ছবি: সংগৃহীত
টানা চার দিনের ভারি বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে দেশের বিভিন্ন হাওড়াঞ্চলে বোরো ধান তলিয়ে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। তবে বৃহস্পতিবার আকাশে একফালি রোদের দেখা মিলায় সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনার হাওড়ে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। কাটা ধান শুকাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা।
সরকারি হিসাবে, চার জেলার হাওড়ে ৩১ হাজার হেক্টরের বেশি জমির আধাপাকা ও পাকা ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। এর মধ্যে প্রায় ৫১ শতাংশ ফসল কাটা হলেও তা শুকাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে চাষিদের।
নেত্রকোনার মদন উপজেলার গোবিন্দ্রশ্রী গ্রামের ৬২ বছর বয়সী কৃষক ছয়দুর রহমান বুকসমান পানিতে নেমে ডুবে যাওয়া ধান কাটছিলেন। ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে ত্রিপলে করে সেই ধান টেনে তুলছিলেন তিনি। এনজিও থেকে নেওয়া ৬০ হাজার টাকা ঋণ কীভাবে শোধ করবেন, তা নিয়ে দিশেহারা এই কৃষক।
তিনি বলেন, ‘ঋণ করে এক একর জমিতে বোরো আবাদ করেছিলাম। ধান ঘরে তোলার আগেই সব পানিতে তলিয়ে গেল। এখন কীভাবে ঋণ শোধ করব বুঝতে পারছি না।’
হাওড়াঞ্চলের কৃষকরা জানান, অতিরিক্ত পানির কারণে হারভেস্টার মেশিন দিয়ে ধান কাটা সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে পানিতে নেমে কাজ করতে শ্রমিকরা আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। ফলে দ্বিগুণ মজুরি দিয়েও কোথাও কোথাও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। একজন শ্রমিকের জন্য প্রতিদিন ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে কৃষকদের।
হবিগঞ্জে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ৬০০ হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়েছে। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত জেলায় ৩ হাজার ৩০০ হেক্টর জমির পাকা ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল কিছুটা কমলেও আগাম বন্যার আশঙ্কা পুরোপুরি কাটেনি।
বানিয়াচং উপজেলার কৃষক সুরুজ আলী বলেন, ‘রোদ ওঠায় ধান শুকাতে পারছি। এভাবে কয়েকদিন রোদ থাকলে ধান তোলা নিয়ে শঙ্কা কমবে।’
সুনামগঞ্জে মধ্যনগরের এরন বিল ও জিনারিয়া বাঁধ ভেঙে তিনটি ছোট হাওড়ে পানি প্রবেশ করেছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ১৩ হাজার ৭৯ হেক্টর জমির ধান তলিয়েছে এবং ২ হাজার ৪৭ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তবে কৃষক ও কৃষক সংগঠনগুলোর দাবি, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি। সুনামগঞ্জ হাওড় ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক মিলন বলেন, “জেলার প্রায় সব উপজেলাতেই ধান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখনও ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ ধান পানির নিচে রয়েছে।”
নেত্রকোনায় জেলার প্রায় ৯ হাজার ৩৫ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান। বৃহস্পতিবার কলমাকান্দার নাগডড়া এলাকার ফুলবাইন বাঁধ ভেঙে হাওড়ে পানি প্রবেশ করেছে।
কিশোরগঞ্জেও টানা চার দিনের বৃষ্টির পর বৃহস্পতিবার সকাল থেকে রোদ ওঠায় কৃষকদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। জেলার নিকলী, করিমগঞ্জ ও বাজিতপুর এলাকায় কৃষকদের ধান কাটা, মাড়াই ও শুকানোর কাজে ব্যস্ত দেখা গেছে।
কৃষকদের আশা, আগামী এক সপ্তাহ টানা রোদ থাকলে হাওড়ের পানি কিছুটা কমবে এবং তলিয়ে যাওয়া ধান উদ্ধার করা সম্ভব হবে। তবে আবার বৃষ্টি শুরু হলে আগাম বন্যা ও ফসলের আরও বড় ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
