মালয়েশিয়ায় রোহিঙ্গাদের বহিষ্কারের দাবিতে সাড়ে চার লাখ স্বাক্ষর!
প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬ ১৭:৪৩
ছবি: সংগৃহীত
মালয়েশিয়ায় রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বিরুদ্ধে নতুন করে বিদ্বেষমূলক প্রচারণা শুরু হয়েছে। “আকু আনাক মালয়েশিয়া” ছদ্মনামে চেঞ্জ ডট অর্গে চালু হওয়া একটি অনলাইন পিটিশনে প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের কাছে রোহিঙ্গাদের দেশ থেকে বহিষ্কারের দাবি জানানো হয়। মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পিটিশনটিতে প্রায় সাড়ে চার লাখ স্বাক্ষর জমা পড়ে। পরে একাধিক অভিযোগ পাওয়ার পর চেঞ্জ ডট অর্গ পিটিশনটি পর্যালোচনার আওতায় এনে স্থগিত করে।
দেশটির প্রভাবশালী ইংরেজি দৈনিক নিউ স্ট্রেইটস টাইমস জানিয়েছে, জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর তথ্য অনুযায়ী ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মালয়েশিয়ায় নিবন্ধিত শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা ২ লাখ ১৫ হাজার ৬০০। এর মধ্যে রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা ১ লাখ ২৬ হাজার ১৪৪, যা নিবন্ধিত শরণার্থীদের মধ্যে সর্বোচ্চ।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, পেনাংভিত্তিক একটি বেসরকারি সংগঠন দেশের বিভিন্ন এলাকায় রোহিঙ্গাদের ক্রমবর্ধমান ব্যবসায়িক উপস্থিতি ও আর্থিক সুযোগ-সুবিধা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এসব বক্তব্য জনমনে অস্বস্তি ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ফোরটিফাই রাইটস উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষের উচিত শরণার্থী ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ঘৃণাপ্রচারণা, হয়রানি ও হুমকির বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া। সংস্থাটির পরিচালক পুত্তানি কাংকুন বলেন, “অনলাইনের ঘৃণা খুব দ্রুতই অফলাইনের সহিংসতায় রূপ নিতে পারে।”
ফোরটিফাই রাইটস সরকার ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, তারা যেন রোহিঙ্গা ও অন্যান্য শরণার্থীদের বিরুদ্ধে সব ধরনের ঘৃণামূলক প্রচারণার প্রকাশ্যে নিন্দা জানান এবং সহিংসতায় উসকানিমূলক বক্তব্যের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করেন।
মালয়েশিয়ার মানবাধিকার কমিশন সুহাকামও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কমিশন জানায়, পিটিশনটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও বৈষম্যমূলক আচরণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সুহাকামের মতে, রোহিঙ্গাদের মানবতাবিরোধী ভাষায় উপস্থাপনের প্রবণতা সামাজিক সংহতি ও মানবিক মর্যাদার ভিত্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
কমিশন নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছে, মিয়ানমারে দীর্ঘদিনের নিপীড়ন ও সহিংসতার মুখে পালিয়ে আসা শরণার্থী এবং সাধারণ অর্থনৈতিক অভিবাসীদের মধ্যে পার্থক্য বোঝা জরুরি।
অন্যদিকে মানবাধিকার সংগঠন পুসাৎ কোমাস জানিয়েছে, রোহিঙ্গারা মালয়েশিয়ার মোট জনসংখ্যার মাত্র শূন্য দশমিক চার শতাংশ। ফলে দেশের সম্পদের ওপর তারা বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে; এমন দাবি তথ্যভিত্তিক নয়। সংগঠনটির মতে, বিদ্বেষমূলক প্রচারণাগুলো পরিকল্পিতভাবে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে কেবল “ভোক্তা” হিসেবে উপস্থাপন করছে, অথচ বাস্তবে তাদের অনেকেই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও মালয়েশিয়ার অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন।
পুসাৎ কোমাস সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছে, জনমনে উদ্বেগ মোকাবিলায় ভয়, গুজব ও ভুল তথ্যের পরিবর্তে প্রমাণভিত্তিক নীতি গ্রহণ করা উচিত।
বিশ্লেষকদের মতে, মালয়েশিয়ায় শরণার্থীদের অবস্থান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই একটি জটিল বাস্তবতা বিদ্যমান। দেশটি জাতিসংঘের ১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী নয় এবং সেখানে শরণার্থী সুরক্ষার জন্য আলাদা কোনো আইনি কাঠামোও নেই। ফলে রোহিঙ্গাসহ সব শরণার্থী দেশটির অভিবাসন আইনে “অবৈধ প্রবেশকারী” হিসেবে বিবেচিত হন। এই বাস্তবতা দীর্ঘদিন ধরে তাদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক জনমত তৈরিতে ভূমিকা রেখে আসছে।
ফোরটিফাই রাইটস আরও অভিযোগ করেছে, সরকার সম্প্রতি যে নতুন শরণার্থী নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু করেছে, তাতে বায়োমেট্রিকসহ ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার রোধ এবং নির্বিচার গ্রেপ্তার বা জোরপূর্বক প্রত্যাবাসন ঠেকানোর জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই।
উল্লেখ্য, মালয়েশিয়ায় রোহিঙ্গাবিরোধী প্রচারণা এবারই প্রথম নয়। ২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারির সময়ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ঘৃণাপ্রচারণা ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় রোহিঙ্গারা মালয়েশিয়ার নাগরিকত্ব দাবি করছেন; এমন ভিত্তিহীন তথ্য প্রচার করে তাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ও সহিংসতার আহ্বান জানানো হয়েছিল। মানবাধিকারকর্মীদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি সেই পুরনো প্রবণতারই পুনরাবৃত্তি, যা সামাজিক সম্প্রীতি ও মানবিক মূল্যবোধের জন্য নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।