আকাশের মেঘ গত শুক্রবার থেকেই যেন এক বিষণ্ণ চাদর বিছিয়ে দিয়েছে পুণ্যভূমি সিলেটের বুকে। বিএনপি সরকার গঠনের পর এই প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের সিলেটে পদার্পণ ঘিরে যখন উৎসবের আমেজ থাকার কথা ছিল, সেখানে প্রকৃতির রুদ্রমূর্তি জনমনে এক অদ্ভুত উৎকণ্ঠার জন্ম দিয়েছে। একদিকে রাষ্ট্রনায়ককে বরণ করার আকুলতা, অন্যদিকে অঝোর বর্ষণে ভেসে যাওয়া কৃষকের স্বপ্ন; এই দুইয়ের দোলাচলে এখন টালমাটাল সুরমা-কুশিয়ারার জনপদ।
সিলেটের হাওর অঞ্চল এবার যেন বিধাতার এক কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন। মাঠের পর মাঠ সোনালী ফসল দোল খাওয়ার কথা থাকলেও, আগাম বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢল কেড়ে নিয়েছে কৃষকের সারা বছরের সঞ্চয়। অতি বৃষ্টিতে ধান শুকানোর ফুরসত পায়নি কিষাণ-কিষাণী; ফলে গোলায় ওঠার আগেই পচে নষ্ট হয়েছে সেই অমূল্য সম্পদ। একফসলি এই অঞ্চলে ফসল হারানো মানেই হলো বেঁচে থাকার অবলম্বন হারানো। তাই প্রধানমন্ত্রীর আগমনে রাজপথ সাজলেও হাওরবাসীর মন পড়ে আছে সেই জলমগ্ন ফসলের মাঠে, যেখানে মিশে আছে তাদের ঘাম ও রক্ত।
আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস কোনো স্বস্তির বার্তা দিচ্ছে না। আরও কয়েকদিন এমন বৈরি আবহাওয়া বজায় থাকার আশঙ্কা এবং বন্যার পদধ্বনি প্রান্তিক কৃষকদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ আরও গভীর করেছে।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে ঠাসা কর্মসূচি রয়েছে। 'নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস' উদ্বোধন এবং দীর্ঘদিনের জনদাবি 'বাসিয়া খাল' খনন কাজের আনুষ্ঠানিক সূচনা করার কথা রয়েছে তাঁর। এছাড়া একটি সুধী সমাবেশে তাঁর ভাষণ দেওয়ার কথা। কিন্তু বিপত্তি বেঁধেছে বিরূপ প্রকৃতি নিয়ে।
উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে আয়োজিত কর্মসূচিগুলো বৃষ্টিমুখর দিনে কতটুকু সফল হবে, তা নিয়ে সংশয় কাটছে না। জনসমাগমের যে ঢল নামার প্রত্যাশা ছিল, বৃষ্টির দাপটে তা কিছুটা ম্লান হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও দলীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে উদ্দীপনার কমতি নেই। তবে সাধারণ মানুষের বড় অংশই এখন তাকিয়ে আছে সিলেটের জন্য তার উন্নয়ন কর্মসূচির পাশাপাশি হারানো কৃষকের জন্য প্রধানমন্ত্রীর 'ত্রাণ ও পুনর্বাসন' সংক্রান্ত ঘোষণার দিকে।
সিলেটের মানুষ এই মুহূর্তে কেবল ইট-পাথরের উন্নয়ন নয়, বরং বিপন্ন কৃষকের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো 'উপহার' বা বিশেষ কৃষি প্যাকেজের ঘোষণা শুনতে উন্মুখ।
'ফসলের মাঠ যখন চোখের জলে ভাসে, তখন রাষ্ট্রনায়কের সান্ত্বনা আর সহযোগিতাই হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার বড় অবলম্বন।' সোনালী ফসল হারানো দিশেহারা কৃষকের মুখে হাসি ফোটাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কী ঘোষণা দেন, সেটিই এখন এই সফরের সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়। কেবল উদ্বোধনী ফলক নয়, বরং বন্যাসঙ্কট মোকাবিলায় স্থায়ী সমাধান এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ঘুরে দাঁড়ানোর দিশা নিয়ে আসবেন তিনি; এমনই প্রত্যাশা সিলেটবাসীর।
আকাশের কান্না থামবে কি না জানা নেই, তবে প্রধানমন্ত্রীর সফরের মধ্য দিয়ে সিলেটের মানুষের মনের মেঘ কাটবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে।
