কমলনগর
মাদ্রাসায় রাতের আঁধারে অধ্যক্ষের ‘নাইট কোচিং’
শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৩ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ, অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে রাতযাপনেরও অভিযোগ
প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২১:৩০
ছবি: প্রতীকী
লক্ষ্মীপুরের কমলনগরের হাজিরহাট হামিদিয়া কামিল (এমএ) মাদ্রাসায় সরকারি নীতিমালা উপেক্ষা করে রাতে ‘নাইট কোচিং’ পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিদিন রাত ৮টা থেকে ৯টা পর্যন্ত মাদ্রাসার শ্রেণিকক্ষে ৭৫ থেকে ১০০ শিক্ষার্থীকে কোচিং করানো হয়। এ জন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মাথাপিছু ৩ হাজার টাকা করে নেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
গত ২২ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ৮টার দিকে সরেজমিনে মাদ্রাসায় গিয়ে নাইট কোচিং চলতে দেখা যায়। এ সময় মাদ্রাসার সহকারী অধ্যাপক (আরবি) ও অধ্যক্ষ দেলোয়ার হোসেনের আত্মীয় নুরুল হুদাকে শিক্ষার্থীদের কোচিং করাতে দেখা যায়। পাশেই অবস্থান করছিলেন অধ্যক্ষ দেলোয়ার হোসেন। তাঁর পাশে দুই নারীও অবস্থান করছিলেন। তবে ওই দুই নারী শিক্ষার্থীদের অভিভাবক কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
অভিযোগ রয়েছে, নিয়মিত রাতযাপনও করেন অধ্যক্ষ দেলোয়ার হোসেন। মাদ্রাসার চতুর্থ তলার একটি কক্ষ তিনি রাতে ব্যবহার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে প্রতিষ্ঠানটির একটি অংশ ব্যক্তিগত আবাসস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাতে মাদ্রাসায় অবস্থান এবং নাইট কোচিং পরিচালনার বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যক্ষ দেলোয়ার হোসেন গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘আপনারা রাতের বেলা কেন এসেছেন? যা বলার অফিস টাইমে এসে বলবেন।’ রাতযাপনের বিষয়ে জানতে চাইলেও তিনি একই কথা বলেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাদ্রাসার পাঠদানের কাজে ব্যবহৃত ভবনটি মূলত ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে নির্মিত তিনতলা সাইক্লোন শেল্টার। দুর্যোগের সময় সাধারণ মানুষের আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে নির্মিত হলেও বর্তমানে ভবনটিতে নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, রাতে কোচিং চলাকালে ভবনের নিচতলার লোহার কলাপসিবল গেটে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।
মাদ্রাসায় অধ্যক্ষ দেলোয়ার হোসেন যোগদানের পর থেকেই বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি আলোচনায় রয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। এর আগে গণপূর্ত বিভাগের মালিকানাধীন কোটি টাকা মূল্যের একটি ভবন নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করে সেই অর্থ মাদ্রাসার হিসাবে জমা না রেখে ব্যক্তিগত হিসাবে রাখার অভিযোগ উঠেছিল তাঁর বিরুদ্ধে। সংবাদ প্রকাশ ও প্রশাসনিক চাপের পর ওই টাকা মাদ্রাসার হিসাবে ফেরত দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। এছাড়া সরকারি বই অবৈধভাবে বিক্রির অভিযোগেও তাঁর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানা গেছে।
মাদ্রাসার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক বলেন, ‘অধ্যক্ষ প্রতিষ্ঠানে নিজের একক আধিপত্য বজায় রাখতে একটি শক্ত সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা উপেক্ষা করে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।’
তবে নাইট কোচিং ও অন্যান্য অভিযোগের বিষয়ে অধ্যক্ষের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলেও তিনি অফিস সময়ের বাইরে এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
কমলনগর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মিজানুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোচিং বাণিজ্য গড়ে তোলা বিধিবহির্ভূত। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাহাত উজ-জামান বলেন, রাতে মাদ্রাসায় কোচিং করানো বা রাতযাপনের কোনো সুযোগ নেই। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দ্রুত প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সভাপতি ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সম্রাট খীসার সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
