সুনামগঞ্জে যুদ্ধাপ/রাধের মা/মলার সাক্ষীর বাড়িতে হা/মলা: মা/মলায় আ/সামী শতাধিক
প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬ ১৪:৫৯
সুনামগঞ্জের শাল্লায় একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার সাক্ষী দুলাল মিয়ার বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় মামলা হয়েছে। মামলায় ৩৩ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতপরিচয় আরও ৭০ জনকে আসামি করা হয়েছে। হামলাকারীরা বাড়ি থেকে প্রায় ৪০ লাখ টাকার মালামাল লুট করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন বাদী।
রোববার (১ নভেম্বর) বিকেলে দুলাল মিয়ার মেয়ে সেলিনা আক্তার উজ্জ্বলা শাল্লা থানায় মামলাটি করেন। এর আগে গত বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) রাত ৯টার দিকে উপজেলার দৌলতপুর গ্রামে এ হামলার ঘটনা ঘটে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, হামলাকারীরা দুলাল মিয়ার বাড়িতে ঢুকে ভাঙচুর চালান এবং পরিবারের সদস্যদের মারধর করেন। এ সময় ছয়টি গরু, পাঁচটি ফ্রিজ, দুটি আইপিএস, দুটি ব্যাটারি, একটি এলইডি টেলিভিশন, সাড়ে পাঁচ ভরি স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকাসহ প্রায় ৪০ লাখ টাকার মালামাল লুট করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
দোকানে চুরির অভিযোগের পর হামলা
দুলাল মিয়ার মেয়ে সেলিনা আক্তার উজ্জ্বলার ভাষ্য, গত ২৩ অক্টোবর তাদের দোকানে চুরির ঘটনা ঘটে। বিষয়টি পুলিশকে জানানোর পর গত ২৯ অক্টোবর পুলিশ তদন্তে তাদের বাড়িতে যায়। পুলিশ চলে যাওয়ার পর গ্রামে পুলিশের যাওয়ার কারণ নিয়ে কয়েকজন ক্ষুব্ধ হন। এর জেরে রাত ৯টার দিকে গ্রামের জালাল মিয়া, আবদুল হেকিম ও তাদের পরিবারের সদস্যসহ অনেকে লাঠিসোঁটা নিয়ে বাড়িতে হামলা চালান।
উজ্জ্বলার অভিযোগ, হামলাকারীরা বাড়িঘর ও দোকান ভাঙচুরের পাশাপাশি মালামাল লুট করেন। এ সময় পরিবারের নারী-পুরুষদের মারধর করা হয়।
হামলায় দুলাল মিয়ার ছেলে সাদ্দাম হোসেনের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী কুলসুমা বেগম (৩২), মেয়ে সেলিনা আক্তার উজ্জ্বলা (৩৫), ছোট ছেলে উজ্জ্বল মিয়ার স্ত্রী রোকেয়া বেগম (৩২) এবং উজ্জ্বল মিয়ার ছেলে এলিম মিয়া (৩) আহত হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আহতদের মধ্যে কুলসুমা বেগম দিরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং অন্যরা শাল্লা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছেন।
মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার সাক্ষী দুলাল
দুলাল মিয়া ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলার সাক্ষী। তার বাবা মামুদ মিয়া মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকারদের হাতে শহীদ হন বলে পরিবার সূত্রে জানা গেছে। তার ফুফু প্রয়াত জমিলা খাতুনও বীরাঙ্গনা ছিলেন।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধের সময় শাল্লা উপজেলার উজানগাঁও, শ্যামারচর ও পেরুয়া গ্রামে গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ ও ধর্ষণসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন পেরুয়া গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা রজনী দাস।
ওই মামলায় জুবায়ের মুনির, জাকির হোসেন, সিদ্দিকুর রহমান, দৌলতপুর গ্রামের আবদুল হেকিম, আবদুল গণি মিয়া ও তোতা মিয়াসহ ১১ জন গ্রেপ্তার হন। দুলাল মিয়া ওই মামলার সাক্ষী।
দুলাল মিয়ার অভিযোগ, মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় সাক্ষী হওয়ায় তাদের পরিবারের ওপর একটি পক্ষের ক্ষোভ রয়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে তারা বেশি হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
তিনি জানান, তার মেয়ে সেলিনা আক্তার উজ্জ্বলা ও মেয়ের জামাই হেলাল মিয়া বাড়িতে থাকেন। বাড়ির সামনে একটি দোকান দিয়ে তারা ব্যবসা করেন। হামলাকারীরা দোকান ও বাড়ির মালামাল লুট করে নিয়ে গেছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মাদক কারবার নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
ভুক্তভোগী পরিবারের বিরুদ্ধে মাদক কারবারের অভিযোগ তুলেছেন অভিযুক্ত জালাল মিয়া। তিনি বলেন, উজ্জ্বলার পরিবার এলাকায় মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত বলে পরিচিত। এলাকার মাদকবিরোধী ঐক্য পরিষদের পক্ষ থেকে তাদের একাধিকবার এ ব্যবসা ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করা হলেও তারা তা করেননি।
জালাল মিয়া বলেন, ‘আমরা উজ্জ্বলার বাড়িঘর লুটপাটের সঙ্গে জড়িত নই। এলাকার লোকজন ক্ষুব্ধ হয়ে হামলা করতে পারে।’
অন্যদিকে, সেলিনা আক্তার উজ্জ্বলার দাবি, তিনি মাদকের বিরুদ্ধে কাজ করেন। এর আগে অন্তত ১২ জনকে মাদকসহ পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছেন। তার অভিযোগ, ওই ব্যক্তিদের মধ্যে কেউ কেউ এখন তাদের হয়রানি ও হুমকি দিচ্ছেন। মাদকসহ বিভিন্ন মামলায়ও তাদের হয়রানি করা হচ্ছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ভুক্তভোগী পরিবারের বিরুদ্ধে মাদক কারবারের অভিযোগ রয়েছে। গত কয়েক বছরে তাদের বিরুদ্ধে মাদক ও চুরিসহ ২০ থেকে ২৫টি মামলা হয়েছে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
শাল্লা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ সুহেল বলেন, দৌলতপুর গ্রামে উজ্জ্বলার বাড়িতে হামলা ও লুটপাটের অভিযোগে রোববার বিকেলে মামলা হয়েছে। মামলায় ৩৩ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাতপরিচয় আরও ৭০ থেকে ৮০ জনকে আসামি করা হয়েছে। তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
