https://www.emjanews.com/

17853

surplus

প্রকাশিত

১৬ আগস্ট ২০২৬ ২১:৪০

অন্যান্য

ভূমধ্যসাগরে অনাহারে ১১ বাংলাদেশির মৃত্যু

লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে নয় দিন সাগরে ভাসলেন ৪২ জন, উদ্ধার ৩০

প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৬ ২১:৪০

ছবি: সংগৃহীত

লিবিয়া থেকে সাগরপথে অবৈধভাবে গ্রিসে যাওয়ার সময় ভূমধ্যসাগরে অনাহার ও পানির সংকটে অন্তত ১১ বাংলাদেশি অভিবাসনপ্রত্যাশীর মৃত্যু হয়েছে। জীবিত উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, খাবার ও পানির অভাবে চোখের সামনেই কয়েকজনের মৃত্যু হয়। পরে মরদেহগুলোতে পচন ধরে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে সেগুলো সাগরে ফেলে দিতে বাধ্য হন জীবিতরা।

সোমবার (৩ আগস্ট) রাতে লিবিয়ার তাবারুক উপকূল থেকে ৪২ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে নিয়ে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। নৌকাটিতে থাকা ৪২ জনের মধ্যে ৩৮ জনই বাংলাদেশি বলে জানা গেছে।

যাত্রা শুরুর কিছুক্ষণ পরই নৌকাটি ঝড়ের কবলে পড়ে। এতে নৌকায় থাকা খাবার ও পানির মজুত সাগরে ভেসে যায়। এরপর খাবার ও পানি ছাড়াই বিপজ্জনক যাত্রা অব্যাহত রাখেন অভিবাসনপ্রত্যাশীরা।

গ্রিসের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর হঠাৎ নৌকাটির ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। এতে নৌকাটি সাগরের মধ্যে ভাসতে থাকে। এ সময় তাদের উদ্ধারে দালালের লোকজন কিংবা অন্য কোনো সংস্থা এগিয়ে আসেনি বলে জানিয়েছেন জীবিতরা।

টানা নয় দিন ভূমধ্যসাগরে ভেসে থাকার পর বাতাসের স্রোতে নৌকাটি মিশরের মারসা মাতরুহ উপকূলের কাছে পৌঁছায়। পরে মিশরের নিরাপত্তা বাহিনী তাদের উদ্ধার করে। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ১৮ জনকে মারসা মাতরুহ জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ থানার পাথারিয়া গ্রামের আব্দুল হেকিমের ছেলে আব্দুল করিম ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ‘আমরা ৪২ জন গ্রিসের উদ্দেশে রওয়ানা হয়েছিলাম। গ্রিসের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর আমাদের নৌকার ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে যায়। ফলে আর সামনে এগোতে পারিনি। এ সময় আমাদের উদ্ধার করতে দালালের লোকজন কিংবা অন্য কোনো সংস্থা এগিয়ে আসেনি।’

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে খাবার বা পানি কিছুই ছিল না। খাবার ও পানির অভাবে চোখের সামনেই নয়জন বাংলাদেশি মারা গেছেন। তাদের মরদেহ সাগরে ফেলে দিতে হয়েছে। পরে আরও দুজন মারা যান।’

দীর্ঘ সময় সাগরে ভেসে থাকার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আব্দুল করিম বলেন, ‘লবণাক্ত পানিতে থাকার কারণে আমাদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে পচন ধরেছে এবং দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।’

বর্তমানে মারসা মাতরুহ জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আব্দুল করিম দেশে ফেরার আকুতি জানিয়ে বলেন, ‘আমরা এখন হাসপাতালে ভর্তি। এখানকার চিকিৎসকরা আমাদের চিকিৎসা দিচ্ছেন এবং ভালো খাবারেরও ব্যবস্থা করছেন। আমাদের বাঁচান। আমরা দেশে ফিরে যেতে চাই।’

এদিকে আহত বাংলাদেশি নাগরিকদের বিষয়ে মিশরে বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে দূতাবাস জানায়, মারসা মাতরুহ জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. শরিফ এবং স্থানীয় পুলিশ স্টেশনের বাদরান নামের এক কর্মকর্তার সঙ্গে দূতাবাসের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে।

স্থানীয় পুলিশ দূতাবাসকে জানিয়েছে, তারা মোট ৩০ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেছে। এর মধ্যে ১৮ জনের শারীরিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় তাদের নিয়মিত চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। অন্যদের প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে পুলিশের হেফাজতে রাখা হয়েছে।

তবে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের জাতীয়তা সম্পর্কে স্থানীয় পুলিশ এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি বলে জানিয়েছে দূতাবাস।

দূতাবাস আরও জানায়, হাসপাতালে ভর্তি আহতদের চিকিৎসার অগ্রগতি ও সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। আহত বাংলাদেশি নাগরিকরা সুস্থ হয়ে উঠলে মিশরের সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। এরপর আটক বাংলাদেশিদের ট্রাভেল পারমিটের মাধ্যমে যত দ্রুত সম্ভব দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে।

লিবিয়া থেকে ইউরোপে পাড়ি জমানোর ঝুঁকিপূর্ণ এই যাত্রায় ১১ বাংলাদেশির মৃত্যুর ঘটনায় আবারও সামনে এসেছে মানবপাচারকারী ও দালালচক্রের ভয়াবহতার চিত্র। উন্নত জীবনের আশায় সাগরপথে যাত্রা করে খাবার-পানির অভাবে নয় দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে এসব অভিবাসনপ্রত্যাশীকে।