‘জুলাই কার- এই বিভাজন সৃষ্টি করবেন না, তাহলে জুলাই কারও থাকবে না’ : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৬ ২০:১৬
ছবি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের কৃতিত্ব নিয়ে বিভাজন সৃষ্টি না করার আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, জুলাই কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর একক অর্জন নয়; এটি বাংলাদেশের মানুষের দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে অর্জিত একটি ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থান।
বুধবার (৫ আগস্ট) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সে রকম একটা স্বৈরাচারের কবল থেকে মুক্তির পরে আমরা যদি বলি, জুলাই কার, জুলাই কার, তাহলে জুলাই আমাদের কারোরই থাকবে না। এই অবস্থা থেকে আমাদের মুক্তি পেতে হবে।’
তিনি বলেন, পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক সময় কয়েকটি দিন বা সপ্তাহই শতাব্দীর পরিবর্তনের সূচনা করেছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানও তেমনই একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তন। তাই এ অর্জনকে দলীয়করণ না করে এর মূল চেতনা ও আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
নিজের ‘আয়নাঘর’-এর অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সেখানে ২৪ ঘণ্টাও স্বাভাবিকভাবে থাকা সম্ভব নয়। তিনি প্রয়াত জামায়াত নেতা মীর কাসেম আলীর সঙ্গে কারাগারে থাকার অভিজ্ঞতার কথাও উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য, মীর কাসেম আলী একসময় বলেছিলেন দেশে না ফিরলে তাঁর ছেলেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হবে। পরে তিনিও গ্রেপ্তার হন এবং তাঁর ছেলেকেও আটক করা হয়। এ ঘটনাকে তিনি স্বৈরাচারী শাসনের নির্মম বাস্তবতার উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান কোনো এক দিনের আন্দোলনের ফল নয়। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে বিরোধী রাজনৈতিক দলের অসংখ্য নেতা-কর্মী হত্যা, গুম, হামলা ও মামলার শিকার হয়েছেন। বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের বহু নেতা-কর্মী এবং সাধারণ মানুষ আত্মত্যাগ করেছেন। ইলিয়াস আলীর মতো অনেকে আজও নিখোঁজ। তাই শুধু জুলাইয়ের ৩৬ দিনের ঘটনাপ্রবাহ দিয়ে পুরো আন্দোলনের ইতিহাস বিচার করা যাবে না।
তিনি বলেন, কোনো আন্দোলন শুরু থেকেই সহিংস হয় না। যখন গণতান্ত্রিক ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়, তখনই আন্দোলন রক্তাক্ত হয়ে ওঠে। বাংলাদেশেও দীর্ঘদিনের দমন-পীড়নের কারণেই জুলাইয়ের আন্দোলন সহিংস রূপ নিয়েছিল।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও দীর্ঘ রাজনৈতিক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। তিনি জুলাই জাতীয় সনদের প্রতিটি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কারের আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, নাম যাই হোক না কেন, বাস্তব সংস্কার কার্যকর করতে হলে সংবিধান সংশোধন করতেই হবে। সংসদের মাধ্যমে সংশোধনী পাসের মাধ্যমেই সংস্কার বাস্তবায়ন সম্ভব। এমন একটি সংবিধান গড়ে তুলতে হবে, যা দীর্ঘদিন রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
গুম প্রতিরোধ ও ভুক্তভোগীদের প্রতিকার নিশ্চিত করতে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আগামী সংসদে এ-সংক্রান্ত আইন আনার আশা করা হচ্ছে। এতে গুমসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হবে।
জুলাইয়ে আহতদের জন্য পৃথক শ্রেণিবিন্যাসের প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, যারা আহত হয়েও কর্মক্ষম রয়েছেন এবং যারা গুরুতর আহত হয়ে কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন, তাদের আলাদাভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে এখনো তালিকাভুক্ত না হওয়া আহত ব্যক্তি ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের তালিকাভুক্ত করার আহ্বান জানান তিনি।
আওয়ামী লীগের বিচার প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ব্যক্তি যেমন মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে বিচারের মুখোমুখি হতে পারেন, তেমনি কোনো সংগঠন বা রাজনৈতিক দলও বিচারের আওতায় আসতে পারে। তবে নির্বাহী আদেশে কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার পক্ষে তিনি নন। এ বিষয়ে আদালতই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শেষে তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অর্জন ও আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করাই এখন সবার দায়িত্ব। বাংলাদেশে আর কোনো দিন যেন ফ্যাসিবাদের উত্থান না ঘটে, সে জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। জুলাই কোনো ব্যক্তি বা দলের নয়, এটি পুরো জাতির সম্মিলিত অর্জন।
