সৌদি আরবে মক্কার একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কর্মকাণ্ডের’ অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশি নাগরিক নজরুল ইসলাম আব্দুল বাসির ও সিটি আক্তার স্বামী-স্ত্রী কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে প্রশ্ন। সৌদি কর্তৃপক্ষ তাদের নাম প্রকাশ করলেও পারিবারিক সম্পর্কের বিষয়ে কোনো তথ্য জানায়নি। অন্যদিকে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশি কনস্যুলেটকে জানানো হয়েছিল কি না, তা নিয়ে কূটনৈতিক ও আইনি প্রশ্ন উঠেছে।
বাংলাদেশের জেদ্দা কনস্যুলেট জেনারেল জানিয়েছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তাদের এ বিষয়ে জানানো হয়নি। ঘটনার বিস্তারিত জানতে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে কূটনৈতিক চিঠি পাঠানো হয়েছে। দুই বাংলাদেশির পরিচয় ও নাগরিকত্বের তথ্য যাচাইয়ের পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এবং বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কেও জানতে চেয়েছে বাংলাদেশ সরকার।
স্বামী-স্ত্রী কি না, নিশ্চিত তথ্য নেই
সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি এবং দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সৌদি প্রেস এজেন্সিতে প্রকাশিত তথ্যে দুই বাংলাদেশির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তারা স্বামী-স্ত্রী ছিলেন কি না, সে বিষয়ে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তাদের একজন পুরুষ ও একজন নারী হিসেবে পরিচয় প্রকাশ করা হলেও শুধু এ তথ্যের ভিত্তিতে তাদের স্বামী-স্ত্রী বলা যায় না। এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য বা পরিবারের বক্তব্য পাওয়া না পর্যন্ত তাদের সম্পর্ক নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
কী অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড
সৌদি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, মক্কা অঞ্চলের একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কর্মকাণ্ডে’ জড়িত থাকার অভিযোগে ওই দুই বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তদন্ত শেষে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে আদালতে পাঠানো হয়। আদালত অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ইসলামি আইনের তাজির বিধানের আওতায় তাদের মৃত্যুদণ্ড দেন।
সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, অপরাধের গুরুত্ব এবং সময় ও স্থানের পবিত্রতা লঙ্ঘনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এ সাজা দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিচারিক কর্তৃপক্ষ রায় বহাল রাখার পর রাজকীয় আদেশে ১৪ অক্টোবর তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
তবে ঠিক কী ধরনের কর্মকাণ্ডের অভিযোগ আনা হয়েছিল, মক্কার কোন মসজিদে ঘটনাটি ঘটেছিল এবং তাদের কবে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, সে বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ বিস্তারিত জানায়নি।
ভিয়েনা সনদ কী বলে
কনস্যুলার সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা সনদে বিদেশে আটক নাগরিকদের কনস্যুলার সহায়তা পাওয়ার অধিকার এবং কোনো বিদেশি নাগরিকের মৃত্যুর ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কনস্যুলেটকে অবহিত করার বিধান রয়েছে। বাংলাদেশ ও সৌদি আরব উভয়ই এ সনদের পক্ষভুক্ত।
সনদের ৩৬ অনুচ্ছেদের ১(খ) উপধারা অনুযায়ী, কোনো বিদেশি নাগরিক আটক হলে তিনি অনুরোধ করলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তার দেশের কনস্যুলার কার্যালয়কে বিলম্ব না করে জানাতে হবে। আটক ব্যক্তিকে এ অধিকার সম্পর্কেও অবহিত করতে হবে। একই অনুচ্ছেদের ১(গ) উপধারায় কনস্যুলার কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সাক্ষাতের সুযোগের কথা বলা হয়েছে।
অন্যদিকে, সনদের ৩৭ অনুচ্ছেদের (ক) উপধারায় বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয় তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে থাকলে কোনো বিদেশি নাগরিকের মৃত্যুর ঘটনায় সংশ্লিষ্ট এলাকার কনস্যুলেটকে বিলম্ব না করে জানাতে হবে।
তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বিদেশি নাগরিকের নিজ দেশের দূতাবাসকে আলাদাভাবে জানাতেই হবে, এমন নির্দিষ্ট বিধান এসব অনুচ্ছেদে সরাসরি উল্লেখ নেই। এ কারণে শুধু মৃত্যুদণ্ডের আগাম নোটিশ না পাওয়ার তথ্যের ভিত্তিতে সনদ লঙ্ঘিত হয়েছে বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। আটক অবস্থায় কনস্যুলার অধিকার জানানো হয়েছিল কি না, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সহায়তা চেয়েছিলেন কি না এবং কর্তৃপক্ষ কী তথ্য পেয়েছিল, সেগুলোও গুরুত্বপূর্ণ।
মৃত্যুদণ্ডের তথ্য জানত না বাংলাদেশ
জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সৌদি কর্তৃপক্ষ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তাদের জানায়নি। গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর কনস্যুলেট সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে আনুষ্ঠানিক তথ্য চেয়ে কূটনৈতিক চিঠি পাঠায়।
১৮ অক্টোবর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সৌদি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক করে দুই নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য চায়। সরকার জানতে চেয়েছে, তাদের নাগরিকত্ব, মামলার অভিযোগ, বিচারপ্রক্রিয়া এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরিস্থিতি সম্পর্কে।
দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সেপ্টেম্বরে সৌদি কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশি বন্দিদের একটি তালিকা কনস্যুলেটকে দিয়েছিল। ওই তালিকায় দুই ব্যক্তির নাম ছিল বলে বাংলাদেশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তবে তাদের মৃত্যুদণ্ডের রায়ের তথ্য তালিকায় ছিল না। ফলে তালিকার নামের সঙ্গে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনাটি নিশ্চিতভাবে মেলানো সম্ভব হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
