলের পরাগচক্র সাপের ফণার মতো আকৃতির, যা একে আরও রহস্যময় করে তোলে।
বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল নাগলিঙ্গম গাছটি এখন ফুল ও ফলে ভরপুর। সকাল-বিকাল পুরো এলাকা ভরে উঠছে এর মায়াময় সুগন্ধে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীরা চা বাগানের সৌন্দর্যের পাশাপাশি এই বিরল বৃক্ষ দেখেও মুগ্ধ হচ্ছেন।
জানা যায়, ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ চা বোর্ডের তৎকালীন চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার আব্দুল্লাহ আল হোসেন এই গাছটির চারা রোপণ করেন। তিন দশকে এটি বিশাল আকৃতি ধারণ করেছে।
অন্যদিকে শহরশ্রী গ্রামের একটি বাড়ির আঙিনায়ও একই দৃশ্য। গাছটির গোড়া থেকে কাণ্ডজুড়ে ফুটে থাকা ফুলে প্রায় পাতাই দেখা যায় না। কুঁড়ি থেকে পূর্ণ প্রস্ফুটন- সব ধাপেই রয়েছে দৃষ্টিনন্দন সৌন্দর্য।
স্থানীয় দর্শনার্থীরা বলছেন, এমন দৃশ্য আগে কখনো দেখেননি। গাছের কাণ্ডজুড়ে ফুল ফোটার বিরল দৃশ্য তাদের বিস্মিত করেছে। বিশেষ করে পরিবার নিয়ে আসা দর্শনার্থীরা এই গাছের সামনে ছবি তুলতে ভিড় করছেন।
নাগলিঙ্গম গাছ আকারে বেশ বৃহৎ। এর কাণ্ড ফুঁড়ে বের হওয়া লম্বা, লতার মতো শাখাগুলোতে একসঙ্গে ফুটে ওঠে হাজারো ছোট ছোট কুঁড়ি। সময়ের সঙ্গে সেই কুঁড়িগুলো রূপ নেয় টকটকে লাল পলাশ কিংবা শিমুলের মতো দৃষ্টিনন্দন ফুলে, যা আকাশের দিকে মুখ তুলে দাঁড়িয়ে থাকে। ফুলের পাপড়ি ও রেণুর গঠন এতটাই আকর্ষণীয় যে তা সহজেই যে কারও দৃষ্টি কাড়ে।
বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্ভিদ বিজ্ঞানী ড. ইসমাইল হোসেন জানান, ‘নাগলিঙ্গম বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় বিলুপ্তির পথে। এটি একটি দ্রুত বর্ধনশীল বৃক্ষ, যা ৩৫ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। চারা রোপণের ১২-১৪ বছর পর গাছে ফুল আসে। গাছের কাণ্ড ভেদ করে বের হওয়া মঞ্জুরিতে একসঙ্গে ১০-২০টি ফুল ফোটে। একদিকে নতুন ফুল ফুটতে থাকে, অন্যদিকে পুরোনো ফুল ঝরে পড়ে প্রকৃতির এক অনন্য চক্র।
চায়ের রাজধানী শ্রীমঙ্গলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে নাগলিঙ্গম গাছ যুক্ত করেছে নতুন মাত্রা। বিরল এই বৃক্ষ শুধু সৌন্দর্য নয়, বৈজ্ঞানিক ও ঔষধি গুরুত্বেও অনন্য। ফলে দিন দিন এটি হয়ে উঠছে প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসুদের নতুন আকর্ষণ। নাগলিঙ্গমের এই মনোমুগ্ধকর উপস্থিতি যেন মনে করিয়ে দেয়- প্রকৃতি এখনও তার অগণিত বিস্ময় লুকিয়ে রেখেছে আমাদের চারপাশেই।
