ছবি: সাজু মারছিয়াং
মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার কর্মধা ইউনিয়নে ইছাছড়া খাসিয়া পুঞ্জিতে আদিবাসী দম্পতির ১২ শতাধিক পরিপক্ব পানগাছ কেটে ফেলায় ফুঁসে উঠেছে স্থানীয় খাসিয়ারা। এই ন্যাক্কারজনক ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতার করে সুষ্ঠু বিচার, আদিবাসী পানচাষীদের পানজুম ও জীবন-জীবিকার নিরাপত্তার দাবিতে বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) সকাল ১১ ঘটিকায় কুলাউড়া শহরে কুবরাজ আন্তঃপুঞ্জি উন্নয়ন সংগঠন, খাসি স্টুডেন্টস ইউনিয়ন, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম-মৌলভীবাজার জেলা শাখা এবং বৃহত্তর সিলেট আদিবাসী অধিকার সুরক্ষা নাগরিক কমিটি বিশাল মানববন্ধন কর্মসূচির আয়োজন করে। মানববন্ধনে কয়েক শতাধিক আদিবাসী নারী-পুরুষ, রাজনৈতিক দলের নেতা ও বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
কুবরাজ আন্তঃপুঞ্জি উন্নয়ন সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি প্রত্যুষ আসাক্রার সভাপতিত্বে ও আদিবাসী নেত্রী হেলেনা তালাং এবং মনিকা খংলার যৌথ সঞ্চালনায় মানববন্ধনে বক্তব্য ও সংহতি প্রকাশ করেন কুলাউড়া সরকারি ডিগ্রি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ সৌম্য প্রদীপ ভট্টাচার্য সজল, বাংলাদেশ জাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মঈনুল ইসলাম শামীম, কুলাউড়া উপজেলা কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক মাহবুব করিম মিন্টু, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও কুবরাজ আন্তঃপুঞ্জি উন্নয়ন সংগঠনের সাধারন সম্পাদক ফ্লোরা বাবলি তালাং, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যনির্বাহী সদস্য রিপন বানাই, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম মৌলভীবাজার শাখা সহ-সভাপতি নারায়ণ কুর্মী, সহ সাধারণ সম্পাদক হিরন্ময় সিংহ, বৃহত্তর সিলেট আদিবাসী অধিকার সুরক্ষা নাগরিক কমিটি সদস্য সচিব এড. আবুল হাসান, বাসদ মার্কসবাদী কুলাউড়া উপজেলার নেতা সাদমান সৌমিক মজুমদার, ঝিমাই পুঞ্জির মান্রী রানা সুরং, ইছাছড়া পুঞ্জির ক্ষতিগ্রস্ত ভূক্তভোগী অনন্ত ও সরিস লামারাই প্রমুখ।
মানববন্ধনে সংহতি জানিয়ে বক্তারা বলেন, পান গাছ খাসিয়া সম্প্রদায়ের বেঁচে থাকার একমাত্র প্রধান অবলম্বন। সেই গাছের ওপর হামলা মানে একটি পরিবারের মেরুদন্ড ভেঙে দেওয়া। যদি অতি দ্রুত অপরাধীদের গ্রেফতার করা না হয়, তবে পুরো জেলার আদিবাসী সম্প্রদায় কঠোর আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবে।
মানববন্ধন শেষে একটি বিশাল প্রতিবাদী মিছিল কুলাউড়া শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে মিছিলটি উপজেলা চত্বরে গিয়ে শেষ হয়। এরপর আদিবাসী নেতৃবৃন্দ কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবরে একটি স্মারকলিপি প্রদান করেন। যার অনুলিপি স্থানীয় সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার এবং কুলাউড়া থানার অফিসার ইনচার্জ বরাবরও দেয়া হয়েছে।
স্মারকলিপিতে আদিবাসীদের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট ৫ টি দাবি উত্থাপন করা হয়- ১. অবিলম্বে অনন্ত-সরিস লামারাই দম্পতির পানজুম কাটার সাথে জড়িত দুর্বৃত্তদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনতে হবে। ২. ক্ষতিগ্রস্থ দম্পতিকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। ৩. বিভিন্ন পুঞ্জিতে পানগাছ কাটার সাথে জড়িত ব্যক্তিদেরকে চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনতে হবে। আদিবাসী পানচাষীদের অধিকার, জানমালের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ৪. আদিবাসী বিরোধী প্রোপাগান্ডা বন্ধ করা এবং আইনী স্বীকৃতি প্রদানের মাধ্যমে ঐতিহ্যগত ভূমি অধিকার থেকে বঞ্চিত ও উচ্ছেদের ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে হবে। পান, সুপারীসহ বিভিন্ন ফসল চুরি প্রতিরোধে শক্তিশালী পুলিশী তৎপরতা জারি রাখতে হবে। চুরির সাথে জড়িত অপরাধীদের শনাক্ত করা এবং আইনের আওতায় আনতে হবে। ৫. পানজুমে গবাদিপশুর অবাধ বিচরণ রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহন করতে হবে। স্থানীয় বাঙ্গালীদের মধ্যে আদিবাসী বিদ্বেষ দূর করে সম্প্রীতির বন্ধন দৃঢ় করা এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ব্যাপক সামাজিক, রাজনৈতিক, প্রশাসনিক উদ্যোগ গ্রহন করতে হবে।
আদিবাসী নেত্রী আন্তঃপুঞ্জি উন্নয়ন সংগঠন কুবরাজের সাধারণ সম্পাদক ফ্লোরা বাবলী তালাং বলেন, ‘কুলাউড়ায় ছোট-বড় মিলে ৩২টি পুঞ্জিতে আমরা খাসিয়া আদিবাসীরা নিজস্ব ভাষা, কৃষ্টি-সংস্কৃতি, ধর্ম, ঐতিহ্যগত প্রথা বজায় রেখে বসবাস করে আসছি। আমরা আজও ভূমির অধিকার থেকে বঞ্চিত রয়েছি। পাহাড়ী বনাঞ্চলে বসবাসরত খাসিয়া আদিবাসীদের জীবন জীবিকা মূলত পান চাষের মাধ্যমে নির্বাহ করা হয়। পান চাষের জন্য পুঞ্জিবাসী সম্পূর্ণ রুপে প্রাকৃতিক বনের উপর নির্ভরশীল। আদিবাসীরা বনকে কখনই বাণিজ্যিক দৃষ্টিতে দেখে না। দীর্ঘকাল থেকে বংশপরম্পরায় প্রাণ-প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসম্য রক্ষা করে আদিবাসীরা বিশেষ কৃষি পদ্ধতিতে পান-সুপারি, বিভিন্ন প্রকার ফল-ফলাদি চাষ-বাসের মাধ্যমে নিজেদের জীবিকা নির্বাহে পাশাপাশি স্থানীয় বাঙ্গালি জনগনের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘সম্প্রতি ইছাছড়া পুঞ্জির অনন্ত-সরিস লামারাই দম্পতির মালিকানাধীন পানজুমের ফলবান ১২শ পান গাছ দুর্বৃত্তরা কেটে ফেলেছে। এই ঘটনার পর ইছাছড়া পুঞ্জিসহ কুলাউড়ার সকল খাসিয়া পুঞ্জির পানচাষীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্ক তৈরী করেছে। দীর্ঘদিন যাবৎ আমাদের বিভিন্ন পুঞ্জিগুলোতে পান-সুপারিসহ বিভিন্ন ফসল চুরি, রাতের পানগাছ কাটা, অন্যায়ভাবে পুঞ্জি দখলের চেষ্টা, পুঞ্জিবাসীর উপরে সন্ত্রাসী হামলা, যাতায়াতের রাস্তায় অবৈধভাবে বাধা ইত্যাদি ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।’
তিনি বলেন, ২০২৪ ও ২০২৫ সালের বিভিন্ন সময়ে এওলাছড়া, ইছাছড়া, নুনছড়া, মুরইছড়া, ঝিমাই, লুতিজুরি, নার্সারী, ইছলাছড়া ইত্যাদি পুঞ্জির বিভিন্ন পানজুমের প্রায় ৫ হাজার অধিক পানগাছ অন্যায়ভাবে কেটে ফেলে দুর্বৃত্তরা।
উল্লেখ্য, গত ২৮ মার্চ গভীর রাতে ইছাছড়া পুঞ্জির আদিবাসী দম্পতি অনন্ত ও সরিস লামারাই-এর পানের জুমে হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। এতে ১২ শতাধিক পরিপক্ক পানগাছ কেটে ফেলা হয়, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ১২ লক্ষ টাকা। এই ঘটনার পর থেকেই আদিবাসী সমাজে তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্থ অনন্ত কুলাউড়া থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দিলে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। তবে এখনও পর্যন্ত এ ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।
