শিরোনাম
জেলা প্রশাসকের প্রেসরিলিজ: ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন প্রত্যাহার বাংলাদেশের মত ধর্মীয় সম্প্রীতির দেশ পৃথিবীর মধ্যে আর কোথাও নেই- বাণিজ্যমন্ত্রী রিয়াদ বিমানবন্দরে হুতি হামলায় নিহত ৩, ক্ষতিগ্রস্ত উড়োজাহাজ সিলেটে সুরমায় নির্মিত হবে ঝুলন্ত সেতু, সক্ষমতা বাড়বে কিনব্রিজের চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে দেশবিক্রির অভিযোগ অমূলক-বাণিজ্যমন্ত্রী দক্ষিণ সুরমায় রাসেল হত্যা মামলা: সুনামগঞ্জ থেকে ছাত্রদল নেতা ফাহিম ও সামাদ গ্রেফতার ​ চেলা নদীর পাড় কেটে ৫ কোটি টাকার বালু লুট, ৩৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা সিলেটের সুরমায় নতুন সেতু: নির্মাণের স্থান পরিদর্শনে আসছেন বাণিজ্যমন্ত্রী ৩ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ: আনোয়ারুজ্জামানের সাবেক এপিএসের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা সিলেট সীমান্তে ধরা পড়লো দেড় কোটি টাকার পণ্য

https://www.emjanews.com/

19449

sylhet

প্রকাশিত

০৯ অক্টোবর ২০২৬ ১৩:৫১

সিলেট

শ্রেণিকক্ষে শুধু শিশু নয়, বসেন অভিভাবকরাও; ব্যতিক্রমী পাঠদানে সাড়া ফেলেছে শ্রীমঙ্গলের স্কুল

প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬ ১৩:৫১

ছবি: বিডিনিউজ থেকে সংগৃহীত

বিশেষ ক্লাস, সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও পাঠদান, সঙ্গে সাংস্কৃতিক চর্চা ও নৈতিক শিক্ষার সমন্বয়-এভাবেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে আলাদা পরিচিতি গড়ে তুলেছে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল চন্দ্রনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এখানকার শ্রেণিকক্ষে কখনো সন্তানদের পাশে বসেন অভিভাবকেরাও।

শিক্ষকদের পাঠদানের কৌশল দেখে বাড়িতে সন্তানদের পড়াশোনায় সহায়তা করাই তাঁদের উদ্দেশ্য। মাত্র ১৩ শতক জমিতে ৭২২ শিক্ষার্থীর এই বিদ্যালয়টি পড়াশোনার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও কাব স্কাউটিংয়েও অর্জন করেছে উল্লেখযোগ্য সাফল্য।

শিশুদের পড়াশোনার অগ্রগতি নিশ্চিত করতে শুধু শ্রেণিকক্ষের পাঠদানেই সীমাবদ্ধ থাকছে না শ্রীমঙ্গল চন্দ্রনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অভিভাবকদেরও যুক্ত করা হচ্ছে পাঠদানের প্রক্রিয়ায়। কখনো কখনো সন্তানদের সঙ্গে শ্রেণিকক্ষে বসে শিক্ষকদের পাঠদান পর্যবেক্ষণ করেন তাঁরা। পরে বাড়িতে একই পদ্ধতিতে সন্তানদের পড়াশোনায় সহায়তা করেন।

বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক জহর তরফদার দায়িত্ব নেওয়ার পর শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা, পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বাড়তি পাঠদান এবং অভিভাবকদের সম্পৃক্ত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন।

পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য শুক্র ও শনিবারও বিশেষ ক্লাসের ব্যবস্থা রয়েছে। সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত চলে বিশেষ পাঠদান। এরপর দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলে নিয়মিত ক্লাস। কোনো কোনো বিশেষ ক্লাস পরিচালনা করেন প্রধান শিক্ষক নিজেই।

বিদ্যালয়টির পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী দেবার্ঘ দেবের মা দেবাদৃতি পাল চৌধুরী বলেন, বিশেষ ক্লাসের পাশাপাশি কখনো কখনো তাঁদেরও সন্তানদের সঙ্গে শ্রেণিকক্ষে বসতে হয়। সেখানে শিক্ষকেরা কীভাবে পড়া বোঝান, তা দেখে বাড়িতে সন্তানদের পড়াতে সুবিধা হয়।

অতিরিক্ত এই ক্লাসের জন্য শিক্ষার্থীদের কোনো বাড়তি ফি দিতে হয় না।

শ্রীমঙ্গল সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক লোকমান হোসেনের মেয়ে আদিবা হোসেনও এই বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী। লোকমান হোসেনের মতে, বিদ্যালয়টির পাঠদানের মান ভালো। এখানে পড়ার কারণে তাঁর মেয়ের শিক্ষার ভিত্তি আগের তুলনায় অনেক মজবুত হয়েছে।

তিনি বলেন, বিদ্যালয়ের নিয়মকানুন ও পাঠদান পদ্ধতির সঙ্গে শিক্ষার্থীরা ভালোভাবে মানিয়ে নিতে পারলে পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা কমে যায়।

বিদ্যালয়টির শিক্ষকেরা মনে করেন, ভালো ফলাফলই শিক্ষার একমাত্র লক্ষ্য নয়। শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, শৃঙ্খলা, বড়দের প্রতি শ্রদ্ধা, নেতৃত্বের গুণাবলি এবং সাংস্কৃতিক মননও গড়ে তোলা জরুরি।

এ কারণে নিয়মিত পড়াশোনার পাশাপাশি আবৃত্তি, নাচ, গান ও অভিনয়ের মতো সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে শিক্ষার্থীদের। আগ্রহ অনুযায়ী তাদের বিভিন্ন দলে ভাগ করা হয়। প্রতিটি দলের কার্যক্রম তদারকির জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকও রয়েছেন।

বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক প্রণবেশ চৌধুরী অন্তুর ভাষ্য, তাঁরা শুধু পাঠ্যবইয়ের পড়াশোনায় গুরুত্ব দেন না। শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ও দক্ষতা অনুযায়ী বিভিন্ন দলে যুক্ত করে সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।

এর পাশাপাশি কাব স্কাউটিংয়েও বিদ্যালয়টির সাফল্য উল্লেখযোগ্য। গত এক দশকে বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা ১০০টিরও বেশি ‘শাপলা কাব অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন করেছে। বাংলাদেশ স্কাউটসের কাব শাখায় ৬ থেকে ১১ বছর বয়সী শিশুদের জন্য এটি সর্বোচ্চ সম্মাননা।

২০২১ সালে এই বিদ্যালয় থেকে ১২ জন শিক্ষার্থী পুরস্কারের জন্য অংশ নিয়ে সাতজনই শাপলা কাব অ্যাওয়ার্ড অর্জন করে। পরবর্তী বছরগুলোতেও সাত থেকে নয়জন শিক্ষার্থী এ সম্মাননা পেয়েছে। ২০২৫ সালেও পুরস্কার অর্জন করে সাতজন।

শিক্ষক প্রণবেশ চৌধুরী জানান, জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায়ও বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা সাফল্য পেয়েছে।

এত সাফল্যের মধ্যেও বিদ্যালয়টির বড় সীমাবদ্ধতা জায়গার সংকট। মাত্র ১৩ শতক জমির ওপর গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে পড়াশোনা করছে ৭২২ জন শিক্ষার্থী। শ্রীমঙ্গল উপজেলার ১৩৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে এটিতেই শিক্ষার্থীসংখ্যা সবচেয়ে বেশি বলে জানিয়েছে স্থানীয় শিক্ষা কার্যালয়।

বিদ্যালয়টির সুনাম ছড়িয়ে পড়ায় বিভিন্ন এলাকা থেকে অভিভাবকেরা সন্তানদের এখানে ভর্তি করাতে আসেন। কিন্তু পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় চাইলেও অনেক শিক্ষার্থীকে ভর্তি করা সম্ভব হয় না।

সহকারী শিক্ষক মহামায়া শর্মা বন্যা বলেন, অল্প জায়গায় বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে পাঠদান করতে হচ্ছে। জমির পরিমাণ বাড়ানো গেলে এবং আগের মতো দুই পালায় ক্লাস চালু করা সম্ভব হলে আরও শিক্ষার্থীকে ভর্তির সুযোগ দেওয়া যেত।

প্রধান শিক্ষক জহর তরফদারের মতে, বিদ্যালয়ের সাফল্য এক দিনে আসেনি। দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, ধৈর্য ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফলেই শিক্ষার্থীদের এই অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে।

কাব স্কাউটিং ও বৃত্তি পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের সাফল্য শিক্ষকদের বাড়তি শ্রমকে সার্থক করেছে বলে মনে করেন তিনি। তবে শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করানোতেই তাঁদের লক্ষ্য সীমাবদ্ধ নয়।

জহর তরফদার বলেন, একবিংশ শতাব্দীর উপযোগী দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলাই তাঁদের প্রচেষ্টার মূল উদ্দেশ্য। ভালো ফলাফলের পাশাপাশি নৈতিকতা, সাংস্কৃতিক সচেতনতা, শৃঙ্খলা ও নেতৃত্বের গুণাবলি অর্জন করুক শিশুরা; এটাই তাঁদের প্রত্যাশা।

বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক লাভলী দত্ত জানান, তিনি যত দিন ধরে এখানে কাজ করছেন, তত দিনই প্রধান শিক্ষককে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা ক্লাস নিতে দেখেছেন। শুক্র ও শনিবারেও তিনি সময় দেন। এর সুফলও পাওয়া যাচ্ছে। প্রাথমিকের পাঠ শেষ করে এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ভালো ভালো মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে।

চন্দ্রনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কার্যক্রম স্থানীয় শিক্ষা কর্মকর্তাদেরও নজর কেড়েছে। শ্রীমঙ্গল উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, সীমিত জায়গা ও বিপুল শিক্ষার্থী থাকা সত্ত্বেও বিদ্যালয়টির শিক্ষক, বিশেষ করে প্রধান শিক্ষক, শিশুদের জন্য বাড়তি শ্রম দিচ্ছেন।

তিনি জানান, বিভিন্ন সভা ও আলোচনায় বিদ্যালয়টির উদাহরণ তুলে ধরা হয়। এতে অন্য বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরাও নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে ভালো কাজ করতে উৎসাহিত হচ্ছেন।

রফিকুল ইসলামের মতে, শিক্ষকদের আন্তরিকতা, অভিভাবকদের সম্পৃক্ততা, বিদ্যালয়ের অবস্থান ও যোগাযোগব্যবস্থা; সব মিলিয়েই প্রতিষ্ঠানটির অগ্রগতিতে ভূমিকা রেখেছে।

শিক্ষার্থীদের বৃত্তি পরীক্ষার ফলেও সেই সাফল্যের প্রতিফলন দেখা গেছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে শ্রীমঙ্গলে আয়োজিত এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে উপজেলার ৪৫টি সরকারি ও বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১২৯ জন বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীকে সম্মাননা দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে ৩৪ জনই ছিল চন্দ্রনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।

অনুষ্ঠানে বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা সাংস্কৃতিক পরিবেশনায়ও অংশ নেয়। তাদের পরিবেশনা উপস্থিত দর্শকদের প্রশংসা অর্জন করে।

চন্দ্রনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাফল্যের কথা পৌঁছেছে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছেও। মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী জানান, বিদ্যালয়টির অর্জনের কথা তিনি শুনেছেন এবং এর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও দেখেছেন।

তিনি বিদ্যালয়টি পরিদর্শনে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে অন্য বিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরও নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে ভালো কাজ করে পরিচিতি অর্জনের আহ্বান জানান তিনি।

শিক্ষার্থীদের পাঠদানে অভিভাবকদের অংশগ্রহণ, বাড়তি ক্লাস, সৃজনশীল কর্মকাণ্ড ও শিক্ষকদের আন্তরিকতা; সব মিলিয়ে শ্রীমঙ্গলের এই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি হয়ে উঠেছে ব্যতিক্রমী এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তবে শিক্ষার্থীর তুলনায় জমির স্বল্পতা কাটিয়ে উঠতে পারলে বিদ্যালয়টি আরও বেশি শিশুকে মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ দিতে পারবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।