চাপে সিলেট বিএনপি : চেয়ারম্যান আসার আগে কি সুরাহা হবে ‘বি*দ্রোহী ইস্যু’?
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন
প্রকাশ: ১২ জানুয়ারী ২০২৬ ১৫:০২
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আন্দোলনে বিএনপির সঙ্গে থাকা শরিক দলগুলোর সঙ্গে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসন সমঝোতা হলেও, সিলেট বিভাগে সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা নিয়ে দলটির ভেতরের পুরনো বিভাজন আবারও প্রকাশ্যে এসেছে। যেসব আসন সমঝোতার অংশ হিসেবে শরিকদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, সেসব এলাকাতেই বিএনপির একাধিক প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন। এতে নির্বাচনী কৌশল বাস্তবায়নে দলীয় নেতৃত্বকে চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সিলেট অঞ্চলের মাঠপর্যায়ের অনেক নেতা চান, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সিলেট সফরের আগেই স্বতন্ত্র ও বিকল্প প্রার্থী ইস্যুর একটি সমাধান হোক। তাদের আশঙ্কা, বিষয়টি মীমাংসা না হলে ঐক্যের বার্তার পরিবর্তে বিভক্তির চিত্রই বড় সমাবেশগুলোতে সামনে আসতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে বিদ্রোহী প্রার্থীদের একটি তালিকা প্রস্তুত করেছে বিএনপি। গুলশানে দলটির চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে ধারাবাহিকভাবে ডেকে নেওয়া হচ্ছে সংশ্লিষ্ট নেতাদের। শনিবার সেখানে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন হবিগঞ্জ-১ আসনের নেতা শেখ সুজাত মিয়া। দলীয় সূত্র জানায়, ওই বৈঠকে তাকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর আহ্বান জানানো হয়। তবে শেখ সুজাত মিয়া নিজের রাজনৈতিক ত্যাগ ও দীর্ঘদিনের সক্রিয়তার কথা তুলে ধরে নির্বাচনে থাকার সিদ্ধান্তের কথা জানান।
একই ধরনের অবস্থান নিয়েছেন সুনামগঞ্জ-৫ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মিজানুর রহমান চৌধুরী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি জানান, দলের শীর্ষ নেতৃত্বের অনুরোধ থাকা সত্ত্বেও ভোটারদের প্রতি দায়বদ্ধতার কারণে তার পক্ষে সরে দাঁড়ানো সম্ভব হয়নি।
সিলেট বিভাগে তিনটি আসনে আনুষ্ঠানিক প্রার্থীর পাশাপাশি বিকল্প প্রার্থী রাখার কৌশলও নিয়েছে বিএনপি। সিলেট-৬ আসনে বিকল্প প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পেয়েছেন জেলা বিএনপির সদস্য ফয়সল আহমদ চৌধুরী, যিনি ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে উল্লেখযোগ্য ভোট পেয়েছিলেন। সুনামগঞ্জ-১ আসনে বিকল্প প্রার্থী করা হয়েছে তাহিরপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান কামরুলকে এবং সুনামগঞ্জ-২ আসনে জেলা বিএনপির সাবেক উপদেষ্টা তাহির রায়হান চৌধুরী পাভেলকে।
স্বতন্ত্র প্রার্থী ইস্যুতে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে হবিগঞ্জ-১ আসন। সেখানে বিএনপির প্রার্থী ড. রেজা কিবরিয়ার বিপরীতে দাঁড়িয়েছেন দলটিরই নেতা শেখ সুজাত মিয়া। ভোটের মাঠে তার সক্রিয়তা ও প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে এই আসনের ফলাফল নিয়ে দলের ভেতরে নানা হিসাব-নিকাশ চলছে। ড. রেজা কিবরিয়া সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়ার ছেলে। ২০১৮ সালের নির্বাচনেও তিনি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।
এদিকে সিলেট-৫ আসনে আসন সমঝোতার অংশ হিসেবে বিএনপি প্রার্থী দেয়নি। আসনটি ছেড়ে দেওয়া হয়েছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সভাপতি মাওলানা ওবায়দুল্লাহ ফারুককে। তবে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে জেলা বিএনপির প্রথম সহ-সভাপতি মামুনুর রশীদ মামুন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে নামেন। এ কারণে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হলেও তিনি নির্বাচনী তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শরিকদের সঙ্গে সমঝোতা বজায় রাখার পাশাপাশি দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষা এবং ভোটের মাঠে শক্ত অবস্থান ধরে রাখার দ্বৈত চ্যালেঞ্জে পড়েছে বিএনপি। গুলশানে চলমান বৈঠকগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ে সমঝোতার চেষ্টা চালাবে দলটি। তবে সবাইকে এক অবস্থানে আনা যাবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।
এই প্রেক্ষাপটেই আসছে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সিলেট সফর। দলীয় সূত্র অনুযায়ী, আগামী ২১ জানুয়ারি রাতে তিনি সিলেটে পৌঁছাবেন। ২২ জানুয়ারি হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার জিয়ারতের মাধ্যমে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচার শুরু করবেন। ওই দিন সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জে পৃথক জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে।
এদিকে নির্বাচন কমিশনের আপিল শুনানির দ্বিতীয় দিনে সিলেট বিভাগের আরও তিনজন প্রার্থী তাদের প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন। হবিগঞ্জ-৪ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. মিজানুর রহমান চৌধুরী, হবিগঞ্জ-৩ আসনে বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের প্রার্থী মো. শাহিনুর রহমান এবং সুনামগঞ্জ-১ আসনের প্রার্থী হাজী মুখলেছুর রহমানের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়। ইসি সূত্রে জানা গেছে, আপিল প্রক্রিয়া শেষে বৈধ প্রার্থীর সংখ্যা বাড়ছে, যা ভোটের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও বাড়াবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে চেয়ারম্যানের সফরের আগে সিলেট বিএনপিতে বিদ্যমান বিভাজন কতটা সামাল দেওয়া যায়, সেটিই এখন দলটির জন্য বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
