ছবি: সংগৃহীত
সুনামগঞ্জের অন্যতম বালু-পাথর মহাল ধোপাজান চলতি নদী। একসময় দিনের আলোয় যেখানে বৈধভাবে শ্রমিকদের কর্মচাঞ্চল্যে মুখর থাকত নদীর বুক, সেখানে ইজারা বন্ধ থাকার সুযোগে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর শুরু হয় বালু লুটের হিড়িক। রাতের আঁধারে নৌকা, ড্রেজার ও নানা কৌশলে বালু সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এতে সরকার কয়েকশ কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
এবার সেই লুট ঠেকাতে নতুন কৌশল নিয়েছে পুলিশ। ধোপাজান নদীর মুখে পুলিশ চৌকির পাশাপাশি স্থাপন করা হয়েছে সিসি ক্যামেরা। ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি করা হচ্ছে নদীপথে চলাচলকারী নৌযানের ওপর। পুলিশের দাবি, বালু লুটের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে এই নজরদারি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ধোপাজানে বালু লুট বন্ধে এ ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি দেশে প্রথম। আগে রাতের আঁধারে কিংবা নানা উপায়ে ‘ম্যানেজ’ করে নৌকায় করে বালু নিয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু পুলিশ চৌকিতে ক্যামেরা বসানোর পর পরিস্থিতি অনেকটাই বদলেছে। অবৈধভাবে বালু পরিবহনের সঙ্গে জড়িতদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে আতঙ্ক।
দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের শেষ সীমানা ভারতের মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে আসা ডলুরা চলতি নদী সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার ধোপাজান এলাকায় এসে বালু ও পাথরের গুরুত্বপূর্ণ উৎসে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা ও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাবের কারণে ২০১৮ সালে আদালতের আদেশে এই কোয়ারি থেকে বালু উত্তোলন বন্ধ করা হয়।
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ইজারাবিহীন অবস্থায় শুরু হয় ব্যাপক বালু লুট। স্থানীয়দের অভিযোগ, কয়েক দফায় হাজার হাজার নৌকায় করে নদী থেকে বালু তুলে নেওয়া হয়। এতে বিপুল রাজস্ব হারায় সরকার। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন তৎপর হলে একপর্যায়ে অবৈধ উত্তোলন বন্ধ হয়। এর মধ্যেই নানা অভিযোগের পর তৎকালীন পুলিশ সুপার আনোয়ার হোসেনকে প্রত্যাহার করা হয় । এরপর প্রশাসন ও পুলিশ নতুন করে তৎপর হলে ধোপাজানে বালু লুটে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ আসে।
বালুমহালে উত্তোলন বন্ধ থাকলেও ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য গত বছরের অক্টোবরে নদী থেকে বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হয়। প্রায় এক কোটি টাকা রাজস্বের বিপরীতে এক কোটি ২১ লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলনের অনুমতি পায় বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ-বিআইডব্লিউটিএ।
এরপর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান লিমপিড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিরুদ্ধে নদীতে ড্রেজার ও বোমা মেশিন ব্যবহার করে বালু উত্তোলনের অভিযোগ ওঠে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এতে নদীর তীরবর্তী বসতভিটা, ফসলি জমি, বাঁধ, কবরস্থান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মসজিদ হুমকির মুখে পড়ে।
পরিস্থিতির প্রতিবাদে স্থানীয়রা আন্দোলনে নামেন। পরে ওই উত্তোলন বন্ধ হলেও রাতের আঁধারে ড্রেজার দিয়ে বালু লুটের অভিযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। এমনকি নদীর মুখে পুলিশ চেকপোস্ট বসানোর পরও বিভিন্ন কৌশলে বালু সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
ক্যামেরায় নজরদারি, বদলেছে চিত্র
সম্প্রতি ধোপাজান নদীর মুখে পুলিশ চৌকিতে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়। ক্যামেরাটি সরাসরি সুনামগঞ্জ সদর থানার ওসির মোবাইল ফোনের সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে। নদীপথে সন্দেহজনক কোনো নৌযান চলাচল করলে তার ভিডিও তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।
সদর থানার ওসি রতন শেখ বলেন, নদীর মুখে লাগানো অত্যাধুনিক ক্যামেরা তাঁর মোবাইলের সঙ্গে সংযুক্ত। কোনো কিছু ওই পথে আসামাত্র কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও তাঁর মোবাইলে চলে আসে। পুলিশ সুপারও বিষয়টি মনিটরিং করেন। বিদ্যুৎ না থাকলেও ক্যামেরা সচল থাকবে।
পুলিশের ভাষ্য, কোনো নৌকা নজরদারি এড়িয়ে চলে গেলেও ক্যামেরার ফুটেজ দেখে পরে সেটি শনাক্ত করা সম্ভব। নৌকার ধরন ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ছবি সংগ্রহ করে স্থানীয়দের কাছ থেকেও তথ্য নেওয়া যাবে।
‘ম্যানেজ’ বন্ধ হয়েছে-বলছেন স্থানীয়রা
বাদরটেক গ্রামের মিজানুর রহমান ও কাদের মিয়া বলেন, আগে রাতের আঁধারে অনেকে চুরি করে বালু নিয়ে যেতেন। এখন পুলিশ ক্যাম্পে সিসি ক্যামেরা বসানোর কারণে সেই সুযোগ অনেকটাই বন্ধ হয়েছে। অবৈধভাবে বালু নিতে গেলে নৌকাসহ থানায় নেওয়া হচ্ছে।
একই গ্রামের রুহুল মিয়ার ভাষ্য, আগে চুপচাপ ‘ম্যানেজ’ করে নৌকায় বালু নিয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল। ক্যামেরা স্থাপনের পর সেই সুযোগ কমেছে। তাঁর কথায়, ‘ম্যানেজ করা এবং ম্যানেজ হওয়া-দুটিই বন্ধ হয়েছে।’
তবে স্থানীয় এক তরুণ নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, এখনো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান-যেমন মসজিদ বা হাসপাতালের প্রয়োজন দেখিয়ে সীমিত পরিমাণ বালুর অনুমতিপত্র নিয়ে তার চেয়ে বহুগুণ বেশি বালু নেওয়ার চেষ্টা হয়।
শ্রমিকদের দাবি সম্পদ রক্ষা হোক, কর্মসংস্থানও থাকুক
ধোপাজানের সঙ্গে শুধু বালু-পাথর নয়, স্থানীয় মানুষের জীবিকা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দীর্ঘদিন উত্তোলন বন্ধ থাকায় অনেক শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন বলে স্থানীয় শ্রমিকদের দাবি।
শ্রমিক কামাল আহমদ বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর লুটেরা চক্র হাজার হাজার নৌকায় করে অবৈধভাবে বালু নিয়ে গেছে। এখন সিসি ক্যামেরা স্থাপনের ফলে নজরদারি বেড়েছে। তাঁর দাবি, প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার পাশাপাশি স্থানীয় শ্রমিকদের বৈধভাবে কাজের সুযোগ দিতে হবে। সনাতন পদ্ধতিতে হাতে-বেলচায় বালু-পাথর উত্তোলনের সুযোগ চালু হলে শ্রমিকেরা আবার জীবিকা ফিরে পাবেন।
শুধু ক্যামেরায় কি থামবে লুট?
সুনামগঞ্জ সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সহসভাপতি খলিল রহমান মনে করেন, শুধু লোক দেখানো নজরদারি দিয়ে সরকারি সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব নয়। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আন্তরিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
তিনি বলেন, সুনামগঞ্জের বালু-পাথর নিয়ে নানা আলোচনা রয়েছে। সম্পদ রক্ষার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের বিষয়ে মানুষের মধ্যে যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে, তা দূর করতে হবে। কারণ এই সম্পদের সঙ্গে পরিবেশ, প্রকৃতি এবং মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত।
পুলিশের খাতায় ৬৬ মামলা, আসামি ৭৪১
সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার এ বি এম জাকির হোসেন বলছেন, শুধু ক্যামেরার নজরদারি যথেষ্ট নয়। ইজারাবিহীন বালুমহাল থেকে লুট, বৈধ মহালে নিয়ম না মেনে ড্রেজার চালানো, নদীর পাড় কাটা এবং মসজিদ-হাসপাতালের নাম ব্যবহার করে নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে বহুগুণ বালু উত্তোলন; সবই ঠেকাতে আরও কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন।
পুলিশ সুপারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি সুনামগঞ্জে বালু লুটের ঘটনায় ৬৬টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে ৭৪১ জনকে এবং ঘটনাস্থল থেকে ৬০ জনকে হাতেনাতে আটক করা হয়েছে। তবে তাঁর দাবি, আইনের বিভিন্ন ফাঁকফোকর দিয়ে কোনো আসামিই দীর্ঘ সময় হাজতে থাকেনি। তাঁর মতে, কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য একটি টাস্কফোর্স গঠন করে ধারাবাহিক অভিযান চালাতে হবে। পাশাপাশি বেআইনি কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।
ধোপাজানে সিসি ক্যামেরা বসানো নিঃসন্দেহে নজরদারির ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। নদীর মুখে কে ঢুকছে, কোন নৌকা বের হচ্ছে; তার দৃশ্যমান রেকর্ড এখন পুলিশের হাতে থাকছে। স্থানীয়দের মধ্যেও এর ইতিবাচক প্রভাবের কথা শোনা যাচ্ছে।
