‘মাজারে যারা টাকা দেয়, তাদের টাকার হিসাব নিয়ে আপনার এতো মাথা ব্যাথা কেন?’
প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬ ০২:০৬
ছবি: সংগৃহীত
ভাই সাহেব, আপনি হযরত শাহজালাল (রহ.) এর দরগায় টাকা দিয়েছেন কখনো?
-মাথা খারাপ। মাজারে টাকা দেয়া শিরক। আমি এইসবে টাকা দেইনা।
আমি মাজারে টাকা দেই। আমার পরিবারের বহুলোক মাজারে টাকা দেয়। মোমবাতি দেয়, আগরবাতি দেয়। আমরাতো কখনো এই টাকা কার পেটে যাচ্ছে তা নিয়ে চিন্তা করি না৷ আচ্ছা ভাইজান, মাজারে যে বার্ষিক উরশ হয় এতে টাকা পয়সা বা গরু দিয়েছেন কখনো?
-নাউজুবিল্লাহ। এসবে কেন টাকা দিবো?
আপনি মাজারে কখনো টাকা দেন নাই তাহলে মাজারে যারা টাকা দেয় তাদের টাকার হিসাব নিয়ে আপনার এতো মাথা ব্যাথা কেন? মাজারে টাকা দেয় সেই সব মানুষ- যাদের আপনারা আবার মাজার পূজারী বলেন। তো সেই মাজার পূজারীদের টাকা নিয়ে আপনাদের ঘুম হারাম কেন?
-এই টাকা খাদিমেরা খাচ্ছে। এসবের হিসাব নেয়া দরকার।
এই সব কথাতো আপনারা সেই আশির দশক থেকে বলছেন। এখন ফেইসবুক-ইউটিউব সব জায়গাতেই মাজারে টাকা না দেয়ার প্রচারনা হচ্ছে। খাদিমেরা খাচ্ছে তা বলা হচ্ছে। আমিতো আজ পর্যন্ত দরগার কোন খাদেমের ভিডিও দেখলাম না, যেখানে বলা হচ্ছে,
মাজারে টাকা দেন, টাকা দিলে বেহেশতে চ্যালচেলাইয়া চলে যাবেন। দেখছেন এমন ভিডিও?
-না দেখিনি। ওদের এসব বলা লাগে না। মানুষ না বুঝে এমনিতেই টাকা দেয়।
সেই মানুষতো ভাই আপনি না। আপনিতো বললেন, টাকা দেননা। বাংলাদেশের মানুষের দান করার জন্য জায়গার অভাব আছে? কত খাতে দান করতে পারে। এই যে অনলাইনে হুজুরেরা টাকা তুলছেন, সেখানে টাকা দিতে পারে। সরকারের জাকাত ফান্ড থেকে জেলা প্রশাসকের এল আর ফান্ডেও টাকা দিতে পারে।
এই মাজারের ভেতরেই মসজিদ ও মাদ্রাসায় দান দেয়ার জন্য স্থানে স্থানে অনেক দানবাক্স রাখা আছে। যাদের মাজারে টাকা দিতে আপত্তি তারা মসজিদ-মাদ্রাসায় দিতে পারে। হযরত শাহজালাল রহ-এর মাজারের কোন খাদেম আজ পর্যন্ত কাউকে বলেছে যে, মজিদ বা মাদ্রাসায় টাকা না দিয়ে খদেমদের কাছে টাকা দেন? কেউ কখনো জোর করেছে? বরং মাজারে টাকা না দেয়ার জন্য বিভিন্ন ভাবে বলা হয়।
মানুষ নিজের অর্থ তার ইচ্ছেতে দান করে। মানুষ মাজারের ভেতরে গিলাফের উপর টাকা দেয়। খাদিমের কাছে দেয়। ডেগের ভেতর দেয়। মোমবাতি দেয়। আগরবাতি দেয়। এই সব কিছু সে নিজের ভালো লাগা থেকে করে। এই ভালো লাগা তার বিশ্বাস।
আচ্ছা ভাইজান, কবে থেকে মাজারের এই টাকা খাওয়া হচ্ছে? আওয়ামীলীগ আমল থেকে?
-না
এরশাদের আমল থেকে?
-না
পাকিস্তান আমল থেকে?
-না
বৃটিশ আমল থেকে?
-না। আমি জানি না।
কোন আমল থেকে খাওয়া হচ্ছে তা জানেন না কিন্তু তারেক রহমানের আমলে বন্ধ হবে তা জানানোর জন্য আপনারা খুব উৎসাহী দেখছি!
শোনেন, মাজারে শুধু সাধারণ মানুষ টাকা দিতো না।
বৃটিশ বা মোগল আমলের শাসক'রা সিলেটের দায়িত্ব নিয়ে প্রথম দরগাতে এসে নজরানা পেশ করতো। সেই নজরানা ছিল স্বর্ণমুদ্রা বা মোহর। এসব সিলেটের প্রাচীন ইতিহাসের বইতে লেখা আছে। সে সময় নজরানা দেয়া সেই মোহর কার পেটে যেতো? হযরত শাজালাল (রহ)-এর পেটে দেয়া হতো?
-না, মানে মাজারের টাকা মানুষ আল্লাহর জন্য দেয়। এইটা খাদিমরা কেন খাবে?
আল্লাহর জন্য দিতে চাইলে মানুষ গরিব-অসহায়কে দান করবে। এতিমকে খাওয়াবে। না হয় মসজিদ-মাদ্রাসায় দিবে মাজারে কেন দেয়?
-আমি কিভাবে বলবো কেন দেয়?
মানুষ দেয় তার মনের প্রশান্তির জন্য। আপনিতো মাজারেই বিশ্বাস করেন না। আপনাদের ইসলামে মৃত সে যেই হোক তার কবরে কোন চিহ্ন থাকার কথা না। আল সৌদ যেভাবে জান্নাতুল বাকি থেকে সমস্ত আহলে বায়াত ও সাহাবীদের মাজার ভেঙ্গে শেষ করে দিয়েছে। আপনারাও মনেপ্রাণে তাই চান। আপনাদের হাতে সে সুযোগ থাকলে আপনারা তাই করতেন। ৫ আগষ্টের পর ক্ষমতার অংশীদার হয়ে আপনাদের লোকজন সেই কাজই তো করেছে। অসংখ্য মাজার ভেঙ্গেছে।
সৌদি আরবে ওয়াহাবীরা সমস্ত মাজার এমনভাবে ভেঙ্গেছে যে, কোনটা সাহাবী বা কোনটা তাবেঈনের সে সবের কোন ফলক পর্যন্ত নেই।
৭০০ বছর পূর্বে আরব থেকে ইসলাম প্রচারক সুফীরা বাংলায় এই ইসলাম যদি নিয়ে আসতেন তাহলেতো উনাদের কবরের কোন চিহ্ন থাকার কথা না। কিন্তু এই সব দরগায় শায়িত আল্লাহর ওলিদের মাধ্যমেইতো এ অঞ্চলে ইসলাম ছড়িয়েছে। মাজার সবখানেই আছে এবং তা পরিচালনার একটি ঐতিহ্য আছে। সৌদি ছাড়া বিশ্বের তাবত মুসলিম দেশে দরগা-ই-হযরত শাহজালাল (রহ)-এর মত মাজার আছে, দরগাহ আছে। Google-এর সার্চ অপশনে গিয়ে লিখবেন, Sufi saint tomb in jordan. দেখবেন সেখানের মাজার। এরপর দেশের নাম বদলে OIC- ভুক্ত দেশের নাম দিয়ে সার্চ করতে থাকুন। দেখুন মাজার আছে, না নেই।
-মাজার থাকতে পারে কিন্তু আমাদের দেশের মাজারে মত গান-বাজনা হয়?
হ্যা হয়। ইরাক, ইরান, তুরস্ক, মিশর, ভারত, পাকিস্তান, ইয়েমেন, মালি, তিউনেশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সিরিয়া, মরিশাস, মৌরিতানিয়া সহ বহু দেশে মাজারের উরশ উৎসবে সুফি সামা হয়। আচ্ছা, ভাই আপনিতো মাজারে যান না। কিন্তু মানুষ কেন যায়?
- আমি যাবো না কেন? আমিতো আমার বাবা-মার কবর জিয়ারত করতে যাই। কিন্তু মাজারে আসা এসব লোকজনের জন্য শান্তি পাই না।
আপনার বাবা-মা গত বিশ বছরের মধ্যে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। দরগা যখন আপনাদের এতো অপছন্দ তাহলে এখানে তাদের কবর দিলেন কেন?
-দিলাম, উনাদের ইচ্ছে ছিল বলে।
উনারা নিজেদের বিশাল জায়গা-জমি, পারিবারিক কবরস্থান থাক্তেও এই দরগাতে শেষ ঠিকানা কেন চেয়ে নিলেন?
-আল্লার এতো বড় একজন ওলি। এখানে মানুষ সব সময় জিয়ারতে আসে, তারা এখানে শায়িত সকল মুর্দার জন্য দোয়া করে। মসজিদে বড় জামাত হয়। সে সব জামাতে সবার জন্য দোয়া হয়।
-মৃত্যুর পর আপনার মা-বাবা যেখানে শেষ ঠিকানা চেয়েছেন, সেখানে কিছু একটা আছে বলেই চেয়েছেন। কি আছে আল্লাহর ওলীর দরগায়? এখানে প্রশান্তি আছে। মানুষ এখানে এসে প্রশান্তি পায়। প্রশান্তির জন্য টাকা-পয়সা দেয়। মানুষ জানে ঐ টাকা সেই ওলি বা দরবেশের পেটে যাবে না। যাবে যারা এতো বছর ধরে ঐ মাজার বা দরগা জিয়ারতে আসা মানুষের খেদমত করছে তাদের পেটে।
-শাহজালাল কী এভাবে টাকা খেতে বলেছেন?
হ্যাঁ বলেছেন। উনার সাথে আসা ৩৬০ আউলিয়াকে তিনি সারা বাংলায় ইসলামের আবাদ করতে বিভিন্ন জায়গায় প্রেরণ করেন। একেকজন একেক এলাকায় চলে গেলেও ৫ জন সঙ্গী এখানেই থেকে যান। এদের একজন ইয়েমেনের শাহজাদা। যার মাজার উনার মাযারের লাগোয়া। ইরানের শাহজাদা বিয়ে করেন্ননি। কিন্তু অন্য চারজন বিয়ে করেছিলেব।
এদের ঘর সংসার হয়। এদের দায়িত্ব ছিল হযরত শাহজালাল (রহ)-এর খেদমত করা। খেদমত বলতে দূর-দূরান্ত থেকে উনার সাথে দেখা করতে আসা মানুষদের সেবা দেয়া। সে সময় হোটেল বা রেস্তোরাঁ ছিল না। উনারা খানকায় আসা মানুষ ও আগত অন্যান্য দরবেশদের খেদমত করতেন। এই যে বিশ্ব বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা আসলেন, উনার আতিথিয়েতা কে করলো?
এই খাদিম পরিবারেরাই করলো।
আমাদের নবী (সা.)-এর সাথে কেউ যখন সাক্ষাৎ করতে আসতো কিছু না কিছু উপহার সাথে নিয়ে আসতো। যেকোনো বরেণ্য ব্যক্তির সাথে সাক্ষাৎ করতে গেলে উপহার নিয়ে যাওয়া আমাদের নবী সাঃ এর সুন্নত। এই উপহার পেয়ে নবী সাঃ সামান্য গ্রহণ করে বাকিটা সামনে বসা সাহাবিদের মধ্যে বন্টন করে দিতেন।
হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহি ও একইভাবে তার কাছে আসা উপঢৌকন তার এই চার সঙ্গীর পরিবারের মধ্যে বন্টন করে দিতেন। সে সময় কি আসতো? খাবার আসতো। গরু আসতো। ছাগল আসতো। মুদ্রা আসতো।
উনার ওফাতের পরেও মানুষ উপঢৌকন নিয়ে আসতে থাকে। গরুর প্রথম দুধ, গাছের প্রথম লাউ, দোকানের প্রথম মিষ্টি- এসব মানুষ নিয়ে আসে হযরত শাহজালাল (রহ)-কে খায়ানোর জন্য? তারা জানে এসব নজরানা হযরত শাহজালাল (রহ)-এর পক্ষে খেদমতগারেরাহ ভোগ করবে। তবুও ওরা তা নিয়ে যায়। আপনি জীবনেও এসব নিয়ে যাননি।
ওরা খালি হাতে যায় না। সন্ধাতে আলো দিতে মোম নিয়ে যায়, সুগন্ধির জন্য আগর বা আতর নিয়ে যায়। গরু-ছাগল নিয়ে যায়। টাকাও নিয়ে যায়। ডেগে টাকা দেয়। মাজারের ভেতরে নিষেধ করা সত্বেও টাকা ফেলে দেয়। ঔরঙ্গজেবের আমলে বানানো মসজিদে বসা খাদিমের হাতে টাকা তুলে দেয়।
সেই চার সঙ্গীর পরিবারের সদস্যরা এই খাদিম পরিবার। এদের সংখ্যা এখব অনেক। একেক জন একেক দিন আসেন খাদিম হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। হযরত শাহজালাল (রহ)-এর জন্য নিয়ে আসা নজরানা উনারা গ্রহণ করেন। এইটা তাদের অধিকার।
(আব্দুল করিম কিম’র ফেসবুক টাইমলাইন থেকে সংগৃহীত))