ছবি: সংগৃহীত
শিকলে বাঁধা কিশোরী আর আমাদের ৩৫ সেকেন্ডের নীরবতা
একটি মেয়ের কোমরে শিকল।
শিকলের অন্য প্রান্ত ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে একজন।
আরেকজন শিকল পরানোর কাজে সহযোগিতা করছে।
মেয়েটি কাঁদছে। ছটফট করছে। অসহায়ভাবে মুক্তি চাইছে।
আর চারপাশে মানুষ।
কেউ তাকিয়ে আছে। কেউ দাঁড়িয়ে আছে। কেউ হয়তো মোবাইল হাতে দৃশ্যটি দেখছে। কারও মুখে কৌতূহল, কারও চোখে বিস্ময়; কিন্তু সেই ভিড়ের মধ্যে মেয়েটির পাশে দাঁড়ানোর মতো একজন মানুষও যেন নেই।
মাত্র ৩৫ সেকেন্ডের একটি ভিডিও। অথচ এই ৩৫ সেকেন্ডই আমাদের সমাজের সামনে একটি দীর্ঘ প্রশ্ন রেখে গেছে; একজন মানুষকে প্রকাশ্যে অপমান ও নির্যাতন করা হলে আমরা আসলে কতটা মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াই?
চুরির অভিযোগ ছিল-এটি সত্য কি না, সেটি তদন্তের বিষয়। অভিযোগ সত্য হলেও কোনো ব্যক্তি বা স্থানীয় জনতার হাতে কাউকে শিকল পরিয়ে রাস্তায় হাঁটানোর অধিকার নেই। বিচার করার ক্ষমতা আদালতের; শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতাও আইনের। মানুষকে অপমান করা, মারধর করা কিংবা প্রকাশ্যে হেয় করা কোনোভাবেই বিচার নয়।
বরং সেটি আরেকটি অপরাধের জন্ম দেয়।
সবচেয়ে ভয়ংকর দৃশ্য শিকল নয়, দর্শকদের নীরবতা
ভিডিওতে যাঁদের দেখা গেছে, তাঁদের প্রত্যেকের আইনগত ভূমিকা এক নয়—এ কথা স্পষ্টভাবে বলা দরকার। কে শিকল পরিয়েছে, কে টেনেছে, কে সহযোগিতা করেছে, কে শুধু দাঁড়িয়ে ছিল—এসব তদন্তের বিষয়।
কিন্তু নৈতিক প্রশ্নটি আরও বড়।
যে মেয়েটি কাঁদছিল, তাকে বাঁচাতে কি একজন মানুষও এগিয়ে যেতে পারতেন না?
কেউ কি বলতে পারতেন না- ‘এভাবে করবেন না, পুলিশে দিন’?
কেউ কি শিকলটি খুলে দিতে পারতেন না?
কেউ কি শুধু তার পাশে দাঁড়িয়ে বলতে পারতেন না- ‘ভয় পেয়ো না, তোমাকে আর কেউ মারবে না’?
হয়তো পারতেন।
কিন্তু কেউ করেননি।
এখানেই আমাদের সমাজের সবচেয়ে বড় পরাজয়।
কারণ নির্যাতনকারী একজন বা দুজন হতে পারে। কিন্তু নির্যাতন চলার সময় চারপাশের সবাই যখন নীরব দর্শক হয়ে যায়, তখন সেই নীরবতা নির্যাতনকারীকে আরও শক্তি দেয়।
রাজনের কথা কি আমরা ভুলে গেছি?
সিলেটের কুমারগাঁওয়ে শিশু সামিউল আলম রাজনকে চুরির অভিযোগে নির্যাতনের সময়ও একটি ভিডিও ধারণ করা হয়েছিল। সেই ভিডিওতে নির্যাতনকারীদের পাশাপাশি ভিডিও ধারণকারীর ভূমিকা নিয়েও আদালতে প্রশ্ন উঠেছিল।
রাজন হত্যা মামলার বিচারিক রায়ে ভিডিও ধারণকারী নূর আহমদকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছিল, তাঁর অসংলগ্ন কথাবার্তা ও হাসিঠাট্টা নির্মম তামাশা হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছিল এবং তাঁকে হত্যার প্ররোচনাকারী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
পরবর্তী হাইকোর্টের রায়েও আদালত একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছিল-নূর চাইলে পুলিশ বা ম্যাজিস্ট্রেটকে ঘটনাটি জানাতে পারতেন। তাঁর হাতে সে সুযোগ ও সময় ছিল। কিন্তু তিনি তা করেননি এবং পরে পালিয়ে যান। তাই তিনি দায় এড়াতে পারেন না।
রাজনের সেই ঘটনা আমাদের একটি কঠিন শিক্ষা দিয়েছিল; অপরাধের সামনে দাঁড়িয়ে শুধু ভিডিও করা কিংবা নীরব দর্শক হয়ে থাকা সব সময় নির্দোষ অবস্থান নয়।
আজ, এত বছর পর, সেই একই প্রশ্ন আবার ফিরে এসেছে।
ভিডিও ধারণ করা মানেই সাক্ষী হওয়া নয়
আজ মানুষের হাতে মোবাইল ফোন আছে। যেকোনো ঘটনা মুহূর্তেই ভিডিও করা যায়। কিন্তু ভিডিও করার আগে আমাদের একটি প্রশ্ন করা দরকার; আমি কি শুধু দর্শক, নাকি একজন মানুষ?
কেউ বিপদে পড়লে ক্যামেরা অন করার আগে হাত বাড়ানো দরকার।
কেউ নির্যাতিত হলে ভিডিও সংরক্ষণ করে পুলিশের কাছে প্রমাণ হিসেবে দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু নির্যাতন বন্ধ করার চেষ্টা না করে শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দৃশ্য ধারণ করা মানবিকতার কোনো বিকল্প নয়।
রাজন হত্যার ঘটনায় ভিডিওটি শেষ পর্যন্ত অপরাধীদের শনাক্ত ও বিচারের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু আদালতের পর্যবেক্ষণ আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে; প্রমাণ ধারণ করা আর অপরাধ ঠেকানোর দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানো এক জিনিস নয়।
এই ঘটনায় শাহজালাল উপশহর এলাকার মো. জাকির হোসেন (৪৩), তার ভাই মো. মোজাক্কির হোসেন (৪০) এবং একই এলাকার মো. বুরহান উদ্দিন (৪৫) আটক হয়েছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা হয়েছে এবং আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে; এখন তদন্ত ও বিচার আইনের পথেই এগিয়ে যাবে।
কিন্তু শুধু তিনজনের বিচার হলেই কি আমাদের দায়িত্ব শেষ?
না।
আমাদের নিজেদেরও কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।
কারণ ৩৫ সেকেন্ডের ভিডিওতে শুধু একজন কিশোরীর কান্না দেখা যায়নি; দেখা গেছে আমাদের সামাজিক বিবেকের অসহায়তাও।
একজন কিশোরীকে চোর বলার আগে আমরা কি নিশ্চিত হয়েছিলাম সে সত্যিই চুরি করেছে?
অভিযোগ সত্য হলেও তাকে শিকল পরানোর অধিকার কে দিয়েছে?
আর যখন তাকে শিকল পরানো হচ্ছিল, তখন আশপাশের মানুষগুলো কেন নীরব ছিল?
আজ মেয়েটি কাঁদছিল।
কাল হয়তো অন্য কেউ কাঁদবে।
প্রশ্ন হলো- তখনও কি আমরা মোবাইল হাতে দাঁড়িয়ে থাকব, নাকি একজন মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াব?
একটি সভ্য সমাজের পরিচয় শুধু অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার মধ্যে নয়।
একটি সভ্য সমাজের পরিচয় হলো; অন্যায় যখন চোখের সামনে ঘটে, তখন কতজন মানুষ তার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়।
সিলেটের এই ৩৫ সেকেন্ডের ভিডিও তাই শুধু একটি নির্যাতনের ভিডিও নয়।
এটি আমাদের বিবেকেরও একটি ভিডিও।
আর সেই ভিডিওতে আমরা প্রত্যেকে কোথায় দাঁড়িয়ে আছি; সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।