https://www.emjanews.com/

16422

surplus

প্রকাশিত

১৫ জুন ২০২৬ ২০:২৯

আপডেট

১৫ জুন ২০২৬ ২০:৩০

অন্যান্য

তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফর: অর্থনীতি ও ভূরাজনীতির নতুন সমীকরণ

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬ ২০:২৯

ছবি: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম আনুষ্ঠানিক বিদেশ সফর শুরু  হচ্ছে মালয়েশিয়া দিয়ে। তিনি  আগামী ২১ ও ২২ জুন মালয়েশিয়া সফর করবেন  এবং এর পরপরই চীন সফরের পরিকল্পনা রয়েছে মর্মে জানা গেছে। এটি নতুন সরকারের বৈদেশিক ও আঞ্চলিক সম্পর্ক, অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার এবং ভূরাজনৈতিক অবস্থানের গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করছে বলে অনেকেই মনে করছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য হিসেবে মালয়েশিয়া-কে বেছে নেওয়া একটি সুপরিকল্পিত কৌশলগত সিদ্ধান্ত। এ সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে।  

নির্বাচনে বিজয়ের পর প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়ে সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদি, লি কিয়াং এবং আনোয়ার ইব্রাহিম। তবে তাদের মধ্যে প্রথম গন্তব্য হিসেবে তিনি মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়েছেন। ফলে মালয়েশিয়া প্রবাসী বাংলাদেশিবা প্রধানমন্ত্রীর এ সিদ্ধান্তকে নিজেদের জন্য বেশ  সম্মানের মনে করছে। তারা আশা করছেন, এ সফরের মাধ্যমে জনাব রহমান মালয়েশিয়া সরকারের নিকট থেকে তাদের জন্য বিশেষ সুবিধা এনে দিবে। ব্যবসায়ীরা উভয় দেশের মধ্যে ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে বলে মনে করেন। আর মালয়েশিয়ায় কর্মসংস্থানে ইচ্ছুক বাংলাদেশীদের প্রতিক্ষার অবসান হবে বলে তারা আশা করছেন। রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার গুরুত্বপুর্ন মানবিক ইস্যুটির সমাধানে মালয়েশিয়ার সর্বাত্মক সহযোগিতা পাবে বলেও অনেকে আশা করছেন। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফর এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। 

মালয়েশিয়া মুসলিম বিশ্বের সংগঠন অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কান্ট্রিস ( ওআইসি) এবং 'দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক জোট আসিয়ানের অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য। ফলে এই সফর মুসলিম বিশ্ব ও আসিয়ান অঞ্চলের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও গভীরে নেবার  সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়গুলোর একটি হচ্ছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। বাংলাদেশ থেকে সাধারণ কর্মী নিয়োগকে কেন্দ্র করে উঠে আসা  নানান অনিয়ম, দুর্নীতি, মাত্রাতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, কর্মীদের ঋণে অবব্ধ হওয়া, কাজ না পাওয়া, ফোর্সড লেবার এবং মানব পাচারের মতো গুরুতর ও স্পর্শকাতর অভিযোগ বেশ গুরুত্বের সাথে নিয়ে মালয়েশিয়া সরকার ২০২৪-এর ৩১ মে থেকে সাধারণ কর্মী নিয়োগ স্থগিত করে। ফলে, বাংলাদেশীদের জন্য  মালয়েশিয়ার সাধারণ পর্যায়ের  শ্রমবাজার পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। জনাব রহমান এর নতুন সরকার বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এ বিষয়ে মালয়েশিয়া সরকারের সাথে আলাপ করেছে। দেশে ফিরে তারা সাধারণ কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হবার ইঙ্গিত দিয়েছেন। সে ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর এ সফর বেশ আশার সঞ্চার করেছে। 

সর্বশেষ মালয়েশিয়ার মানব মন্ত্রীর আমন্ত্রণে কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশের মন্ত্রী ও উপদেষ্টার আলোচনার পর যৌথ প্রেস স্টেটমেন্টে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, প্রতারণা, হয়রানি এবং আরও উন্নত ও সহজ সুরক্ষিত প্রযুক্তি প্রয়োগের বিষয়টি উঠে এসেছে। তার আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশ মালয়েশিয়ার নিকট জানতে চেয়েছিল যেকোন শর্তের ভিত্তিতে মালয়েশিয়া বাংলাদেশ থেকে সীমিত রিক্রুটিং এজেন্সিকে বেছে নেয় এবং কর্মী প্রেরণের  অনুমতি দেয়। সে প্রেক্ষিতে মালয়েশিয়া সরকার ১০ টি শর্ত প্রদান করে এবং তৎকালীন সরকার শর্ত শিথিল করার অনুরোধ করলেও মালয়েশিয়া কোনো জবাব দেয়নি। কিন্তু মালয়েশিয়ার জবাবের অপেক্ষা না করে নিজেদের মতো করে কয়েকটি শর্ত শিথিল করে ৪২৩টি বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা মালয়েশিয়া সরকারের নিকট প্রেরণ করে! বর্তমানে এই তালিকা করা নিয়েও নানান অভিযোগের কথা শোনা যাচ্ছে। এই নিয়োগকে কেন্দ্র করে সবথেকে স্পর্শকাতর ইস্যু হলো মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রেরণের ফলে মানব পাচার, অর্থ পাচার ও প্রতারণার মামলা হয়েছে বাংলাদেশের আদালতে, দুর্নীতি দমন কমিশনে এবং পুলিশের নিকট। মামলাগুলো আওয়ামীলীগ সরকারের পতনের পরপর হলেও অদ্যাবধি কোনো সিদ্ধান্ত বা  বিচার সম্পন্ন না হওয়ায় মালয়েশিয়া  অস্বস্তিকর অনুভূতি প্রকাশ করেছে এবং দ্রুত আইনানুগ নিষ্পত্তি চেয়েছে বলে জানা গেছে।

সম্প্রতি জেনেভায় আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার সভায় মালয়েশিয়ার মানব সম্পদ মন্ত্রী মালয়েশিয়ার অভ্যন্তরে কর্মী ব্যবস্থাপনায় আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সসহ সর্বশেষ প্রযুক্তি প্রয়োগ করে নিয়োগ ও কর্মী ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং হয়রানি ও প্রতারণা মুক্ত করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন।   

বাংলাদেশের বর্তমান সরকার নির্বাচনী ইশতেহারে ৫ বছরে ১ কোটি বৈদেশিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির অঙ্গীকার করেছে। এ লক্ষ্য অর্জনে মালয়েশিয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য বন্ধ শ্রমবাজারে আগে প্রধান মন্ত্রীর সফর বেশ তাৎপর্য বহন করে। অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব কেবল পণ্য নয় শ্রম বিনিয়োগ বেশ গুরুত্বপুর্ন। এর ফলে, মালয়েশিয়ায় কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পেলে সরকারের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অগ্রগতি হবে। ফলে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। 

বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার বাণিজ্যিক সম্পর্ক কয়েক দশকের পুরোনো। বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ কয়েক বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তবে বাণিজ্য ভারসাম্য এখনো মালয়েশিয়ার পক্ষে ধনাত্মক।

বাংলাদেশ প্রধানত তৈরি পোশাক, ওষুধ, কৃষিপণ্য, পাটজাত সামগ্রী ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য মালয়েশিয়ায় রপ্তানি করে। বিপরীতে মালয়েশিয়া থেকে আমদানি হয় পাম অয়েল, পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য, রাসায়নিক দ্রব্য, ইস্পাত ও ইলেকট্রনিক সামগ্রী।

সফরে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর উপায়, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং রপ্তানি সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে; বিশেষ করে বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে মালয়েশিয়ান বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে।

দুই দেশের মধ্যে একটি ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট (এফটিএ) বা মুক্তবাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা অনেক দূর এগিয়েছে। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) মর্যাদা থেকে উত্তরণের পথে। ফলে ভবিষ্যতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাজারে শুল্ক সুবিধা কমে আসতে পারে। এ অবস্থায় মালয়েশিয়ার সঙ্গে এফটিএ বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে।

এফটিএ কার্যকর হলে, বাংলাদেশি পণ্যের ওপর শুল্ক কমে যাবে, আসিয়ান অঞ্চলের বিশাল বাজারে প্রবেশ সহজ হবে, কৃষিপণ্য, হালাল পণ্য, পাটজাত সামগ্রী ও খাদ্যপণ্যের রপ্তানি বাড়বে, মালয়েশিয়ান বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে।

বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্কের ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন জিয়াউর রহমান। ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগে তার উদ্যোগে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, সংস্কৃতি, বিমান চলাচল, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং অর্থ লেনদেনসংক্রান্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

১৯৭৭ সালের বাণিজ্য চুক্তি ছিল দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তিপ্রস্তর। পরবর্তীতে সমুদ্র পরিবহন, কারিগরি সহযোগিতা এবং দ্বৈত কর পরিহার চুক্তিসহ আরও বেশ কয়েকটি সমঝোতা সম্পাদিত হয়।

মালয়েশিয়া সফরকে কেবল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের আলোকে দেখলে ভুল হবে। এটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেও জড়িত।

আসিয়ান এর সদস্য হতে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন থেকে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, এ সফরের ফলে সে প্রত্যাশা পূরণ হতে পারে। শিক্ষা, গবেষণা এবং দক্ষতা উন্নয়নে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হবে বলে আশাকরা হচ্ছে। 

পিতা ও মাতার দেখানো পথে  মালয়েশিয়ার পথে পুত্র প্রধানমন্ত্রীর যাত্রা কেবল একটি সৌজন্য রক্ষার  সফর নয়; বরং এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনৈতিক কৌশল এবং আঞ্চলিক অবস্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।