ম্যারাডোনা ছিলেন আর্জেন্টিনার বিশ্বখ্যাত ফুটবলার। ১৯৮৬ সালে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জেতানোর মাধ্যমে তিনি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। তাঁর ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ আজও কিংবদন্তি হয়ে আছে।
চে গুয়েভারা ছিলেন আর্জেন্টিনায় জন্ম নেওয়া বিপ্লবী নেতা, চিকিৎসক ও লেখক। তিনি ফিদেল ক্যাস্ত্রো-এর সঙ্গে কিউবার বিপ্লবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর ছবি বিশ্বের অন্যতম পরিচিত রাজনৈতিক প্রতীক।
ম্যারাডোনা একবার বলেছিলেন যে, চে গুয়েভারা তাঁর কাছে শুধু একজন বিপ্লবী নন, বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতীক। এজন্য অনেক ছবিতে ও শিল্পকর্মে ম্যারাডোনা ও চে গুয়েভারাকে একসঙ্গে তুলে ধরা হয়।
ফুটবল মাঠে তিনি ছিলেন রাজপুত্র, বিদ্রোহী, কখনো দেবতা। আর তাঁর হাতে ছিল আরেক বিদ্রোহীর মুখ। যে মুখ পৃথিবীর কোটি মানুষের কাছে প্রতিবাদ, সংগ্রাম ও মুক্তির প্রতীক। তিনি দিয়েগো ম্যারাডোনা, আর তাঁর হাতে খোদাই করা সেই মুখটি ছিল চে গুয়েভারার। এ যেন এক আর্জেন্টাইনের হাতে আরেক আর্জেন্টিনার ইতিহাস।
ম্যারাডোনা যখন বল পায়ে মাঠ কাঁপাতেন, তখন গ্যালারিতে লাখো মানুষ তাঁর নাম ধরে চিৎকার করত। কিন্তু করতালির সেই ঝলমলে আলোয়ও তিনি ভুলে যাননি লাতিন আমেরিকার দরিদ্র মানুষদের কথা, শোষিতদের কথা, ক্ষমতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানুষের কথা। হয়তো সেজন্যই তাঁর শরীরে জায়গা পেয়েছিল চে গুয়েভারার প্রতিকৃতি।
চে ছিলেন অস্ত্র হাতে বিপ্লবের সৈনিক। ম্যারাডোনা ছিলেন ফুটবল হাতে স্বপ্নের সৈনিক। একজন পাহাড়-জঙ্গলে লড়েছেন, আরেকজন সবুজ ঘাসের মাঠে। কিন্তু দুজনের গল্পের ভেতরে ছিল এক অদ্ভুত মিল- ক্ষমতার সামনে মাথা নত না করার সাহস।
ম্যারাডোনা বহুবার বলেছেন, তিনি চে গুয়েভারাকে ভালোবাসেন। কারণ চে শুধু একজন মানুষ নন, তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের একটি ভাষা। যে ভাষা বন্দুক ছাড়াও উচ্চারণ করা যায়, ফুটবল দিয়েও বলা যায়।
১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেই ম্যাচের কথা মনে পড়ে। চার বছর আগে ফকল্যান্ড যুদ্ধের ক্ষত তখনও তাজা। সেই ম্যাচে ম্যারাডোনার দুই গোল শুধু গোল ছিল না, বহু আর্জেন্টিনাবাসীর কাছে তা ছিল আত্মমর্যাদার পুনর্জন্ম। সেই ম্যারাডোনার হাতেই ছিল চে’র প্রতিকৃতি- যেন ইতিহাস নিজেই নিজের সঙ্গে কথা বলছে।
ম্যারাডোনা জানতেন, তাঁকে সবাই ভালোবাসবে না। তাঁকে ঘিরে বিতর্ক থাকবে, সমালোচনা হবে। কিন্তু তিনি কখনো নিখুঁত মানুষ হওয়ার চেষ্টা করেননি। তিনি ছিলেন মানুষের মতো মানুষ- ভুল করেছেন, ভেঙেছেন, আবার উঠে দাঁড়িয়েছেন। আর সেই জীবনযুদ্ধের পথচলায় চে গুয়েভারার মুখ যেন তাঁকে বারবার মনে করিয়ে দিয়েছে, ‘সংগ্রাম ছাড়া কোনো মহান গল্প লেখা যায় না।’
চে গুয়েভারা বলেছিলেন, ‘সত্যিকারের বিপ্লবীকে পরিচালিত করে ভালোবাসা।’ হয়তো সেই ভালোবাসাই ম্যারাডোনাকে পৃথিবীর দরিদ্র, বঞ্চিত ও অবহেলিত মানুষের পাশে দাঁড়াতে শিখিয়েছিল। তাই তাঁর হাতে আঁকা চে’র মুখটি কেবল একটি ট্যাটু ছিল না; ছিল বিশ্বাসের ঘোষণা।
২০২০ সালের ২৫ নভেম্বর যখন ম্যারাডোনা চলে গেলেন, পৃথিবী একজন ফুটবল জাদুকরকে হারায়। কিন্তু তাঁর অসংখ্য ছবির মধ্যে বারবার ফিরে আসে একটি দৃশ্য- হাতে চে’র মুখ, চোখে আগুন, আর ঠোঁটে প্রতিবাদের ভাষা।
আজ ম্যারাডোনা নেই, চেও নেই। কিন্তু একজনের হাতে আরেকজনের প্রতিকৃতি এখনও বলে যায় একটি গল্প- স্বপ্নের গল্প, সংগ্রামের গল্প, এবং সেইসব মানুষের গল্প, যারা বিশ্বাস করত পৃথিবীকে আরও সুন্দর করা সম্ভব।
ম্যারাডোনা ও চে গুয়েভারার জীবনের ক্ষেত্র ছিল ভিন্ন। একজন ফুটবলের মাধ্যমে বিশ্বজয় করেছেন, অন্যজন বিপ্লবের মাধ্যমে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছেন। তবে দুজনেরই জন্ম আর্জেন্টিনায়, দুজনই নিজ নিজ ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী প্রভাব বিস্তার করেছেন এবং দুজনই প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষের অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছেন। ফলে ম্যারাডোনার হাতে চে গুয়েভারার প্রতিকৃতি হয়ে উঠেছিল কেবল একটি ট্যাটু নয়, বরং ফুটবল ও বিপ্লব, খ্যাতি ও আদর্শ, ব্যক্তি ও ইতিহাসের এক বিরল মিলনচিহ্ন।
হয়তো এ কারণেই ম্যারাডোনার হাতে চে’র মুখ কেবল একটি ছবি নয়; এটি দুই কিংবদন্তির মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক জীবন্ত ইতিহাস।