https://www.emjanews.com/

16294

opinion

প্রকাশিত

১১ জুন ২০২৬ ১৮:০০

আপডেট

১১ জুন ২০২৬ ১৮:৩০

মতামত

বিশ্বকাপের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বময়

প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬ ১৮:০০

বিশ্বকাপ শুরু হতে যাচ্ছে। বিশ্বকাপের উত্তাপ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বময়। চারদিকে পতাকা উড়ছে, তর্ক-বিতর্ক জমে উঠছে, প্রিয় দলকে নিয়ে উচ্ছ্বাসে মেতে উঠছে মানুষ। আমিও সেই উত্তাপের ভেতরেই আছি, তবু এবারের বিশ্বকাপ আমাকে আগের মতো টানছে না। এর কারণটা খুব ব্যক্তিগত। জন্মের পর থেকে যাঁর হাত ধরে বিশ্বকাপকে ভালোবাসতে শিখেছি, যাঁর কারণে ফুটবলের এই মহোৎসব আমাকে চুম্বকের মতো আকর্ষণ করত, সেই মানুষটি, আমার বাবা, এ বছরের শুরুতেই ইহলোক ত্যাগ করেছেন।

ফুটবলের প্রতি আমার ভালোবাসা মাঠে গিয়ে নয়, বাবার ফুটবল খেলার গল্প শুনে শুনে জন্মেছে। বাবা তাঁর খেলার দিনের স্মৃতিগুলো আমাকে বলতেন, আর আমি সেগুলো মনে রেখে লিখে ফেলতাম। লেখা শেষ হলে বাবা পড়তেন, কোথাও ভুল থাকলে ঠিক করে দিতেন, মাঝে মাঝে কোথাও নতুন কিছু যোগ করতেন। এভাবেই যেন আমি শুধু বাবার খেলোয়াড় জীবনের গল্পই লিখিনি, তাঁর জীবনটাকেও একটু একটু করে চিনেছি।

আমার বাবা ছিলেন পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের একজন তুখোড় ফুটবলার। বাবা গোলপোস্ট আগলে রাখতেন। সত্তরের দশকে তিনি হকির প্রেমে পড়েন। তবে তাঁর খেলার জীবন শুরু হয়েছিল ক্রিকেট দিয়ে। এরপর ফুটবল, হকি, ভলিবল, দাবাসহ নানা খেলায় তিনি অংশ নিয়েছেন এবং বিজয় ছিনিয়ে নিয়েছেন সবক্ষেত্রে। খেলা ছিল তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

আমি ছিলাম বাবার একটু বেশি আদুরে সন্তান। তাই বাবার কাগজপত্র, ডায়েরি, খাতা, প্রয়োজনীয় নথি ঘাঁটাঘাঁটি করার অলিখিত অধিকার যেন আমারই ছিল। খুব ছোটবেলায় আমি অবাক হয়ে দেখতাম, বাবার একটি বিশেষ খাতা আছে। সেখানে তিনি নানা সংখ্যা লিখে রাখেন। লেখাগুলো আমার কাছে বেশ অদ্ভুত লাগত। শিশুমনে সেগুলো কিছুই বুঝতাম না। কিন্তু একটু বড় হওয়ার পর সেই রহস্যের পর্দা উঠল। সেটি ছিল বাবার বিশ্বকাপের খাতা। প্রতিটি বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচের ফলাফল, কত গোল হলো, কে জিতল, কে হারল, সবকিছু তিনি যত্ন করে লিখে রাখতেন। যেন এক ব্যক্তিগত ইতিহাসগ্রন্থ। এখন ভাবি, তখন হয়তো বুঝিনি, কিন্তু সেই খাতার পাতাগুলোতেই লুকিয়ে ছিল আমার ফুটবলপ্রেমের বীজ।

রাত জেগে খেলা দেখার প্রেরণাও বাবার কাছ থেকেই পাওয়া। বাবা জেগে থাকতেন, আর আমরা ঘুমিয়ে পড়তাম। খেলা শুরুর একটু আগে তিনি আমাদের ডেকে তুলতেন। ঘুমজড়ানো চোখে আমরা ভাইবোনেরা উঠে বসতাম। তারপর শুরু হতো হৈহৈ করে খেলা দেখা। সেই রাতগুলো এখনো মনে পড়লে বুকের ভেতর কেমন একটা উষ্ণতা জেগে ওঠে।

মজার ব্যাপার হলো, বাবা কোন দল সমর্থন করতেন, সেটা আমরা কেউই নিশ্চিত করে বুঝতে পারতাম না। আমি সবসময় চাইতাম, বাবা যে দলকে সমর্থন করবেন, আমিও সেই দলের সমর্থন করি। এক বিশ্বকাপ শুরুর আগে, সম্ভবত ১৯৯৮ সালে, বাবার কয়েকজন বন্ধু ঢাকা থেকে এসেছিলেন। খালেক কাকু, বশির কাকু এবং আরও কয়েকজন। বসার ঘরে জমে উঠেছিল বিশ্বকাপের আড্ডা। আলোচনার বিষয় ছিল সেরা খেলোয়াড়রা, অতীতের স্মরণীয় ম্যাচ, ফুটবলের সৌন্দর্য।

সেই আড্ডায় আমি শুনলাম, বাবা আর্জেন্টিনার পক্ষে অনেক কথা বলছেন। বারবার উঠে আসছে দিয়াগো ম্যারাডোনার নাম। খালেক কাকু বাবাকে বলছিলেন, “তুমি মাঠে খেলতে ম্যারাডোনার মতো, আবার কখনো পেলের মতোও।”

সেদিনই হয়তো প্রথম নিজের সিদ্ধান্তে আমি আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করা শুরু করি। মনে হয়েছিল, বাবার কণ্ঠে যে দলের জন্য এত ভালোবাসা, সেই দলটিই আমারও দল। তবে আর্জেন্টিনার পাশাপাশি আমার আরেকটি দুর্বলতাও ছিল। আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড়দের দৌড়, শক্তি, হাসি আর প্রাণচাঞ্চল্য আমাকে ভীষণ টানত। তাই নাইজেরিয়া, ক্যামেরুন কিংবা ঘানার খেলাও আমি সমান আগ্রহ নিয়ে দেখতাম।

এবার বিশ্বকাপে পৃথিবী আবার ফুটবলের জ্বরে কাঁপবে। কিন্তু আমার কাছে এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় অনুপস্থিতি কোনো খেলোয়াড় নয়, কোনো দল নয়, তিনি আমার বাবা।

এবারও বিশ্বকাপ আসবে। পতাকা উড়বে, রাত জেগে খেলা হবে, গোল হলে মানুষ চিৎকার করে উঠবে। শুধু খেলা শুরুর একটু আগে ঘুমজড়ানো চোখে আর কেউ বলবে না, “ওঠ, খেলা শুরু হয়ে গেছে।” সেই ডাকটাই বোধহয় এবারের বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি মিস করব। নতুন কোনো খাতার পাতায় আর কেউ ম্যাচের ফল লিখে রাখবে না।

বিশ্বকাপ থাকবে, গোল হবে, উল্লাস হবে, ইতিহাসও তৈরি হবে। শুধু আমার ব্যক্তিগত গ্যালারির সবচেয়ে প্রিয় দর্শক আর সেখানে বসে থাকবেন না। তবুও যখন মাঠে বল গড়াবে, আমি জানি, কোথাও না কোথাও বাবার সেই পুরোনো খাতার পাতাগুলো খুলে যাবে আমার স্মৃতির ভেতর। আর আমি আবার ফিরে যাব সেই রাতগুলোতে, যেখানে বিশ্বকাপ মানেই ছিল বাবা।

 

-রীমা দাস