ছবি: সংগৃহীত
ইট-পাথরের নগরে নীল-সাদা রঙে, গান-কবিতা আর নৃত্যের ছন্দে শরতের বন্দনা; শ্রুতি সিলেটের রজতজয়ন্তী পূর্তি উপলক্ষে প্রকৃতি ও বাংলার ঐতিহ্যকে নতুন করে উদ্যাপন
নির্মল নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, বাতাসে দুলতে থাকা শুভ্র কাশফুল আর শিউলির স্নিগ্ধ সুবাস-শরৎ আসে প্রকৃতির ক্যানভাসে এক অপার্থিব সৌন্দর্যের রং ছড়িয়ে। কখনো রোদ-মেঘের লুকোচুরি, কখনো সোনালি রোদের ঝিলিক, আবার কখনো জ্যোৎস্নার মায়াবী আলোয় প্রকৃতি মেলে ধরে তার অনিন্দ্য রূপ। কিন্তু ইট-পাথরের নগরে সেই শরৎকে চেনা কঠিন। নাগরিক ব্যস্ততা আর যান্ত্রিক জীবনের ভিড়ে প্রকৃতির ঋতুবদলের বার্তা অনেক সময়ই থেকে যায় অগোচরে। এমন বাস্তবতায় শরৎকে নগরজীবনে ফিরিয়ে আনার এক নান্দনিক প্রয়াস হয়ে উঠল শ্রুতি সিলেটের বর্ণাঢ্য শরৎ উৎসব।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বিকেল থেকে সিলেটের কবি নজরুল অডিটোরিয়ামের মুক্তমঞ্চে গান, কবিতা, আবৃত্তি ও নৃত্যের মূর্ছনায় উদ্যাপিত হয় এই উৎসব। শ্রুতি সিলেটের রজতজয়ন্তী পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এ অনুষ্ঠান নগরবাসীকে নিয়ে যায় প্রকৃতির স্নিগ্ধতায়, বাঙালির ঋতুবন্দনার চিরায়ত আবহে। নীল-সাদা শাড়িতে সজ্জিত নারীদের উপস্থিতি, খোঁপায় ও হাতে ফুলের সাজ আর মঞ্চজুড়ে শরৎবন্দনার পরিবেশনায় উৎসবস্থল হয়ে ওঠে ঋতুর সৌন্দর্য উদ্যাপনের এক মনোরম প্রাঙ্গণ।
শরৎ যেন সেদিন কেবল প্রকৃতির ঋতু হয়ে থাকেনি, হয়ে উঠেছিল মানুষের হৃদয়ে সৌন্দর্য, সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক সম্মিলিত উচ্চারণ।
উৎসবের উদ্বোধনী পর্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। স্বাগত বক্তব্য দেন শ্রুতি সিলেটের সদস্যসচিব সুকান্ত গুপ্ত।
উদ্বোধনী পর্বে আরও অংশ নেন বরেণ্য নজরুলসংগীতশিল্পী হিমাংশু বিশ্বাস, নন্দিত আবৃত্তিশিল্পী মোকাদ্দেস বাবুল, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী রানা কুমার সিনহা, নাট্যব্যক্তিত্ব শামসুল বাসিত শেরো, নীলাঞ্জন দাশ টুকু, প্রতীক এন্দ, অনিমেষ বিজয় চৌধুরী রাজু, লোকগবেষক সুমন কুমার দাশ, আবদুল করিম কিম এবং শ্রুতি সমন্বয়ক সুমন্ত গুপ্তসহ বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা।
বক্তারা বলেন, সোনালি রোদ্দুরের ঝিলিক, রাতের জ্যোৎস্নায় মুগ্ধতা আর নদীতীরের বনে বনে কাশফুলের শুভ্রতা; সব মিলিয়ে শরৎ বাংলার প্রকৃতিকে দেয় এক অনন্য সৌন্দর্য। কাশফুলের দোলায় মুগ্ধ হন না, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। প্রকৃতির এই সৌন্দর্য শুধু উপভোগের বিষয় নয়, একে রক্ষা করাও সবার দায়িত্ব।
তাঁরা আরও বলেন, ঋতুবৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ বাংলাদেশের প্রকৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের আত্মিক সম্পর্ক অটুট রাখা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলার ঋতুভিত্তিক ঐতিহ্য তুলে ধরতে এ ধরনের আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দীর্ঘ ২৫ বছরের সাংস্কৃতিক পথচলায় শ্রুতি সিলেট আয়োজন করেছে আলোরমিছিল, বর্ণমালার মিছিল, ‘আঁধার ভেঙে আসুক’, পিঠা উৎসব, বর্ষবরণ উৎসব, বর্ষা উৎসব ও শরৎ উৎসবসহ নানা আয়োজন। এসব কর্মসূচির মধ্য দিয়ে সংগঠনটি আবহমান বাংলার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
শরৎ উৎসবের আয়োজনেও সেই ধারাবাহিকতার প্রতিফলন দেখা যায়। প্রকৃতির সৌন্দর্যকে কেন্দ্র করে গান, কবিতা ও নৃত্যের পরিবেশনা যেমন দর্শকদের মুগ্ধ করেছে, তেমনি বাঙালির সাংস্কৃতিক শিকড়ের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের পরিচয় ঘটানোর সুযোগও তৈরি করেছে।
সংস্কৃতিচর্চা যে কেবল বিনোদনের অনুষঙ্গ নয়, বরং মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করা এবং সমাজে সৌন্দর্যবোধ ও সম্প্রীতি ছড়িয়ে দেওয়ার শক্তিশালী মাধ্যম; শ্রুতি সিলেটের দীর্ঘ পথচলা সেই বার্তাই বহন করে। আয়োজকদের এই প্রয়াস আগামীর মানবিক বাংলাদেশ গঠনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন বক্তারা।
অর্ধদিবসব্যাপী উৎসবের মূল আকর্ষণ ছিল গান, কবিতা, আবৃত্তি ও নৃত্যের বর্ণাঢ্য পরিবেশনা। ‘শরৎ কথন’ পর্বে ঋতুবৈচিত্র্যের দেশ বাংলাদেশের প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষার আহ্বান জানানো হয়। শিল্পীদের পরিবেশনায় মঞ্চে উঠে আসে শরতের স্নিগ্ধতা, বাংলার প্রকৃতির রূপ আর মানুষের সঙ্গে ঋতুর নিবিড় সম্পর্ক।
সমবেত নৃত্য, সংগীত ও আবৃত্তি পরিবেশন করেন শ্রুতি সিলেট, গীতবিতান বাংলাদেশ, নৃত্যশৈলী, নৃত্যরথ, ললিত মঞ্জরী, সুরের ভুবন, পরম্পরা ও সুর সপ্তকের শিল্পীরা।
একক পরিবেশনায় অংশ নেন শামীম আহমেদ, প্রদীপ মল্লিক, ইকবাল শাঁই, খোকন ফকির, লিংকন দাশ, আশরাফুল ইসলাম অনি, অরুনিমা দাশ ও গোলাম কিবরিয়া শিমুলসহ অন্য শিল্পীরা। তাঁদের পরিবেশনায় শরৎ উৎসবের মঞ্চ হয়ে ওঠে সংগীত, ছন্দ ও কাব্যিক অনুভূতির এক সম্মিলিত মিলনমেলা।
সাংস্কৃতিক পর্বে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনার অনিরুদ্ধ দাশ।
প্রকৃতির শরৎ প্রতিবছরই আসে। আকাশে মেঘ ভাসে, কাশবন দোলে, শিউলি ঝরে। কিন্তু নগরের ব্যস্ত মানুষের কাছে সেই সৌন্দর্য পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রয়োজন হয় এমন কিছু আয়োজনের, যা মানুষকে দৈনন্দিনতার গণ্ডি থেকে বের করে নিয়ে যায় প্রকৃতি ও সংস্কৃতির কাছে।
শ্রুতি সিলেটের শরৎ উৎসব ছিল তেমনই এক আয়োজন। যেখানে শরৎকে শুধু ঋতু হিসেবে নয়, বাঙালির অনুভূতি, ঐতিহ্য ও নান্দনিকতার অংশ হিসেবে উদ্যাপন করা হয়েছে। গান-কবিতা-নৃত্যের আবহে নগরবাসী খুঁজে পেয়েছেন প্রকৃতির সঙ্গে নতুন করে সংযোগ স্থাপনের উপলক্ষ।
জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অর্ধদিবসব্যাপী এই আয়োজনের সমাপ্তি ঘটে। তবে মঞ্চের আলো নিভে গেলেও শরতের শুভ্রতা, গানের সুর আর সংস্কৃতির অনুরণন যেন থেকে যায় দর্শকদের মনে।
নীল আকাশের বুকে সাদা মেঘ যেমন প্রকৃতিকে সাজায়, তেমনি সংস্কৃতির এমন আয়োজন নাগরিক জীবনেও ছড়িয়ে দেয় সৌন্দর্য ও মানবিকতার আলো। শ্রুতি সিলেটের বর্ণাঢ্য শরৎ উৎসব সেই আলোরই এক স্নিগ্ধ উদ্যাপন; যেখানে প্রকৃতি, মানুষ ও সংস্কৃতি মিলেমিশে একাকার হয়ে ছিল।
