https://www.emjanews.com/

13451

sylhet

প্রকাশিত

৩১ জানুয়ারী ২০২৬ ১৬:৩৩

আপডেট

৩১ জানুয়ারী ২০২৬ ১৬:৫২

সিলেট

সিলেটের অর্ধেক ভোট নারীদের হাতে : প্রার্থীরা কে কী প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন?

প্রকাশ: ৩১ জানুয়ারী ২০২৬ ১৬:৩৩

ছবি- সংগৃহীত

সিলেট বিভাগের চার জেলায় মোট ভোটার ৯১ লাখ ৬৮ হাজার ৬৬ জন। এর মধ্যে নারী ভোটারই প্রায় ৪৫ লাখ, যা মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেক। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেটের ১৯টি আসনে জয়-পরাজয়ের চাবিকাঠি কার্যত এই নারী ভোটারদের হাতেই। তাই শেষ মুহূর্তের প্রচারণায় প্রার্থীরা পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের মন জয়েও মরিয়া হয়ে উঠেছেন। উঠান বৈঠক থেকে শুরু করে ডিজিটাল প্রচারণায় নারীদের জন্য দেওয়া হচ্ছে বিশেষ সব প্রতিশ্রুতি। বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচারপত্র বিতরণ করছেন নারীরা।

বিশ্লেষকদের মতে, সিলেটের রক্ষণশীল সমাজে নারীরা একসময় পরিবারের পুরুষ সদস্যের সিদ্ধান্তে ভোট দিলেও এখন প্রেক্ষাপট ভিন্ন। শিক্ষা ও সচেতনতার হার বাড়ায় নারীরা এখন নিজেদের নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতার কথা ভাবছেন। আর এই বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করেই প্রধান দুই দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ও প্রতিশ্রুতি সাজিয়েছে।

তাছাড়া সিলেটের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় নারী ভোটারদের গুরুত্ব আরও একটি কারণে অনন্য। এই অঞ্চলের প্রতিটি পরিবারের অন্তত একজন বা একাধিক পুরুষ সদস্য যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র বা মধ্যপ্রাচ্যে বসবাস করেন। তাদের অনুপস্থিতিতে পরিবারের পুরো দায়িত্ব, আর্থিক লেনদেন এবং সামাজিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার কার্যত নারীদের হাতেই থাকে। ফলে সিলেটের নারীরা এখন আর পরোক্ষ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী নন, বরং পরিবারের প্রধান চালিকাশক্তি। প্রার্থীরাও এই বিষয়টি অনুধাবন করে প্রচারণায় ভিন্ন কৌশল নিচ্ছেন। তারা বুঝতে পারছেন, এই ‘প্রবাসী পরিবারের নারীদের’ ভোট ব্যাংকে যিনি প্রভাব ফেলতে পারবেন, বিজয়ের সুযোগ তারই বেশি থাকবে।

বিএনপির ‘ফ্যামিলি কার্ড’, গৃহিণীদের জন্য মাসিক আয়ের সুযোগ : নারীদের ভোট টানতে বিএনপি এবার চমকপ্রদ ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে। দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান গত বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) এক পডকাস্টে জানান, ক্ষমতায় গেলে দেশের কোটি কোটি মা-বোনের হাতে এই কার্ড তুলে দেওয়া হবে। এই কার্ডের মাধ্যমে প্রতি পরিবার মাসে আড়াই হাজার টাকা সহায়তা পাবে, যা নগদ অথবা খাদ্যসামগ্রী কেনার কাজে ব্যবহার করা যাবে।

সিলেটের গ্রামীণ নারীদের জন্য এটি বিশেষ আকর্ষণের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারেক রহমান জানিয়েছেন, কার্ডটি পরিবারের গৃহকর্ত্রীর নামে ইস্যু করা হবে। এর ফলে নারীদের হাতে নগদ অর্থ আসবে, যা তারা সঞ্চয় করতে পারবেন অথবা ক্ষুদ্র বিনিয়োগে লাগিয়ে পরিবারে বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করতে পারবেন। বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র মাহদী আমিন জানান, এই কার্ডের মাধ্যমে নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা হবে এবং এটি কোনো অবাস্তব প্রতিশ্রুতি নয়।

সিলেটের বিভিন্ন আসনে বিএনপির প্রার্থীরাও তাদের প্রচারণায় এই ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরছেন। বিশেষ করে সিলেট-১ ও ৪ আসনে বিএনপির নারী কর্মীরা ঘরে ঘরে গিয়ে এই বার্তা পৌঁছে দিচ্ছেন।

জামায়াতের প্রতিশ্রুতি: নিরাপত্তা, মর্যাদা ও কর্মঘণ্টা হ্রাস : অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীও নারী ভোটারদের টানতে তাদের নিরাপত্তা ও মর্যাদার ওপর জোর দিচ্ছে। দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে সরকার গঠনের সুযোগ পেলে তারা ঘরে, বাইরে ও কর্মস্থলে নারীদের শতভাগ নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করবেন। তিনি বলেন, “আমাদের মায়েদের ইজ্জতের মূল্য আমাদের জীবনের চাইতেও বেশি।”

জামায়াত আমির নারীদের জন্য এক অভিনব প্রস্তাবনাও সামনে এনেছেন। তিনি কর্মজীবী মায়েদের সুবিধার্থে তাদের কর্মঘণ্টা ৮ ঘণ্টা থেকে কমিয়ে ৫ ঘণ্টা করার কথা বলেছেন। তার মতে, নারীদের পারিবারিক দায়িত্ব পালন এবং সন্তান লালন-পালনের জন্য এই ছাড় দেওয়া উচিত। আর এই কম কর্মঘণ্টার কারণে তাদের বেতন বা সুযোগ-সুবিধা কমবে না, বরং সরকার ভর্তুকি দিয়ে সেই ক্ষতিপূরণ দেবে।

এছাড়া কর্মজীবী নারীদের নিরাপদ চলাচলের জন্য ‘সান্ধ্য বাস’ চালু করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে জামায়াত। বিরোধীদের সমালোচনার জবাবে জামায়াত আমির স্পষ্ট করেছেন যে ক্ষমতায় গেলে তারা নারীদের ঘরে আটকে রাখবেন না বরং তাদের শিক্ষা ও পেশাগত কাজে পূর্ণ সুযোগ দেবেন।

সিলেটের নারীদের ভাবনা : সিলেটের দক্ষিণ সুরমার গৃহিণী সালমা বেগম বলেন, “যে দল আমাদের নিরাপত্তা দেবে এবং দ্রব্যমূল্য কমিয়ে সংসার চালাতে সাহায্য করবে, আমরা তাদেরই ভোট দেব।” কলেজ ছাত্রী নুসরাত জাহান বলেন, “নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং রাস্তাঘাটে নিরাপত্তা আমাদের প্রধান দাবি। পাশাপাশি মেধার ভিত্তিতে চাকরির সুযোগ চাই।”

সিলেটের নারী নেত্রীরা বলছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি শুনতে ভালো লাগলেও তা বাস্তবায়ন করাই মূল চ্যালেঞ্জ। তবে প্রায় ৪৫ লাখ নারী ভোটারের এই বিশাল অংশকে যারা আস্থায় নিতে পারবে, ব্যালট বিপ্লবে তারাই এগিয়ে থাকবে।