শিরোনাম
নিউইয়র্কে কিশোরী রোগীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে ৭২ বছর বয়সী চিকিৎসক গ্রেপ্তার তাহসিফ সৌরির মৃত্যু: বন্ধু দীপকে হেফাজতে নিল পিবিআই জাপানে বছরে এক লাখ কর্মী পাঠানোর উদ্যোগ বাংলাদেশের ত্রুটি সারিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে ঢাকার পথে বিমান সিলেটসহ সব সিটিতে ব্যাটারিচালিত রিকশার জন্য নতুন নিয়ম সিলেটে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস ঘিরে প্রস্তুতি, নিবন্ধন ৪৩ হাজার রায়হান হ/ত্যাকাণ্ড: দণ্ডপ্রাপ্ত আ/সামিদের কে কোথায়, ক্ষুব্ধ মা রায়হান হ/ত্যা মা/মলায় আকবরের মৃ/ত্যুদণ্ড, দুই পুলিশ সদস্যের যাবজ্জীবন সিলেটে চাঞ্চল্যকর সাবানা হ/ত্যা/কা/ন্ডে ৪ জনের ফাঁ/সি সিলেটসহ সারাদেশে ভোটার এলাকা পরিবর্তনের আবেদনের সময় বাড়ল

https://www.emjanews.com/

20123

national

প্রকাশিত

৩০ অক্টোবর ২০২৬ ১৩:৩৮

জাতীয়

চাঁদার টাকায় স্বপ্নের খেলার মাঠ, গ্রামজুড়ে উৎসবের আমেজ

প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬ ১৩:৩৮

ছবি: সংগৃহীত

ধান কাটার পর ফাঁকা জমিতে ছুটে বেড়াত শিশুরা। কখনো ফুটবল, কখনো ক্রিকেট-হাসি-আনন্দে মেতে উঠত গ্রামের কিশোর-তরুণেরা। কিন্তু মাঠে আবার ফসলের আবাদ শুরু হলেই থেমে যেত তাদের খেলাধুলা। সেই আক্ষেপ এবার ঘুচল গ্রামবাসীর সম্মিলিত উদ্যোগে। কারও সামর্থ্য বেশি, কারও কম; তবু সবার অংশগ্রহণে চাঁদা তুলে কেনা হয়েছে ৬০ শতাংশ জমি। তৈরি হয়েছে একটি স্থায়ী খেলার মাঠের স্বপ্ন। জমির দখল বুঝে নেওয়ার দিন বাদ্যযন্ত্রের তালে, ফুলের মালা আর জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে উৎসবে মেতে ওঠে পুরো গ্রাম।

একটি খেলার মাঠ-শুনতে খুব সাধারণ চাওয়া। অথচ একটি গ্রামের শিশু-কিশোরদের কাছে সেই চাওয়াই ছিল দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন পূরণে কেউ দিয়েছেন ২০০ টাকা, কেউ ৫০০, কেউ এক হাজার। আবার সামর্থ্য অনুযায়ী কেউ দিয়েছেন দুই হাজার, পাঁচ হাজার কিংবা ১০ হাজার টাকা। এভাবেই ছোট ছোট সহযোগিতা একসময় রূপ নিয়েছে বড় এক অর্জনে।

ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগের গল্প টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার দেউলী ইউনিয়নের বাবুপুর গ্রামের। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) গ্রামবাসী আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের কেনা জমির দখল বুঝে নেন। দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ হওয়ায় সেদিন সকাল থেকেই গ্রামজুড়ে ছিল উৎসবের আবহ।

বাবুপুর গ্রামে সাত শতাধিক পরিবারের বসবাস। জনসংখ্যা সাড়ে তিন হাজারের বেশি। এত মানুষের বসতি হলেও গ্রামে ছিল না নির্দিষ্ট কোনো খেলার মাঠ। ফলে শিশু-কিশোর ও তরুণদের নিয়মিত খেলাধুলার সুযোগ ছিল সীমিত।

ধান কাটার মৌসুমে ফাঁকা হয়ে যাওয়া কৃষিজমিই হয়ে উঠত তাদের অস্থায়ী খেলার জায়গা। সেখানে ফুটবল, ক্রিকেটসহ নানা খেলায় মেতে উঠত তারা। কিন্তু জমিতে নতুন করে ফসলের আবাদ শুরু হলে বন্ধ হয়ে যেত খেলাধুলা। আবার পরবর্তী ধান কাটার মৌসুম পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো।

এভাবে বছরের একটি নির্দিষ্ট সময় খেলাধুলার সুযোগ পেলেও বাকি সময় মাঠের অভাবে ঘরবন্দি কিংবা অনিশ্চিত পরিবেশে দিন কাটত অনেক শিশুর। কয়েকবার স্থায়ী মাঠের জন্য জমি কেনার উদ্যোগ নেওয়া হলেও নানা কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি।

দীর্ঘদিনের এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানে এগিয়ে আসেন গ্রামের সন্তান এস এম ইকবাল মাহমুদ ও ক্রীড়াব্যক্তিত্ব খোরশেদ আলম।

ইকবাল মাহমুদ জানান, কয়েক মাস আগে খোরশেদ আলমের সঙ্গে গ্রামের জন্য একটি খেলার মাঠ কেনার বিষয়ে আলোচনা করেন তিনি। প্রস্তাবটি ছিল, কোনো একক ব্যক্তি নয়, গ্রামের সবাই মিলে নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ দেবেন। সেই অর্থ দিয়ে কেনা হবে মাঠের জমি।

প্রস্তাবটি ভালোভাবে গ্রহণ করেন খোরশেদ আলম। পরে গ্রামের কয়েকজন সামর্থ্যবান ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁরাও সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

এরপর গত ৮ সেপ্টেম্বর গ্রামবাসীকে নিয়ে আনুষ্ঠানিক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় উপস্থিত সবাই মাঠের জন্য জমি কেনার পক্ষে মত দেন। যার যতটুকু সামর্থ্য, সেই অনুযায়ী অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তাঁরা। সেখান থেকেই শুরু হয় স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথচলা।

এই উদ্যোগে গ্রামের বিত্তবানদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। কেউ দিয়েছেন ২০০ টাকা, কেউ ৫০০ কিংবা এক হাজার টাকা। আবার কেউ দুই হাজার, পাঁচ হাজার ও ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সহযোগিতা করেছেন।

উদ্যোক্তা খোরশেদ আলম জানান, ইকবাল মাহমুদের পাশাপাশি গ্রামের আজাহার শিকদার, সেলিম আল মামুন, মিজানুর রহমান, মজনু শিকদার, শফিকুল ইসলাম ও শুভ প্রামাণিক উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।

সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মিলিত অর্থায়নে গ্রামের ইকবাল হোসেন সুজনের কাছ থেকে ৬০ শতাংশ জমি কেনা হয়। প্রতি শতাংশ জমির দাম নির্ধারণ করা হয় ৫২ হাজার টাকা। জমির মালিকও মানবিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে এক শতাংশ জমি দান করেন। বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে জমিটি গ্রামবাসীর কাছে বুঝিয়ে দেন তিনি।

এখানে অর্থের অঙ্কের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে মানুষের অংশগ্রহণ। কারণ, কেউ হয়তো দিয়েছেন মাত্র ২০০ টাকা, কিন্তু সেই টাকার মধ্যেও ছিল নিজের গ্রামের শিশুদের জন্য একটি মাঠ উপহার দেওয়ার আন্তরিকতা।


দীর্ঘদিনের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেওয়ার দিনটি স্মরণীয় করে রাখতে গ্রামবাসীর আয়োজনেও ছিল ভিন্নতা। বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই বাবুপুরে তৈরি হয় উৎসবের পরিবেশ। বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে গ্রামবাসী উপস্থিত হন নতুন কেনা জমিতে। সেখানে উত্তোলন করা হয় জাতীয় পতাকা।

উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের পাশাপাশি গ্রামের প্রবীণদের ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নেন তরুণেরা। আনন্দ, উচ্ছ্বাস আর পারস্পরিক সৌহার্দ্যে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।

সেদিন জমিটি শুধু কয়েকজন মানুষের কেনা একটি সম্পত্তি ছিল না; হয়ে উঠেছিল পুরো গ্রামের সম্মিলিত স্বপ্নের প্রতীক। শিশু-কিশোরদের চোখে ছিল নতুন মাঠে খেলার আনন্দ, আর প্রবীণদের মুখে ছিল বহুদিনের অপেক্ষা পূরণের তৃপ্তি।

মাঠের জন্য জমি কেনার অন্যতম উদ্যোক্তা খোরশেদ আলম বলেন, আপাতত ৬০ শতাংশ জমি কেনা হয়েছে। এর পাশেই আরও ৬০ শতাংশ জমি কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। সব মিলিয়ে ১২০ শতাংশ জমি পাওয়া গেলে সেখানে একটি ভালো মানের খেলার মাঠ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

ভবিষ্যতে এই মাঠকে কেন্দ্র করে গ্রামের ক্রীড়াচর্চা এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্য তাঁদের। শিশু-কিশোর ও তরুণদের নিয়মিত খেলাধুলার সুযোগ তৈরি করার পাশাপাশি গ্রামের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেরও একটি সুন্দর পরিবেশ গড়ে তুলতে চান তাঁরা।

নতুন মাঠ পেয়ে সবচেয়ে বেশি উচ্ছ্বসিত গ্রামের শিশু-কিশোরেরা। তাদের কাছে এই মাঠ কেবল খেলাধুলার জায়গা নয়, বরং আনন্দের স্বাধীন একটি ঠিকানা।

গ্রামের কিশোর হাবিবুল্লাহ সালমান জানায়, আগে ধান কাটার পর ফাঁকা জমিতে খেলাধুলা করা গেলেও নতুন করে ফসলের আবাদ শুরু হলে খেলা বন্ধ হয়ে যেত। এখন স্থায়ী মাঠ হওয়ায় সারা বছর খেলতে পারবে তারা। এ কারণে তারা খুবই আনন্দিত।

আরেক কিশোর রাব্বী জোহা জানায়, বাড়ির উঠানে ফুটবল খেলতে গিয়ে অনেক সময় বলের আঘাতে ঘরের বেড়া ক্ষতিগ্রস্ত হতো। এ জন্য পরিবারের সদস্যদের বকাঝকাও শুনতে হতো। এখন মাঠ হওয়ায় সেখানে নিশ্চিন্তে খেলাধুলা করতে পারবে তারা।

শিশুদের এই আনন্দের মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে বাবুপুরের উদ্যোগের সবচেয়ে বড় সার্থকতা।

গ্রামের প্রবীণ আব্দুল মান্নান ব্যাপারী বলেন, একটি খেলার মাঠের জন্য তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করেছেন। অবশেষে নিজেদের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হওয়ায় গ্রামের সবাই আনন্দিত।

বাবুপুর মসজিদ কমিটির সভাপতি নজরুল শিকদার মনে করেন, মাঠে নিয়মিত খেলাধুলার পরিবেশ তৈরি হলে কিশোর ও তরুণেরা একটি সুস্থ সামাজিক পরিসর পাবে। এতে তারা মাদক ও সন্ত্রাস থেকে দূরে থাকতে উৎসাহিত হবে।

বাবুপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ও মোনালিসা উইমেন্স স্পোর্টস একাডেমির পরিচালক মোনালিসা মুন্নি বলেন, গ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা ছিল একটি খেলার মাঠ। সম্মিলিত উদ্যোগে সেই প্রত্যাশা পূরণ হওয়া নিঃসন্দেহে বড় অর্জন।

অন্যদিকে সরকারি কিংবা বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের সহায়তা ছাড়াই গ্রামবাসীর নিজেদের অর্থায়নে জমি কেনার উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন সরকারি মাওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শামসুল হুদা। তাঁর মতে, বাবুপুরের এই উদ্যোগ দেশের অন্যান্য গ্রামের মানুষকেও নিজেদের প্রয়োজন পূরণে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে অনুপ্রাণিত করতে পারে।

বাবুপুরের এই উদ্যোগের সৌন্দর্য শুধু ৬০ শতাংশ জমি কেনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সবচেয়ে বড় অর্জন হলো গ্রামের মানুষের একসঙ্গে দাঁড়ানোর মানসিকতা। এখানে ধনী-গরিবের পার্থক্য মুখ্য হয়ে ওঠেনি। কেউ বড় অঙ্কের অর্থ দিয়েছেন, কেউ সামান্য; কিন্তু সবার লক্ষ্য ছিল এক—গ্রামের শিশু-কিশোরদের জন্য একটি স্থায়ী খেলার মাঠ তৈরি করা।

একটি মাঠ হয়তো শুধু ঘাসে ঢাকা কিছু জমি নয়। সেখানে জন্ম নেয় বন্ধুত্ব, তৈরি হয় নেতৃত্বের গুণ, শেখা যায় দলগতভাবে কাজ করা, জয়-পরাজয় মেনে নেওয়ার মানসিকতা। মাঠের সবুজে বেড়ে ওঠে শৈশব, কৈশোর খুঁজে পায় প্রাণের উচ্ছ্বাস। আর খেলাধুলার মধ্য দিয়ে তরুণেরা পেতে পারে মাদক, অপরাধ ও হতাশা থেকে দূরে থাকার একটি সুস্থ বিকল্প।

বাবুপুরের মানুষ তাই শুধু জমি কেনেননি, তাঁরা কিনেছেন তাঁদের আগামী প্রজন্মের জন্য আনন্দময় শৈশবের একটি ঠিকানা। যে মাঠে একদিন হয়তো ফুটবলের গোল উদ্‌যাপনে কেঁপে উঠবে গ্রাম, ক্রিকেটের ব্যাটে-বলে ছড়িয়ে পড়বে উল্লাস, আর নতুন প্রজন্ম শিখবে একসঙ্গে স্বপ্ন দেখতে।

ধানের জমি থেকে খেলার মাঠ-এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে মানুষের ভালোবাসা, সহযোগিতা আর সম্মিলিত প্রত্যয়। বাবুপুরের গল্প তাই একটি গ্রামের মাঠ কেনার গল্পের চেয়েও বড়; এটি প্রমাণ করে, মানুষ চাইলে নিজেরাই নিজেদের স্বপ্নের ভিত গড়ে তুলতে পারে।