https://www.emjanews.com/

15868

sylhet

প্রকাশিত

২৩ মে ২০২৬ ১৯:১১

সিলেট

সুনামগঞ্জের পল্লীতে দু'পক্ষের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে আহত ৬০

প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬ ১৯:১১

ছবি: সংগৃহীত

সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার উত্তর খুরমা ইউনিয়নের আমেরতল গ্রামে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দু'পক্ষের ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে অন্তত ৬০ জন আহত হয়েছেন।

শনিবার (২৩ মে) সকাল ৯টার দিকে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী চলা এ সংঘর্ষে পুরো গ্রাম রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। ভয়াবহতা ও অরাজকতার চিত্র দেখে আতঙ্কে ঘরে তালাবদ্ধ হয়ে পড়েন স্থানীয় বাসিন্দারা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আমেরতল গ্রামের দুই প্রভাবশালী পক্ষ- একটি এডভোকেট মনির উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন গ্রুপ এবং অপরটি কফিল উদ্দিনের গ্রুপ—দীর্ঘদিন ধরে নানা বিরোধে জড়িয়ে আছে। এলাকার আধিপত্য, মামলাজট, ব্যক্তিগত শত্রুতা, সামাজিক প্রভাব এবং রাজনৈতিক মেরুকরণকে কেন্দ্র করে এই দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা প্রায়ই দেখা যায়। কয়েক বছর ধরে ছোট-বড় নানা ঘটনার জেরে দুই গ্রুপের বিরোধ চরমে পৌঁছেছে বলে এলাকাবাসী জানান।

স্থানীয়রা জানান, কফিল উদ্দিন পক্ষের মামলার আসামি ফয়সাল আহমদ দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর ঈদ উপলক্ষে শুক্রবার নিজ বাড়িতে ফিরেন। বিষয়টি জানাজানি হলে প্রতিপক্ষের লোকজন তাকে ধাওয়া করে, যা এলাকায় নতুন করে উত্তেজনার সৃষ্টি করে। সন্ধ্যার পর দুই পক্ষই উত্তেজিত হয়ে ওঠে এবং গ্রামজুড়ে এক ধরনের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। যদিও এলাকার কিছু গণ্যমান্য ব্যক্তি উত্তেজনা প্রশমনে চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সকালে পরিস্থিতি আরও অবনতি ঘটে।

শনিবার সকাল ৯টার দিকে হঠাৎ করেই উভয় পক্ষ লাঠিসোটা, রামদা, দা, বল্লমসহ দেশীয় অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে মুখোমুখি অবস্থান নেয়। মুহূর্তের মধ্যেই ইটপাটকেল ছোড়া, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া এবং মারামারির মাধ্যমে সংঘর্ষ শুরু হয়। চলে প্রায় টানা এক ঘণ্টা। এতে আমেরতল গ্রাম পুরোপুরি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। গ্রামবাসীদের মধ্যে প্রচণ্ড ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, শিশু ও নারীরা নিরাপদ স্থানে লুকিয়ে থাকতে বাধ্য হন।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, সংঘর্ষে গুরুতর আহত অন্তত ২৯ জনকে সিলেট এম.এ.জি. ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে আক্তার হোসেন (৫০), তাজুল ইসলাম (৫৫), শাহজাহান মিয়া (৬০), মুক্তার আলী (৫৫), কেনু মিয়া (৩৫), ছালেক মিয়া (২৩) সহ আরও অনেকে রয়েছেন। বেশ কিছুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। এছাড়া ছাতক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আরও ২০ জন চিকিৎসাধীন আছেন। সংঘর্ষে হালকা আহত ১১ জনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে বাড়ি পাঠানো হয়েছে।

এলাকাবাসীর দাবি, দুই পক্ষের মধ্যে পূর্বেও একাধিক সংঘর্ষ, হামলা, মামলা এবং পাল্টা মামলা হয়েছে। গ্রামের দীর্ঘদিনের জমে থাকা শত্রুতা ও আধিপত্যের দ্বন্দ্বই এই সংঘর্ষের মূল কারণ। তারা আরও বলেন, কয়েক মাস পরপরই কোনো না কোনো ঘটনা ঘটছে, কিন্তু স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় পরিস্থিতি আবারও ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।

খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ছাতক থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, ‘পূর্ব শত্রুতার জেরে দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। খবর পেয়ে পুলিশ তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেছে। বর্তমানে এলাকায় শান্ত পরিবেশ বিরাজ করছে।’ তিনি আরও জানান, এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং নতুন করে কোনো সহিংসতা রোধে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

এদিকে, সংঘর্ষের ঘটনায় গ্রামজুড়ে এখনও উত্তেজনা বিরাজ করছে। এলাকাবাসী দ্রুত প্রশাসনের হস্তক্ষেপ ও স্থায়ী সমাধানের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, ‘সমস্যার মূলে থাকা শত্রুতা ও মামলাজট নিষ্পত্তি না হলে আবারও এরকম ঘটনা ঘটতে পারে।’

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরাও বিষয়টিকে ‘গুরুতর সামাজিক সংকট’ বলে উল্লেখ করেছেন। তারা বলেন, ‘গ্রামকে শান্ত রাখতে দুই পক্ষকে বসিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা জরুরি। নইলে এর প্রভাব পুরো ইউনিয়নের সামাজিক পরিবেশে নেতিবাচক ছাপ ফেলবে।’

সংঘর্ষে আহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজন এখনো শঙ্কামুক্ত নন। পরিবারগুলো একদিকে চিকিৎসা ব্যয়, অন্যদিকে আইনগত ঝামেলায় ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। গ্রামজুড়ে উদ্বেগ- এবারের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর পরিস্থিতি কোন দিকে গড়াবে।