পাঠ্যবই ছাপায় ২৫০ কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ, সময়মতো বই পাওয়া নিয়ে শঙ্কা
প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ ১৯:২১
ছবি: সংগৃহীত
২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বিনা মূল্যের পাঠ্যবই ছাপানোর দরপত্রে অনিয়ম, সিন্ডিকেট করে কাজ ভাগাভাগি এবং প্রাক্কলিত দর পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যেই নির্ধারিত সময়ের তুলনায় বই ছাপানোর অগ্রগতি পিছিয়ে রয়েছে। ফলে আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে সব বই সরবরাহ করা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) অধীনে আগামী শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রায় ৩১ কোটি পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ চলছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে একটি সংবাদমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে দরপত্র প্রক্রিয়ায় অনিয়ম এবং ২৬টি ছাপাখানার নির্ধারিত সময়ে বই সরবরাহ করতে না পারার আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ই-টেন্ডারের প্রাক্কলিত দর ফাঁস, দরপত্র জমায় সমঝোতা এবং কাজ ভাগাভাগির মাধ্যমে একটি সিন্ডিকেট সুবিধা নিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সহকারী মো. জাহাঙ্গীর আলমের ব্যবসায়িক অংশীদার এবং একটি ছাপাখানার মালিকের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ওই ব্যবসায়ীর পরিবারের চারটি ছাপাখানা এবারও সর্বাধিক কাজ পেয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং তদন্তের চূড়ান্ত ফল জানা না গেলে অভিযোগগুলোকে প্রমাণিত অনিয়ম হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
গোয়েন্দা প্রতিবেদন পাওয়ার পর গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে ১০টি ছাপাখানার মালিককে ডেকে পাঠান শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। বৈঠকে জাহাঙ্গীর আলমের ব্যবসায়িক অংশীদারও উপস্থিত ছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
বৈঠকে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে মানসম্মত সব পাঠ্যবই সরবরাহ করতে হবে। যারা নির্ধারিত সময়ে বই দিতে পারবে না, তাদের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে ডিসেম্বরে চীন থেকে বই ছাপিয়ে আনার প্রস্তুতি রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ মুদ্রণশিল্প সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও অগ্রণী প্রিন্টিং প্রেসের স্বত্বাধিকারী মো. কাউসার-উজ-জামান রুবেলের কাছে বই ছাপানোর অগ্রগতি জানতে চান মন্ত্রী। জবাবে রুবেল জানান, ৩০ নভেম্বরের মধ্যে ৯৫ শতাংশ বই সরবরাহ করা সম্ভব হবে। বাকি ৫ শতাংশ বইয়ের জন্য তিনি অতিরিক্ত সময় চান।
কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শতভাগ বই সরবরাহ করা সম্ভব হবে না কেন, তার যৌক্তিক ব্যাখ্যা চান শিক্ষামন্ত্রী। বৈঠকে একটি ছাপাখানা থেকে নিম্নমানের বই পাওয়ার বিষয়েও সংশ্লিষ্ট মালিকের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। ভবিষ্যতে এমনটি আর হবে না বলে ওই মালিক অঙ্গীকার করেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বুধবারের মধ্যে মোট পাঠ্যবইয়ের ৫০ শতাংশ ছাপানোর লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও তখন পর্যন্ত ৩০ শতাংশের কম বই ছাপানো হয়েছে। অর্থাৎ নির্ধারিত অগ্রগতির তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ পিছিয়ে রয়েছে কাজ।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, শেষ মুহূর্তে বই ছাপানোর চাপ তৈরি হলে কাগজের মান যাচাই ও অন্যান্য গুণগত বিষয় পরীক্ষা করার সুযোগ কমে যায়। এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে কিছু ছাপাখানা নিম্নমানের কাগজ ব্যবহার করে বেশি মুনাফা করার চেষ্টা করে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে পাঁচটি ছাপাখানার মালিক সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, দেশীয় ছাপাখানার একটি অংশের অতিরিক্ত মুনাফার প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে এ খাতে প্রায় দুই লাখ মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে বলে তাঁরা উল্লেখ করেন।
দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতার ঘাটতি নিয়ে প্রতিবেদনে একাধিক পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে। প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি, ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম এবং নবম-দশম শ্রেণির বই ছাপানোর জন্য মোট ৪৫টি দরপত্রের মধ্যে ৩০টিতে মাত্র একটি করে দরপত্র জমা পড়ে। ১৩টিতে দুটি করে এবং দুটি দরপত্রে তিনটি করে প্রস্তাব জমা পড়ে।
অর্থাৎ মোট দরপত্রের প্রায় ৬৬ দশমিক ৬৬ শতাংশে একক দরদাতা ছিল। অথচ দেশে সহস্রাধিক ছাপাখানা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দরপত্রের নথি বিশ্লেষণের বরাতে আরও বলা হয়েছে, কয়েকটি লটে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক দরপত্র বিক্রি হলেও জমা পড়েছে মাত্র একটি বা দুটি। উদাহরণ হিসেবে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির ৩৮৮ নম্বর লটে ১৭টি দরপত্র বিক্রি হলেও জমা পড়ে একটি। ষষ্ঠ শ্রেণির ৬৫২ নম্বর লটে ১৯টি দরপত্র বিক্রি হলেও জমা পড়ে একটি।
প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, দরপত্র প্রক্রিয়া চলাকালে প্রাক্কলিত দর পরিবর্তন করে বাড়ানো হয়। এ ক্ষেত্রে বাজার যাচাই, প্রতিযোগিতামূলক দর এবং সরকারি ক্রয়বিধি অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
দরপত্রের প্রাক্কলিত দর পরিবর্তনের ক্ষেত্রে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর)-২০২৫ অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, দরপত্র উন্মুক্ত হওয়ার পর প্রাক্কলিত ব্যয় পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত বিধি অনুসরণ করতে হয়। প্রতিযোগিতার অভাব কিংবা সর্বনিম্ন মূল্যায়িত দর প্রাক্কলিত ব্যয়ের চেয়ে বেশি হলে বিধি অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ায় এসব নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা তদন্তের বিষয়।
এ ঘটনায় তথ্য সংগ্রহের জন্য এনসিটিবিতে অভিযান চালিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গত মঙ্গলবারের অভিযানে দরপত্র-সংক্রান্ত বেশ কিছু নথিপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, অভিযানের পরদিন বুধবার এনসিটিবিতে ছাপাখানার মালিকদের ডেকে নিয়ে প্রথম পর্যায়ে নির্ধারিত প্রাক্কলিত দর বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না- এমন বক্তব্য তাঁদের নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের প্যাডে আগের তারিখ দেখিয়ে লিখিতভাবে নেওয়া হয়। বিষয়টি নিয়ে এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফখরুল মাওলার বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিক স্তরের বই ছাপানোর ক্ষেত্রে ফর্মাপ্রতি গড় দর দাঁড়িয়েছে ৩ টাকা ৩২ পয়সা এবং প্রাথমিক স্তরে ৩ টাকা ৫৪ পয়সা। এর আগের শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিকের ক্ষেত্রে গড় দর ছিল ২ টাকা ৩১ পয়সা এবং প্রাথমিকের ক্ষেত্রে ৩ টাকা ৪৪ পয়সা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বই ছাপাতে প্রায় ৮৫ হাজার মেট্রিক টন কাগজ ব্যবহৃত হচ্ছে। দরপত্রের প্রাক্কলিত দর পরিবর্তন এবং প্রতিযোগিতার ঘাটতির কারণে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বাংলাদেশ মুদ্রণশিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান বলেন, দরপত্র উন্মুক্ত হওয়ার পর নতুন করে প্রাক্কলিত দর নির্ধারণের সুযোগ নেই। তাঁর অভিযোগ, এনসিটিবি এ ক্ষেত্রে আইনবহির্ভূত কাজ করেছে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রতিকার নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
প্রতিবেদনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে পরিচিত মো. জাহাঙ্গীর আলমের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ‘স্কাই রি-অ্যারেঞ্জ লিমিটেড’-এর আর্থিক কার্যক্রম নিয়েও অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিটি বিকাশের ডিস্ট্রিবিউশন ফ্র্যাঞ্চাইজি নেয়। পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটির ব্যাংক হিসাবগুলোতে অস্বাভাবিক লেনদেনের অভিযোগ ওঠে। বিদেশে প্রায় ১০০ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে জাহাঙ্গীর আলম ও তাঁর প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) মামলা করেছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে পাঠ্যবই ছাপানোর ব্যবসায় যুক্ত একজন প্রভাবশালী ছাপাখানার মালিকের অংশীদারত্ব ছিল বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে অর্থ পাচারের অভিযোগ এবং পাঠ্যবইয়ের দরপত্রে অনিয়মের অভিযোগের মধ্যে কোনো যোগসূত্র তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রায় ৩১ কোটি বিনা মূল্যের পাঠ্যবই ছাপানোর এই কার্যক্রমে একদিকে দরপত্রের স্বচ্ছতা, অন্যদিকে সময়মতো বই সরবরাহ- দুটি বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
দরপত্রে অনিয়মের অভিযোগ, প্রতিযোগিতার ঘাটতি এবং ছাপার কাজে পিছিয়ে থাকার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও ব্যাখ্যা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বইয়ের মান নিশ্চিত করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শিক্ষার্থীদের হাতে পাঠ্যবই পৌঁছে দেওয়াই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
দুদকের তদন্তে দরপত্র প্রক্রিয়ায় অনিয়ম বা সরকারি অর্থের ক্ষতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন মুদ্রণশিল্প-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
