অস্ট্রেলিয়ার ওয়ার্ক ভিসার নামে প্রতারণার ফাঁদ, স্বরাষ্ট্র দপ্তরের সতর্কতা
৩০-৬০ দিনে ভিসা, IELTS ছাড়াই অস্ট্রেলিয়া- লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ
প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ ২২:২২
ছবি: সংগৃহীত
অস্ট্রেলিয়ায় উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতারণার ফাঁদ পেতেছে একটি চক্র। ‘৩০ থেকে ৬০ দিনে ওয়ার্ক ভিসা’, ‘IELTS ছাড়াই অস্ট্রেলিয়া’, ‘শতভাগ ভিসার নিশ্চয়তা’- এমন লোভনীয় বিজ্ঞাপনে বাংলাদেশি যুবক থেকে মধ্যবয়সী মানুষকে আকৃষ্ট করা হচ্ছে। কমলা ও আপেলবাগানে চাকরি, ড্রাইভিং পেশায় উচ্চ বেতন, দ্রুত ওয়ার্ক পারমিট এবং স্থায়ী বসবাসের সুযোগ দেওয়ার কথা বলে লাখ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
ফেসবুক, টিকটক, ইউটিউব, হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন মাধ্যমে এসব বিজ্ঞাপন ছড়ানো হচ্ছে। আগ্রহীরা যোগাযোগ করলে প্রতারকেরা নিজেদের রিক্রুটিং এজেন্সি, ভিসা কনসালট্যান্ট বা অভিবাসন বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচয় দেন। পরে মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ বা ইমোর মাধ্যমে ফাইল খোলা, প্রসেসিং, মেডিকেল, ভিসা অনুমোদন ও ‘এম্বাসি ফি’র নামে ধাপে ধাপে টাকা নেওয়া হয়।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিশ্বাস অর্জনের জন্য কথিত ভিসার কপি, বিমান টিকিট, অস্ট্রেলিয়ায় কর্মরত ব্যক্তিদের ছবি, অফিসের ভিডিও ও বিভিন্ন নথি দেখানো হয়। এমনকি অন্য ব্যক্তির অস্ট্রেলিয়ার ভিসা সম্পাদনা করে নতুন আবেদনকারীর নামে ভুয়া ভিসা তৈরি করে পাঠানো হচ্ছে। এরপর বলা হচ্ছে, ভিসা অনুমোদন হয়েছে, এখন টাকা পরিশোধ করলেই মূল কপি দেওয়া হবে।
অর্থ নেওয়ার পর একপর্যায়ে বন্ধ হয়ে যায় যোগাযোগ। অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজ, গ্রুপ ও ব্যবহৃত ফোন নম্বরও বন্ধ করে দেওয়া হয়।
ভুক্তভোগীদের একজন জামিল আহমদ জানান, ফেসবুকে অস্ট্রেলিয়ার ওয়ার্ক পারমিটের বিজ্ঞাপন দেখে যোগাযোগের পর বিভিন্ন খরচের কথা বলে তার কাছে টাকা দাবি করা হয়। আরেক ভুক্তভোগী কামরান আহমদ বলেন, তাকে উচ্চ বেতনের চাকরি ও স্থায়ী বসবাসের সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। পরে একটি ভিসার কপি পাঠিয়ে সেটি অনুমোদিত বলে দাবি করা হলেও যাচাই করে তিনি সেটি জাল বলে জানতে পারেন।
শুধু বাংলাদেশে নয়, মধ্যপ্রাচ্য ও মালয়েশিয়ায় থাকা বাংলাদেশি প্রবাসীদের কাছেও এসব বিজ্ঞাপন পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান, কুয়েত ও মালয়েশিয়ায় থাকা প্রবাসীদের হোয়াটসঅ্যাপ বা মেসেঞ্জারের মাধ্যমে যোগাযোগ করে অস্ট্রেলিয়ার ড্রাইভিং ভিসা, কমলা ও আপেলবাগানের চাকরির প্রলোভন দেখানো হচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী শিপন আহমদ জানান, বাংলাদেশ থেকে প্রায়ই তাকে কমলা বা আপেলবাগানের কাজের ভিসার সত্যতা জানতে ফোন করা হয়। তার মতে, বিদেশ যাওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে কাজে লাগিয়ে একটি চক্র সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার আশায় অনেকে জমি বিক্রি, ঋণ কিংবা পরিবারের সঞ্চয় থেকে অর্থ সংগ্রহ করছেন। পরে প্রতারণার শিকার হয়ে সেই অর্থ হারাচ্ছেন। এতে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি পারিবারিক ও মানসিক চাপেও পড়ছেন ভুক্তভোগীরা।
অভিবাসন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিজ্ঞাপন দেখে কোনো এজেন্টকে সরাসরি টাকা দেওয়া উচিত নয়। চাকরির প্রস্তাব, নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান, ভিসার ধরন ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র যাচাই করতে হবে।
অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্র দপ্তরও ভিসা প্রতারণা নিয়ে সতর্ক করেছে। দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ভুয়া এজেন্টরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে মানুষকে প্রতারিত করে এবং মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, ভুয়া নথি বা আবেদন না করেই অর্থ নেওয়ার মতো কৌশল ব্যবহার করতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার আইনে অর্থের বিনিময়ে অভিবাসন সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে নিবন্ধিত মাইগ্রেশন এজেন্ট বা অস্ট্রেলিয়ান আইনজীবীর মতো অনুমোদিত ব্যক্তির সহায়তা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সন্দেহজনক ভিসা প্রতারণা অস্ট্রেলিয়ার Border Watch-এ জানানোও যায়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘শতভাগ ভিসা’, ‘দ্রুত ওয়ার্ক পারমিট’ বা ‘IELTS ছাড়াই নিশ্চিত চাকরি’- এ ধরনের প্রতিশ্রুতি দেখলেই সতর্ক হতে হবে। যাচাই ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিজ্ঞাপনে বিশ্বাস করে অর্থ দিলে বিদেশ যাওয়ার স্বপ্নের বদলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
