https://www.emjanews.com/

8703

sylhet

প্রকাশিত

২১ আগস্ট ২০২৫ ১৩:০৮

আপডেট

২১ আগস্ট ২০২৫ ১৩:১৮

সিলেট

সাদাপাথর লুট

নিয়ম করে নির্ধারিত হারে ঘুষ আদায় করত পুলিশ, প্রশাসন ও বিজিবি: দুদক

খনিজসম্পদ উন্নয়ন ব্যুরো (বিএমডি) আইন অনুযায়ী অবৈধ খনিজ উত্তোলন ঠেকানোর ক্ষমতা রাখলেও এ ঘটনায় কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার খান মো. রেজা-উন-নবীর ৮ জুলাই দেওয়া বক্তব্যকেও পাথর লুটকারীদের উৎসাহদাতা হিসেবে উল্লেখ করেছে দুদক।

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৫ ১৩:০৮

ছবি: ইমজা নিউজ

নিয়মিত নিয়ম করে প্রতিনিধি নিয়োগ দিয়ে ঘুষের টাকা আদায় করত পুলিশ, প্রশাসন ও বিজিবি। সিলেটের ভোলাগঞ্জে সাদা পাথর লুটপাটের ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রাথমিক অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য। কয়েক শ কোটি টাকার পাথর লুটে সরাসরি জড়িত থাকার পাশাপাশি পরোক্ষভাবে আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছেন সরকারি বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও স্থানীয় প্রভাবশালীরা।

দুদকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভোলাগঞ্জের সাদা পাথর এলাকা থেকে রাষ্ট্রীয় সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। খনিজসম্পদ অধিদপ্তর, সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, গত এক বছরে দায়িত্ব পালন করা কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চারজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি এবং স্থানীয় বিজিবি সদস্যদের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

১৩ আগস্ট দুদকের উপপরিচালক রাফী মো. নাজমুস সা’দাতের নেতৃত্বে একটি টিম সরেজমিন তদন্ত চালায়। তারা দেখতে পান, সংরক্ষিত পর্যটন এলাকা হওয়া সত্ত্বেও দিনের আলোয় নির্বিচারে পাথর উত্তোলন চলছে। তদন্তে আরও উঠে আসে, উত্তোলিত পাথর প্রথমে স্থানীয় ক্রাশার মেশিনে জমা করে ভেঙে ফেলা হয়, যাতে সরকারি সম্পদের লুটপাট আড়াল করা যায়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, খনিজসম্পদ উন্নয়ন ব্যুরো (বিএমডি) আইন অনুযায়ী অবৈধ খনিজ উত্তোলন ঠেকানোর ক্ষমতা রাখলেও এ ঘটনায় কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার খান মো. রেজা-উন-নবীর ৮ জুলাই দেওয়া বক্তব্যকেও পাথর লুটকারীদের উৎসাহদাতা হিসেবে উল্লেখ করেছে দুদক।

এ ছাড়া সিলেটের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদ এবং কোম্পানীগঞ্জের চারজন ইউএনও—আজিজুন্নাহার, মোহাম্মদ আবুল হাছনাত, ঊর্মি রায় ও আবিদা সুলতানার বিরুদ্ধে অবহেলা ও নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, তারা নামমাত্র কিছু পদক্ষেপ নিলেও কার্যত কোনো উদ্যোগ নেননি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে বর্তমান পর্যন্ত কর্মরত কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চারজন ইউএনওকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পাথরকাণ্ডের জন্য দায়ী করা হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়, গত এক বছরে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় বিশেষ করে সাদা পাথর পর্যটন এলাকায় দিনে-দুপুরে উপজেলা প্রশাসনের সামনেই লুটপাট হয়েছে। ওই সময়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসাবে আজিজুন্নাহার, মোহাম্মদ আবুল হাছনাত, ঊর্মি রায় ও আবিদা সুলতানা দায়িত্বে ছিলেন। 

সিলেটের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমানও পাথর লুট ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেননি। কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি উজায়ের আল মাহমুদ আদনান ও সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যরা প্রতি ট্রাক ও নৌকা থেকে কমিশন নিয়ে লুটকারীদের সহযোগিতা করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অবৈধভাবে উত্তোলিত প্রতিটি ট্রাকে প্রায় ৫০০ ঘনফুট পাথর লোড করা হয়। পরিবহন ভাড়া ছাড়া প্রতি ট্রাকের পাথরের দাম ধরা হয় ৯১ হাজার টাকা। এর মধ্যে প্রতি ট্রাক থেকে দশ হাজার টাকা পুলিশ ও প্রশাসনের জন্য আলাদা করা হতো। বাকি ৮১ হাজার টাকা অবৈধভাবে উত্তোলনকারীরা নিজেদের মধ্যে বণ্টন করে নিত। ওই ১০ হাজার টাকার মধ্যে পুলিশের জন্য ৫ হাজার এবং উপজেলা প্রশাসনের জন্য ৫ হাজার টাকা ভাগ করা হতো। এছাড়া অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন কাজে ব্যবহৃত প্রতিটি বারকি নৌকা থেকে এক হাজার টাকা নেওয়া হতো, যার মধ্যে পুলিশ বিভাগ ৫০০ টাকা এবং প্রশাসন (ডিসি ও ইউএনও) ৫০০ টাকা পেত। পুলিশ নির্দিষ্ট সোর্সের মাধ্যমে প্রতিটি ট্রাক ও নৌকা থেকে এসব চাঁদা বা অবৈধ অর্থ সংগ্রহ করত।

বিজিবির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে দুদক। ভোলাগঞ্জ এলাকায় তিনটি পোস্ট থাকার পরও তারা নৌকা ও ট্রাকের মাধ্যমে অবৈধ পাথর উত্তোলন চলতে দিয়েছে এবং বিনিময়ে অর্থ নিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সাদা পাথর এলাকায় ৩টি বিজিবি পোস্ট রয়েছে, যেগুলো লুটের ঘটনাস্থল থেকে ৫০০ মিটার দূরত্বেরও কম। এত কম দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও কোম্পানি কমান্ডার ইকবাল হোসেনসহ বিজিবি সদস্যরা আর্থিক সুবিধা গ্রহণ ও নিষ্ক্রিয় থাকার কারণে অবৈধ উত্তোলনকারীরা সহজেই লুটপাট চালিয়েছে। বিজিবি সদস্যরা প্রতি নৌকা ৫০০ টাকার বিনিময়ে এলাকায় প্রবেশের অনুমতি দিত এবং পাথর উত্তোলনের সময় বাধা দিত না।

দুদকের তদন্ত প্রতিবেদনের উপসংহারে বলা হয়, স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, বিজিবি, খনিজসম্পদ অধিদপ্তর ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের যোগসাজশ ছাড়া ভোলাগঞ্জে এমন ব্যাপক লুটপাট সম্ভব হতো না। রাষ্ট্রীয় সম্পদের এই অপব্যবহারে সবাই আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছেন, যার প্রমাণও দুদক সংগ্রহ করেছে।

লোকজন ছাড়াও পাথর লুটে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে স্থানীয় বিএনপি, জামায়াত, আওয়ামী লীগ, এনসিপি-সহ ৪২ জন রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে।