ব্রাজিল দল (ছবি: সংগৃহীত)
দীর্ঘ চব্বিশ বছরের প্রতীক্ষার অবসান এবার নিশ্চিত হতে চলেছে। তাই বলে, অঘটন বলে সেটিকে চালিয়ে নেয়া দস্তুরমতো অন্যায় হবে; কারণ অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের এক দুর্লভ সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে এবারকার ব্রাজিল ফুটবল দল। ২০২৬ বিশ্বকাপ আসরে ব্রাজিল দল শুধুমাত্র তারকাসমৃদ্ধ একটি দলই নয়। সামর্থ্য, গভীরতা এবং মানসিক দৃঢ়তা তাদের ষষ্ঠ বিশ্বমুকুট জয়ের স্বপ্নকে কেবলমাত্র কল্পনা নয়, একেবারে বাস্তব সম্ভাবনায় পরিণত করেছে এবারকার আসরে।
ব্রাজিল এবং ফুটবল-এই শব্দ দুটি যেন একে অপরের পরিপূরক। যখনই বিশ্বকাপ ফুটবলের মহারণ ঘনিয়ে আসে, বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি সাম্বা ভক্তের বুকে একটিই সুর ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়: ‘এবার বিশ্বকাপ ব্রাজিলই জিতবে।’ এটি কেবল অন্ধ আবেগ নয়, বরং সেলেসাওদের অর্জিত এক গৌরবময় ইতিহাস, ফুটবলীয় সংস্কৃতি এবং মাঠের শক্তির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এক আত্মপ্রত্যয় এক অটুট বিশ্বাস।
ব্রাজিল কেন আবারও বিশ্বজয়ের মঞ্চে ট্রফি উঁচিয়ে ধরবে, তার পেছনে রয়েছে কিছু অকাট্য যুক্তি। নিম্নে সেটিই একজন ব্রাজিলভক্ত হিসেবে তুলে ধরার চষ্টা করলাম- ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাদের স্কোয়াড এর গভীরতা। ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলোতে খেলা একাধিক মানসম্পন্ন ফুটবলার প্রায় প্রতিটি পজিশনে বিকল্প হিসেবে রয়েছে। গোলরক্ষক থেকে শুরু করে আক্রমণভাগ পর্যন্ত এমন খেলোয়াড়ের অভাব নেই, যারা প্রতিটি মুহূর্তে যেকোন ম্যাচের পুরো গতিপথটিই পাল্টে দিতে পারে ।
গোলবারে অ্যালিসন বেকারের নির্ভরতা, রক্ষণে মারকুইনিয়োস, গ্যাব্রিয়েল মাগালহায়েস ও ব্রেমারের দৃঢ়তা একেবারে অপ্রতিরোধ্য। মাঝমাঠে ব্রাজিলের শক্তি সবচেয়ে সূক্ষ্ম। এখানে শুধু বল দখল নয়, খেলার ছন্দ নিয়ন্ত্রণের সামর্থ্যও রয়েছে। ব্রুনো গিমারায়েস ও কাসেমিরোর প্রজ্ঞা-সবকিছু মিলিয়ে দলটির মেরুদন্ড যথেষ্ট শক্তিশালী। আর আক্রমণভাগে ভিনিসিয়াস জুনিয়র, রাফিনিয়া, গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেলি, এন্দ্রিক ও প্রত্যাবর্তনকারী নির্ভরযোগ্য-নেইমার এমন এক সৃজনশীল ও বিস্ফোরক শক্তি, যা যেকোনো দেশের প্রতিরক্ষাকে সহজেই বিপর্যস্ত করার সক্ষমতা রাখে। ব্রুনো গিমারায়েস, জোয়াও গোমেস কিংবা অভিজ্ঞ কাসেমিরোর মতো খেলোয়াড়রা আক্রমণ ও রক্ষণের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করতে পুরোটাই সক্ষম। বিশ্বকাপে নকআউট পর্বের কঠিন ম্যাচগুলো প্রায়ই মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণে নির্ধারিত হয়, আর সেই জায়গায় ব্রাজিল কেবল শক্তিশালীই নয় একেবারে অপ্রতিরোধ্য।
কার্লো আনচেলত্তির অধীনে ব্রাজিলের খেলার দর্শনও গেছে অনেকটা বদলে। শৈল্পিক ফুটবলের ঐতিহ্য বজায় রেখেও দলটি এখন অনেক বেশি কৌশলী, সংগঠিত এবং বাস্তববাদী। আক্রমণে গতি, মাঝমাঠে নিয়ন্ত্রণ এবং রক্ষণে শৃঙ্খলার চমৎকার সমন্বয় বিশ্বকাপের মতো দীর্ঘ টুর্নামেন্টে সাফল্যের পূর্বশর্ত। অতীতের যেকোন সময়ের চেয়ে এবারকার ব্রাজিল ফুটবল দল ২০২৬ বিশ্বকাপ আসরে অনেক অনেক পরিশীলিত অনেক অনেক পরিপক্ক।
অভিজ্ঞদের ধীরস্থিরতা যেমন আছে, তেমনি আছে তরুণদের দুঃসাহস। খেলোয়াড়রা আধুনিক ফুটবলের গতি, ড্রিবলিং এবং ট্রানজিশন-ভিত্তিক খেলাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে বললে অতিশোয়োক্তি হবে না।
বিশ্বকাপ মানেই রোমাঞ্চ, বিশ্বকাপ মানেই অঘটন। তবে সব হিসাব-নিকাশ, সব অঘটন পাশে সরিয়ে, সাম্বার ছন্দ আর চেনা হলুদ-নীল ঝড়ের ওপর ভর করে ব্রাজিল আবারও ফুটবল বিশ্বের সিংহাসনে বসবে-এটিই ফুটবলপ্রেমীদের প্রত্যাশা। মরুভূমির তপ্ত বালুচর হোক কিংবা ইউরোপের সবুজ মাঠ, ট্রফিটা এবার রিও-ডি-জেনিরোর সমুদ্রসৈকত হয়ে ব্রাজিলের শোকেসেই যাচ্ছে-'ফোরসা ব্রাজিল!'
(উজ্জ্বল দাস, বিভাগীয় প্রধান, উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগ, সরকারি মদন মোহন কলেজ সিলেট।)