https://www.emjanews.com/

17275

sports

প্রকাশিত

২২ জুলাই ২০২৬ ১৯:৪৯

খেলাধুলা

স্পেনের চাই ‘বিশ্বকাপ’, ট্রাম্পের চাই ‘এয়ারবেস’: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উড়ছে ষড়যন্ত্র তত্ব

প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬ ১৯:৪৯

ছবি: সংগৃহীত

ফুটবল কেবল ৯০ মিনিটের খেলা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আবেগ, ইতিহাস, রাজনীতি, অর্থনীতি, জাতীয়তাবাদ, এমনকি কল্পনাও। বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পরও তাই মাঠের বাঁশি থেমে গেলেও থামে না বিতর্ক। বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জন্ম নেয় নতুন নতুন গল্প, ব্যাখ্যা, সন্দেহ এবং ষড়যন্ত্র তত্ত্ব।

২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের শিরোপা জয়ের পর সামাজিক মাধ্যমে সবচেয়ে আলোচিত একটি অনানুষ্ঠানিক বয়ান হলো; ‘স্পেনের চাই বিশ্বকাপ, ট্রাম্পের চাই এয়ারবেস।’ এই বক্তব্যের পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই কারো কাছেই। তবু নানা পোস্ট, ভিডিও, ব্লগ ও আলোচনায় এটি এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, যেন ফুটবলের ফলাফলের আড়ালে লুকিয়ে আছে আন্তর্জাতিক কূটনীতির এক গোপন অধ্যায়।

সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত বর্ণনা অনুযায়ী, কয়েক মাস ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে হামলার জন্য ইউরোপে স্পেনের একটি সামরিক বিমানঘাঁটি ব্যবহারের বিষয়ে আগ্রহী ছিলেন। একই সময়ে স্পেনকে ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থান এবং ইসরায়েলের সমালোচনামূলক নীতির জন্য আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আলাদাভাবে দেখা হচ্ছিল।

বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারানোর পর আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা ফকল্যান্ড (মালভিনাস) দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে ব্যানার প্রদর্শন করায় যুক্তরাষ্ট্র অসন্তুষ্ট হয়। এরপর নেপথ্যে শুরু হয় রাজনৈতিক চাপ।

গল্পের পরবর্তী অংশে বলা হয়, আর্জেন্টিনাকে নাকি ফাইনালে হারতে চাপ দেওয়া হয় এবং একই সঙ্গে স্পেনের সঙ্গে একটি অঘোষিত সমঝোতা তৈরি হয়। সেই তথাকথিত সমঝোতার ভাষ্য অনুযায়ী, স্পেন যদি বিশ্বকাপ জেতে, তবে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক এয়ারবেস ব্যবহারের সুযোগ দেবে। এর বিনিময়ে স্পেনের ওপর থাকা সম্ভাব্য বাণিজ্যিক চাপ বা নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হবে। আর এই দাবি মেনে নিতে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দেরকে চাপে রাখতে তাদের পরিবারকে বন্দুকের নলের মুখে জিম্মি করা হয়। তবে এসব দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসেনি।

এই তত্ত্বের সমর্থকেরা ফাইনালের ম্যাচ পরিসংখ্যানও সামনে আনছেন। তাদের দাবি, পুরো ম্যাচে স্পেনের অন-টার্গেট শটের সংখ্যা ছিল ২২, অথচ আর্জেন্টিনা একটি শটও লক্ষ্যে রাখতে পারেনি। এমনকি লিওনেল মেসিও পুরো ম্যাচে নিজের স্বাভাবিক ছন্দে ছিলেন না। তাদের মতে, এটি ছিল ‘অস্বাভাবিক’ একটি ম্যাচ।

অন্যদিকে ফুটবল বিশ্লেষকদের অনেকেই বলছেন, কোনো দলের খারাপ দিন থাকতেই পারে। একটি ম্যাচের পরিসংখ্যান দিয়ে ম্যাচ পাতানো প্রমাণ করা যায় না। ফুটবলে কৌশল, প্রতিপক্ষের চাপ, রক্ষণভাগের আধিপত্য কিংবা মানসিক পরিস্থিতিও পারফরম্যান্সে বড় প্রভাব ফেলে।

এছাড়া ইতিহাসে এমন নজিরও রয়েছে যে, ১৯৯০ ও ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালেও আর্জেন্টিনা গোল করতে ব্যর্থ হয়েছিল এবং আক্রমণে ছিল অনেকটাই নিষ্প্রভ। ফলে শুধু গোল বা অন-টার্গেট শটের অভাব থেকেই ষড়যন্ত্রের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যৌক্তিক নয়।

ষড়যন্ত্র তত্ত্বে প্রায়ই ফিরে আসে ১৯৭৮ সালের আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপের প্রসঙ্গ। সেই বিশ্বকাপে দ্বিতীয় পর্বে ফাইনালে উঠতে আর্জেন্টিনার প্রয়োজন ছিল পেরুর বিপক্ষে বড় ব্যবধানে জয়। শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা ৬–০ গোলে জয় পায়। আর তাতে বাদ পড়ে যায় ব্রাজিল। বিনিময়ে পেরুকে আর্জেন্টিনা উপহার দেয় জাহাজ ভর্তি গম ও তাদের সরকারের কাছে আটকে থাকা বিপুল সম্পদ ও অর্থ।

বহুবছর ধরেই ওই ম্যাচকে ঘিরে নানা অভিযোগ, সন্দেহ ও বিতর্ক রয়েছে। বিভিন্ন লেখক, সাংবাদিক ও গবেষক রাজনৈতিক প্রভাব, কূটনৈতিক সমঝোতা এবং অর্থনৈতিক সুবিধার অভিযোগের কথা উল্লেখ করেছেন। 

বিশ্বকাপ বরাবরই কেবল ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ছিল না। ১৯৩৪ সালের ইতালি, ১৯৭৮ সালের আর্জেন্টিনা, শীতল যুদ্ধের সময়কার ম্যাচ, কাতার বিশ্বকাপের মানবাধিকার বিতর্ক; প্রতিটি যুগেই ফুটবল কোনো না কোনো রাজনৈতিক আলোচনার অংশ হয়েছে। তাই বর্তমান বিশ্বকাপ ঘিরেও নানা রাজনৈতিক ব্যাখ্যা সামনে আসা অস্বাভাবিক নয়।

হয়তো ভবিষ্যতে নতুন তথ্য সামনে আসবে, হয়তো আসবে না। কিন্তু একটি বিষয় নিশ্চিত; ফুটবল যতদিন থাকবে, ততদিন গোলের সঙ্গে গল্পও থাকবে; শিরোপার সঙ্গে থাকবে সন্দেহ, আর ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকবে মানুষের কল্পনা।