ওসমানীনগরে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষিত
প্রশাসনের সমন্বয়হীনতার চিত্র
প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৬ ২০:২৫
ছবি: সংগৃহীত
দেশজুড়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকারের কঠোর নির্দেশনা থাকলেও সিলেটের ওসমানীনগরে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়হীনতার অভাবে উপজেলাজুড়ে নির্ধারিত সময়ের পরেও দেদারসে চলছে দোকানপাট ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান।
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে সব ধরনের দোকানপাট ও বিপণিবিতান বন্ধ করার কথা থাকলেও ওসমানীনগরের বিভিন্ন বাজারে রাত ৯টা থেকে ১০টা পর্যন্ত স্বাভাবিক বেচাকেনা চলতে দেখা গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, তদারকির অভাবে ব্যবসায়ীরা এই নিয়ম মানার প্রয়োজনীয়তা বোধ করছেন না।
সরজমিনে গোয়ালাবাজার, তাজপুর ও দয়ামীরসহ উপজেলার প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলো ঘুরে দেখা যায়, অনেক ব্যবসায়ী আংশিকভাবে শাটার নামিয়ে কিংবা লাইট কমিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। আবার কেউ কেউ প্রকাশ্যেই পুরো আলো জ্বালিয়ে রাত পর্যন্ত দোকান খোলা রাখছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন মহলের অভিযোগ, প্রশাসনের কার্যকর তদারকির অভাবেই ব্যবসায়ীরা নিয়ম ভাঙার সাহস পাচ্ছেন। এক বাসিন্দা বলেন, `সরকার জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সাশ্রয়ের কথা বললেও এভাবে নিয়ম অমান্য করা দায়িত্বহীনতার পরিচয়।' তারা নিয়মিত অভিযানের দাবি জানান।
অন্যদিকে, ব্যবসায়ীদের একাংশ বলছেন, সন্ধ্যার পর ক্রেতাদের চাপ বেশি থাকে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দোকান বন্ধ করলে তাদের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়।
এদিকে, গত কয়েক দিনে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে উপজেলার জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় প্রায় আড়াই লাখ মানুষ চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন। কোনো দৃশ্যমান কারণ ছাড়াই দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় মারাত্মক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। চলমান প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা ও আসন্ন এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতিও ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি ফটোকপি, কম্পিউটার সার্ভিস, ওয়েল্ডিংসহ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ঈদকে সামনে রেখে ব্যবসার মৌসুমেও বিদ্যুৎ সংকটে আর্থিক ক্ষতির শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ঘন ঘন বিদ্যুৎ ওঠানামার ফলে ফ্রিজ, টেলিভিশন ও কম্পিউটারসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও বেড়েছে।
বিদ্যুৎ পরিস্থিতির সংকটের কথা জানিয়ে পল্লীবিদ্যুৎ ওসমানীনগর জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) মো. নাইমুল হাসান বলেন, `আজ দিনের বেলা ৬ থেকে ৭ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে আমরা মাত্র ৪ থেকে ৫ মেগাওয়াট সরবরাহ করতে পারছি। ব্যবসায়ীদের নির্দেশনা মানতে বলা হয়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হস্তক্ষেপ ছাড়া আমরা জোরপূর্বক কিছু করতে পারি না। মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করলে আমরা সব ধরনের সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত।'
বিষয়টিকে অনেকটা এড়িয়ে গিয়ে ওসমানীনগর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মুরশেদুল আলম ভুঁইয়া বলেন, `আমরা তো বলতেছি। আপনারা পেপারে লেখেন। ইউএনও সাহেবকে একটু বলেন। একটু ঝামেলায় আছি, বিষয়টি দেখতেছি।'
এদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুনমুন নাহার আশা সরকারি নির্দেশনার সময়সীমা সম্পর্কেই সঠিক তথ্য দিতে পারেননি। তিনি বলেন, `সময় বোধহয় একটু বাড়ানো হয়েছে, তবে ৭টার পর কয়টা করা হয়েছে তা আমার জানা নেই। আমরা বাজার সভাপতি ও চেয়ারম্যানদের জানিয়েছি। আপনারা একটু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে কথা বলুন।'
বিদ্যুৎ সাশ্রয় কার্যক্রম বাস্তবায়নে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে একে অপরকে দায়িত্ব ঠেলে দেওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।
এই সময়ে প্রশাসনের এমন দায়সারা বক্তব্যে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। একদিকে সাধারণ গ্রাহকরা লোডশেডিংয়ে ভুগছেন, অন্যদিকে বাজারের আলোকসজ্জা ও অতিরিক্ত সময় দোকান খোলা রাখায় অপচয় হচ্ছে মূল্যবান বিদ্যুৎ। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, দ্রুত সমন্বয় সভার মাধ্যমে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা হোক।
