সিলেট নগরের রায়নগরে প্রবীণ ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার, তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও গৃহকর্মী তাহমিনা বেগম হত্যাকাণ্ডে আইনজীবী সিরাজুল ইসলামের নাম নতুন করে আলোচনায় এসেছে। নিহত সাত্তারের মেয়ে সেলিনা সুলতানা শুক্রবার রাতে কোতোয়ালি থানায় দায়ের করা এজাহারে জমিসংক্রান্ত বিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ডে সিরাজুল ইসলামের সম্পৃক্ততার সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
এজাহারে সেলিনা অভিযোগ করেন, ১৯৯৭ সালে তিনি ও তাঁর বাবা পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতির কাছ থেকে রিকাবীবাজারের সরষপুর এলাকায় প্রায় ১২ শতক জমি লিজ নিয়ে বাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করছিলেন। পরে ২০০৬ সালে ইম্পালস বিল্ডার্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম ওই জমিসহ সমিতির প্রায় ৮০ শতক জমি একটি সাফকবলা দলিলের মাধ্যমে নিজের প্রতিষ্ঠানের নামে নেন এবং নামজারি করে মালিকানা দাবি করেন।
এ নিয়ে ২০১৬ সালে আব্দুস সাত্তার সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে স্বত্ব মামলা করেন। মামলাটি বর্তমানে স্বত্ব-২১১/২০২৩ নম্বরে যুগ্ম জেলা জজ অতিরিক্ত আদালতে বিচারাধীন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। সেলিনার অভিযোগ, মামলা প্রত্যাহারের জন্য বিভিন্ন সময়ে তাঁর বাবা ও তাঁকে হুমকি দেওয়া হয়েছে।
এজাহারে আরও বলা হয়, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সিরাজুল ইসলাম কয়েকজনকে নিয়ে সাত্তারের বাসায় গিয়ে মামলা প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেন। একই বছরের মে মাসে মামলাসংক্রান্ত বিরোধে তৌহিদুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তিকে মারধরের অভিযোগও ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় পরে আদালতে মামলা হয়।
সেলিনার অভিযোগ, গত ২৮ জুলাই মামলার শুনানির সময় তাঁর বাবার আইনজীবীকে এবং ৩০ জুলাই আদালতে গেলে আব্দুস সাত্তারকে মামলা প্রত্যাহারের জন্য হুমকি দেওয়া হয়। তাঁর দাবি, ওই জমিসংক্রান্ত মামলা থেকে দলিলটি রক্ষা করতেই পূর্বপরিকল্পিতভাবে ভাড়াটে খুনিদের দিয়ে তাঁর বাবা-মা ও গৃহকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাসা থেকে গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ও দলিল নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও করেন তিনি।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো তদন্তে প্রমাণিত হয়নি। অভিযোগের বিষয়ে সিরাজুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি নিয়ে তিন দিন ধরে আলোচনা হচ্ছে। তদন্ত হোক, পরে এ বিষয়ে কথা বলবেন।
এদিকে, সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে এর আগেও জালিয়াতি, প্রতারণা ও চেক ডিজঅনারসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা হয়েছে। পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতির জায়গা ও কবরস্থানের জমি নিয়ে জালিয়াতির অভিযোগে ২০২১ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন মামলা করে। ওই মামলায় ২০২২ সালের আগস্টে তাঁর জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর তথ্য রয়েছে।
এর আগে চেক ডিজঅনার ও প্রতারণার মামলাতেও তিনি কারাগারে ছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। গির্জা সমিতির জমি নিয়ে সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে একাধিক পক্ষের মামলা চলমান রয়েছে।
গত ১২ আগস্ট সকালে রায়নগরের মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসা থেকে আব্দুস সাত্তার (৯০), তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭৬) ও গৃহকর্মী তাহমিনা বেগমের (১৮) গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই সাত্তারের সঙ্গে পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতির জমি নিয়ে বিরোধের বিষয়টি স্থানীয়ভাবে আলোচনায় আসে। নিহতের আইনজীবী আজিজুর রহমান মানিক ও মামলাসংশ্লিষ্ট তৌহিদুল ইসলামও অতীতে মামলা নিয়ে সাত্তারকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ করেছেন।
এদিকে, নিহতের মেয়ে সেলিনা সুলতানা দাবি করেছেন, তিনজনকে একজনের পক্ষে হত্যা করা সম্ভব নয় এবং এর পেছনে আরও কেউ থাকতে পারেন। তাঁর দেওয়া অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তদন্ত করছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও কারা এর সঙ্গে জড়িত, তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
