সিলেটের ঐতিহাসিক আলিয়া মাদ্রাসা মাঠ। কানায় কানায় পূর্ণ জনসমুদ্র। মঞ্চ আছে, মাইক আছে, ধানের শীষের স্লোগানও আছে সেই আগের মতোই। নেই শুধু একটি মানুষ—বেগম খালেদা জিয়া। অথচ এই মাঠেই ২০১৩ সালের এক পড়ন্ত বিকেলে লক্ষ জনতার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘তারেক রহমান বীরের বেশেই দেশে ফিরবেন।’ আজ সেই ভবিষ্যৎবাণী সত্য হলো, ছেলে ফিরলেন বীরের বেশেই, কিন্তু মা তা দেখে যেতে পারলেন না।
মায়ের মৃত্যুর পর এই প্রথম সিলেটের মাটিতে পা রাখলেন বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ২২ বছরের দীর্ঘ প্রবাস জীবন আর নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে তিনি ফিরেছেন সেই পুণ্যভূমিতে, যেখান থেকে তাঁর বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মা বেগম খালেদা জিয়া নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করতেন। আজ বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু করতে আলিয়া মাদ্রাসা মাঠের মঞ্চে উঠবেন তিনি।
সর্বশেষ ২০১৮ সালে মা খালেদা জিয়া সিলেট সফর করেছিলেন। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায় ঘোষণার (৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮) ঠিক তিন দিন আগে তিনি এই সফরটি করেছিলেন। যদিও এটি কোনো আনুষ্ঠানিক ‘জনসভা’ ছিল না। তিনি মূলত হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরাণ (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত এবং একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অনানুষ্ঠানিক প্রচারণা হিসেবে এই সফর করেছিলেন। সেই সফরের প্রায় ৭ বছর পর, দলের গুরুদায়িত্ব কাঁধে নিয়ে ছেলে এলেন সিলেটে। মায়ের স্মৃতিবিজড়িত সেই আলিয়া মাদ্রাসা মাঠ আজ ফের লোকারণ্য, কিন্তু সেখানে আজ শুধুই শূন্যতা আর হাহাকার মেশানো এক অদ্ভুত আবেগ।
নানা জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে বুধবার (২১ জানুয়ারি) রাত আটটায় আকাশপথে সিলেটে পৌঁছান তারেক রহমান। সবশেষ ২০০৫ সালে তিনি সিলেটে এসেছিলেন। দীর্ঘ প্রায় দুই যুগ পর ফিরেই তিনি ছুটে যান হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজারে। জিয়ারত করেন মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক এম এ জি ওসমানীর কবরও। এরপর তিনি ছুটে যান দক্ষিণ সুরমার সিলাম ইউনিয়নের বিরাইমপুর গ্রামে—তাঁর শ্বশুরবাড়িতে। সেখানেও তিনি আত্মীয়-স্বজন ও এলাকাবাসীর কাছে ধানের শীষের জন্য দোয়া চান। শ্বশুরবাড়ির মানুষ দীর্ঘদিন পর জামাইকে কাছে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
বিএনপি নেতারা জানান, সিলেট থেকে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করা দলটির দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। আজ সকাল ১১টায় আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে আয়োজিত এই স্মরণাতীতকালের বিশাল জনসমাবেশে প্রধান অতিথির ভাষণ দেবেন তারেক রহমান। জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরীর সভাপতিত্বে মঞ্চে বিশেষ অতিথি হিসেবে থাকবেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
আজকের এই সমাবেশে তারেক রহমান কী বার্তা দেন, সেদিকেই তাকিয়ে আছে পুরো দেশ। তবে রাজনীতির ঊর্ধ্বে আজ আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে ভাসছে এক বিষাদমাখা স্মৃতি—মায়ের সেই দৃপ্ত ঘোষণা আর ছেলের এই রাজসিক প্রত্যাবর্তন।
২০১৩ সালের ৫ অক্টোবর আলিয়া মাঠের জনসভা থেকে তারেক রহমানকে নিয়ে বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন, ‘তারেককে পিটিয়ে মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া হয়েছে। সে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না, তাকে পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছে।’
খালেদা জিয়া শেখ হাসিনাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘তারেক রহমান নাকি আমেরিকায় টাকা পাচার করেছে। আমি চ্যালেঞ্জ করছি, পারলে প্রমাণ করুন। প্রমাণ করতে না পারলে আপনাকে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘শুধু মুখে বললেই হবে না, টাকা কোথায় আছে তা দেখাতে হবে এবং পারলে তা দেশে ফিরিয়ে আনতে হবে।’
ওই দিন তিনি উল্লেখ করেন, তারেক রহমান শখ করে বিদেশে যাননি বা সেখানে বিলাসী জীবনযাপন করছেন না। তিনি মূলত চিকিৎসার জন্য সেখানে আছেন। খালেদা জিয়া ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, তারেক রহমান সুস্থ হলে এবং দেশে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন ফিরে এলে তিনি বীরের বেশেই দেশে ফিরবেন।
