ছবি- সংগৃহীত
সিলেটের আলোচিত রায়হান আহমদ (৩৪) হত্যা মামলায় ছয় আসামির মধ্যে একজনকে মৃত্যুদণ্ড, দুজনকে যাবজ্জীবন ও তিনজনকে সাত বছর করে কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। তবে রায় ঘোষণার সময় ছয় আসামির মধ্যে কেবল কারাগারে থাকা সহকারী উপপরিদর্শক আশেক এলাহী আদালতে উপস্থিত ছিলেন। বাকি পাঁচ আসামি পলাতক রয়েছেন। দণ্ডপ্রাপ্ত এসব আসামির বর্তমান অবস্থান ও তাঁদের গ্রেপ্তারের ইতিহাস নিয়ে রয়েছে নানা তথ্য ও অভিযোগ।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিকেল ৩টা ২০ মিনিটের দিকে সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক আব্দুল মজিদ মুন্সী এ রায় ঘোষণা করেন। আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ মুমিনুল ইসলাম মোমিন রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
আকবর হোসেন ভূঁইয়া (৩২): মৃত্যুদণ্ড, পলাতক
রায়হান হত্যা মামলার প্রধান আসামি বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন ইনচার্জ উপপরিদর্শক আকবর হোসেন ভূঁইয়া। আদালত তাঁকে মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড দিয়েছেন। ২০২০ সালের ১৩ অক্টোবর পুলিশি হেফাজত থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর তিনি আত্মগোপনে ছিলেন।
পরে ২০২০ সালের ৯ নভেম্বর সিলেটের কানাইঘাট সীমান্তবর্তী ডোনা এলাকা থেকে তাঁকে আটক করে পুলিশ। সে সময় পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, জেলা পুলিশের একটি দল তাঁকে গ্রেপ্তার করে। তবে সীমান্ত এলাকার অন্য একটি সূত্রের দাবি ছিল, আকবর ভারতের সীমান্তসংলগ্ন একটি খাসিয়া পল্লিতে অবস্থান করছিলেন। সেখান থেকে তাঁকে বাংলাদেশে পাঠানোর পর পুলিশ আটক করে।
দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার পর ২০২৫ সালের আগস্টে উচ্চ আদালত থেকে জামিন পান আকবর। পরে জামিন স্থগিত হওয়া এবং নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেওয়া হলেও তিনি আদালতে হাজির হননি। বর্তমানে তিনি পলাতক। রায়হানের পরিবারের অভিযোগ, জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর আকবর ভারতে পালিয়ে গেছেন। তবে তাঁর বর্তমান অবস্থান নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
মো. হারুন অর রশিদ (৩২): যাবজ্জীবন, পলাতক
মামলার অন্যতম আসামি বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির কনস্টেবল মো. হারুন অর রশিদকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাঁকে এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মামলার তদন্তের সময় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তবে রায় ঘোষণার সময় তিনি আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। বর্তমানে তাঁর অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
টিটু চন্দ্র দাস (৩৮): যাবজ্জীবন, পলাতক
একই ফাঁড়ির কনস্টেবল টিটু চন্দ্র দাসকেও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড দিয়েছেন আদালত। রায় ঘোষণার সময় তিনিও অনুপস্থিত ছিলেন। মামলার অন্য পাঁচ আসামির মতো তিনিও পলাতক রয়েছেন।
আশেক এলাহী (৪৩): সাত বছরের কারাদণ্ড, কারাগারে
মামলার সহকারী উপপরিদর্শক আশেক এলাহীকে সাত বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। রায় ঘোষণার সময় ছয় আসামির মধ্যে একমাত্র তিনিই আদালতে উপস্থিত ছিলেন। তিনি কারাগারে রয়েছেন। মামলার রায় ঘোষণার আগে থেকেই তিনি কারাবন্দী ছিলেন। ২০২০ সালের ২৯ অক্টোবর ভোরে সিলেট পুলিশ লাইন্স থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
মো. হাসান উদ্দিন (৩২): সাত বছরের কারাদণ্ড, পলাতক
বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন উপপরিদর্শক ও দ্বিতীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. হাসান উদ্দিনকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। রায় ঘোষণার সময় তিনি আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। বর্তমানে তিনিও পলাতক রয়েছেন।
আবদুল্লাহ আল নোমান (৩২): সাত বছরের কারাদণ্ড, পলাতক
মামলার অপর আসামি সংবাদকর্মী আবদুল্লাহ আল নোমানকে সাত বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। তিনি আকবর হোসেন ভূঁইয়ার আত্মীয় এবং কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা। রায় ঘোষণার সময় তিনিও আদালতে অনুপস্থিত ছিলেন। তাঁর বর্তমান অবস্থান নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তিনি ফ্রান্সে অবস্থান করছেন বলে গুঞ্জন থাকলেও এর সত্যতা নিশ্চিত করার মতো তথ্য পাওয়া যায়নি।
যেভাবে রায়হানের মৃত্যু
২০২০ সালের ১০ অক্টোবর রাতে সিলেট মহানগর পুলিশের বন্দরবাজার ফাঁড়িতে নিয়ে রায়হান আহমদকে নির্যাতন করা হয়। পরদিন ১১ অক্টোবর তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় রায়হানের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন। পরে তদন্তে নির্যাতনের সত্যতা পাওয়া যায়।
ঘটনার পর তৎকালীন ফাঁড়ির ইনচার্জ আকবর হোসেন ভূঁইয়াসহ চার পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং তিনজনকে প্রত্যাহার করা হয়। ২০২১ সালের ৫ মে মামলার তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়। এতে ছয়জনকে আসামি করা হয়। একই বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর মামলার বিচার শুরু হয়।
প্রায় ছয় বছর পর আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করা হলো। তবে দণ্ডপ্রাপ্ত পাঁচ আসামি পলাতক থাকায় তাঁদের সাজা কার্যকর করা নিয়ে এখন সামনে আসছে গ্রেপ্তারের বিষয়টি।
অপরদিকে, রায় ঘোষণার সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন রায়হানের মা সালমা বেগম। এসময় গণমাধ্যমের সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘রায়ে আমি সন্তুষ্ট। এখন প্রধান অভিযুক্ত আকবর হোসেন ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে রায় কার্যকর করলে আমরা শান্তি পাবো। রায়হানের আত্মাও শান্তি পাবে।
আসামিরা জামিন পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ ৬ বছর পর আজ রায় ঘোষিত হলো। কিন্তু আমার রায়হানকে যারা নির্যাতন করে মারছে তারা তো পালিয়ে গেছে। আমি দ্রুত তাদের গ্রেপ্তার এবং রায় কার্যকরের দাবি জানাচ্ছি।’
