ছবি: সংগৃহীত
চিত্রনায়ক সালমান শাহ (চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন) হত্যা মামলার তদন্তে নতুন অগ্রগতি হিসেবে তার মরদেহ কবর থেকে উত্তোলনের অনুমতি দিয়েছেন আদালত। হত্যার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানের স্বার্থে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে মরদেহ উত্তোলন, সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত এবং পুনরায় ময়নাতদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক জিয়াউল মোর্শেদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৪ মে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা এই আদেশ দেন। এর আগে ২০ মে তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতে আবেদনটি দাখিল করেন।
বুধবার (১০ জুন) জিয়াউল মোর্শেদ বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, আদালতের অনুমোদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে সালমান শাহর মরদেহ কবর থেকে উত্তোলন করা হবে। এরপর সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি ও ময়নাতদন্তের কাজ সম্পন্ন করা হবে।
তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনে উল্লেখ করা হয়, মামলার বাদী মো. আলমগীর (৬৮) আদালতে তথ্য প্রদানকারী হিসেবে নিলুফা জামান চৌধুরী নীলা চৌধুরীর পক্ষে ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়ে ঘটনাবিবরণী তুলে ধরেন। তার বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৯টার দিকে নীলা চৌধুরী, তার স্বামী কমর উদ্দিন আহমদ চৌধুরী এবং তাদের ছোট ছেলে শাহরান শাহ নিউ ইস্কাটন রোডের ইস্কাটন প্লাজা ১১/বি নম্বর বাসায় সালমান শাহর সঙ্গে দেখা করতে যান। সেখানে সালমানের স্ত্রী সামীরা হক ও কর্মচারী আবুল জানান, তিনি ঘুমিয়ে আছেন। পরে তারা গ্রিন রোডের বাসায় ফিরে যান।
বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সালমান শাহর বাসা থেকে ফোন করে জানানো হয় যে তার কিছু হয়েছে এবং দ্রুত আসতে বলা হয়। তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখতে পান, সালমান শাহ শয়নকক্ষের খাটে নিথর অবস্থায় পড়ে আছেন। পরে তাকে প্রথমে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে এবং সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ময়নাতদন্ত শেষে তার মরদেহ সিলেটের হযরত শাহজালাল (র.) মাজারসংলগ্ন কবরস্থানে দাফন করা হয়। ওই দিনই রমনা থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করা হয়েছিল।
গত বছরের ২১ অক্টোবর সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর রাজধানীর রমনা থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সালমান শাহর স্ত্রী সামীরা হক, শিল্পপতি ও সাবেক চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, লতিফা হক লুছি, খলনায়ক ডন, ডেবিট, জাভেদ, ফারুক, মে-ফেয়ার বিউটি সেন্টারের রুবি, আব্দুস সাত্তার, সাজু এবং রেজভি আহমেদ ফরহাদ। এছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও অনেককে আসামি করা হয়েছে।
সালমান শাহর মৃত্যুর পর ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রমনা থানায় অপমৃত্যুর মামলা হলেও গত ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক বাদীপক্ষের রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করে ঘটনাটিকে হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন। এরপর ২১ অক্টোবর নতুন করে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়।
এজাহারে মোহাম্মদ আলমগীর উল্লেখ করেন, ঘটনাদিনে সালমান শাহর বাসায় গিয়ে তারা জানতে পারেন তিনি ঘুমাচ্ছেন। কিছু সময় পর প্রডাকশন ম্যানেজার সেলিম ফোন করে জানান, সালমানের কিছু হয়েছে। পরে বাসায় ফিরে তারা তাকে নিথর অবস্থায় দেখতে পান। অভিযোগে বলা হয়, তখন কয়েকজন বহিরাগত নারী তার হাত-পায়ে তেল মালিশ করছিলেন এবং পাশের কক্ষে সামীরার আত্মীয় রুবি অবস্থান করছিলেন।
এজাহারে আরও বলা হয়, সালমানের মা তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। হাসপাতালে নেওয়ার পথে তারা তার গলায় দড়ির দাগ এবং মুখ ও পায়ে নীলচে আঘাতের চিহ্ন দেখতে পান। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান, সালমান শাহ এর আগেই মারা গিয়েছিলেন।
মোহাম্মদ আলমগীর অভিযোগে আরও উল্লেখ করেন, সালমান শাহর বাবা কমর উদ্দিন আহমদ চৌধুরী মৃত্যুর আগে তার ছেলের মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড বলে সন্দেহ করেছিলেন। এ কারণে তিনি ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি আবেদন করেন। সেখানে তিনি অপমৃত্যুর মামলাকে হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণ এবং সিআইডির মাধ্যমে তদন্তের অনুরোধ জানান। তার মৃত্যুর পর মামলাটি তার পরিবারের পক্ষ থেকে মোহাম্মদ আলমগীর পরিচালনা করে আসছেন।
মামলায় বলা হয়েছে, অভিযুক্তদের মধ্যে কেউ মারা গিয়ে থাকলে প্রমাণের ভিত্তিতে তারা দায়মুক্তি পাবেন। এজাহারে আরও অভিযোগ করা হয়েছে যে, নামীয় ও অজ্ঞাতনামা আসামিরা পূর্বপরিকল্পিতভাবে পরস্পরের যোগসাজশে সালমান শাহকে হত্যা করেছেন।
