সিলেটের ঐতিহ্যবাহী সেন্ট্রাল ফার্মেসির শতবর্ষের দাপুটে ব্যবসার অবসান
প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৬ ২১:৩৫
ছবি: ইমজা নিউজ
সিলেটের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী চৌহাট্টা পয়েন্টের পরিচিত নাম সেন্ট্রাল ফার্মেসি। এই ফার্মেসি প্রায় শতাব্দী ধরে সিলেটের মানুষের জন্য ঔষধ সরবরাহ করে আসছিল। তবে আজ জানা গেছে যে, এই ঐতিহাসিক ফার্মেসি প্রায় তিন দিন ধরে বন্ধ রয়েছে।
ফার্মেসি বন্ধের কারণ হিসেবে জানা গেছে যে, তারা ঔষধ কোম্পানির বকেয়া টাকা পরিশোধ করতে পারছে না। এছাড়াও তাদের কর্মচারীদের বেতন এবং আয়কর দিতে পারছে না। এই কারণে তারা ফার্মেসি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন।
একটি সূত্র জানায়, এই ফার্মেসীর স্বত্বাধিকারীদের সকল উত্তরাধিকারীরা প্রবাসে বসবাস করছেন। ব্যবসা পরিচালনার লোকবল না থাকার কারণেই মূলত ব্যবসাটির আজ করুণ দশা। লক্ষ লক্ষ টাকা বকেয়া থাকার কারণে উত্তরাধিকারীরা তাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গত তিন দিন আগে ফার্মেসিটিতে তালা লাগিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এরপর থেকেই তালা ঝুলছে ফার্মেসিতে। তবে উত্তরাধিকারীদের কারো সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
সিলেটের চৌহাট্টা পয়েন্ট হলো শহরের একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং ব্যস্ততম স্থান। এই ফার্মেসি শহরের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ ছিল। এই ফার্মেসি বন্ধ হয়ে যাওয়া সিলেটবাসীর জন্য দুঃখজনক সংবাদ। অনেকেই এই ফার্মেসি থেকে ঔষধ কিনতেন।
সেন্ট্রাল ফার্মেসি সিলেটের মানুষের জন্য দীর্ঘকাল ঔষধ সরবরাহ করে আসছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারা বেশ কিছু সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে। ঔষধের দাম বৃদ্ধি এবং নতুন নতুন ফার্মেসির উত্থানের কারণে তারা গ্রাহক হারিয়েছে। এছাড়াও কর্মচারীদের বেতন এবং অন্যান্য খরচ পরিশোধে তাদের অসুবিধা হয়েছে।
সেন্ট্রাল ফার্মেসি সিলেটের মানুষের জন্য একটি ঐতিহ্যবাহী ফার্মেসি ছিল। এর বন্ধ হয়ে যাওয়া সিলেটবাসীর জন্য ক্ষতি। এই খবরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ আলোচনা চলছে।
আবু তালেব মুরাদ নামের একজন ফেসবুকে লিখেছেন, 'বন্ধ হয়ে গেলো ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান 'দি সেন্ট্রাল ফার্মেসী'। এক সময় একান্নবর্তী পরিবার মানেই সিলেটের অন্যতম ঐতিহাসিক ঐত্যিহ্যের প্রতীক একটি প্রাচীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ,দি সেন্ট্রাল ফার্মেসি।’
এই ফার্মেসীর আয় থেকে তাদের বাড়ীর কয়েকটি পরিবারের প্রতিদিনের একসাথে রান্না করা হতো। পুরুষ মহিলা প্রত্যকে বাহির থেকে এসে ফ্রেশ হয়ে চলে যেতেন ডাইনিং হলে। সকালের নাস্তা দুই বেলার খাবার প্রস্তুত করার জন্য বাবুর্চি ছিলো কয়েকজন। প্রত্যকের রান্নাঘর শুধু চা কফি এবং মেহমান আপ্যায়নের জন্য। আমি প্রায়শই যেতাম। কারণ এই বাড়ীর বাসু আমার স্কুল সহপাঠি এবং পরবর্তীতে এই বাড়ীর মেয়ে নন্দিতা, যে আমার মদন মোহন কলেজের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে আমার অনুকূলে প্রচারণার দায়িত্বে ছিলো এবং ১৯৭৭-৭৮ নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছিলাম আমি।
মদন মোহন কলেজের বাংলা বিভাগে আমার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক বিজিত কুমার দে, তিনিও সেন্ট্রাল ফার্মেসীর অন্যতম মালিক। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই একান্নবর্তী পরিবারের পরিবারিক কোন্দলে আর স্বার্থের কলহে বন্ধ হয়ে গেলো সিলেটের চৌহাট্রায় অবস্থিত সেন্ট্রাল ফার্মেসী নামক প্রতিষ্ঠানটি।
মনে আছে সিলেট শহরের সর্বপ্রথম প্রতিষ্ঠিত এই ফার্মেসীতে জরুরী ঔষধ, মানুষের নেয়ার সুবিধার্থে রাতের ডিউটিতে সারারাত ঔষধ বিক্রির ব্যবস্থা করা হতো। কোন জরুরী জীবনরক্ষাকারী ঔষধ অন্য কোথায়ও না পাওয়া গেলে, শেষ ভরসা ছিল ‘ দি সেন্ট্রাল ফার্মেসি'।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানীদের যোগসাজশে এই দেশের দোসররা লুটে নিয়ে যায় সেট্রাল ফার্মেসীর ওষুধ ও আসবাবপত্র। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাদের পারিবারিক ইউনিটির কারনে পূর্বাবস্থায় ফিরে আসে ফার্মেসীটি। শেষ পর্যন্ত স্বার্থের কাছে হার মানলো এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানিটি।'
আশাপূর্ণা চৌধুরী নামের আরেকজন লিখেছেন, 'থমকে গেলো ঐতিহ্য, বন্ধ হলো সেবা... লোভের কাল বিষে ভেঙ্গে গেলো মানুষের ভরসা...।’
রাজিব জেবতিক হক নামের একজন লিখেছেন, 'খুবই দু:খজনক। সেন্ট্রাল ফার্মেসি ছিলো শহরের একটা আইকনিক ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান।'
রাজিব রাসেল নামের একজন লিখেছেন, 'চোখের সামনে কত শৈশব-কৈশোর এভাবে বিলীন হয়ে যাচ্ছে!'
