ভারতে নারীদের ধর্মীয় অধিকার নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে ঐতিহাসিক শুনানি
প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০২৬ ২১:৩৪
ছবি: সংগৃহীত
দক্ষিণ ভারতের কেরালা রাজ্যের বিখ্যাত সাবরিমালা মন্দির-এ ঋতুমতী বয়সী নারীদের প্রবেশাধিকার নিয়ে ২০১৮ সালের ঐতিহাসিক রায় পুনর্বিবেচনার লক্ষ্যে করা একাধিক আবেদনের শুনানি শুরু করেছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট।
প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত-এর নেতৃত্বে গঠিত নয় সদস্যের সাংবিধানিক বেঞ্চ এই মামলার পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে নারীদের প্রবেশ সংক্রান্ত বিষয়ও একসঙ্গে বিবেচনা করছে। আদালত নির্ধারণ করবে- পারসি অগ্নিমন্দির ও মুসলিম মসজিদে নারীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা বৈধ কি না, ধর্মীয় নেতারা কাউকে সমাজচ্যুত করতে পারেন কি না এবং নারী খতনা (FGM)-এর আইনগত অবস্থান কী।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই শুনানির রায় নারীদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও উপাসনালয়ে প্রবেশাধিকারের ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে।
উল্লেখ্য, সাবরিমালা মন্দির-এ দীর্ঘদিন ধরে ১০ থেকে ৫০ বছর বয়সী নারীদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। ফলে সাধারণত শুধু শিশু ও বয়স্ক নারীরাই সেখানে যেতে পারতেন। হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, ঋতুমতী নারীদের ‘অশুচি’ বিবেচনা করে অনেক ক্ষেত্রে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান থেকে দূরে রাখা হয়।
২০১৮ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট রায়ে এই নিষেধাজ্ঞাকে বৈষম্যমূলক ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করে বাতিল করে দেয়। বিচারপতিরা বলেন, ধর্ম পালনের অধিকার নারী-পুরুষ উভয়েরই সমানভাবে প্রযোজ্য।
তবে ওই রায়ে ভিন্নমত দেন একমাত্র নারী বিচারপতি ইন্দু মালহোত্রা। তিনি মত দেন, গভীর ধর্মীয় অনুভূতির বিষয়ে আদালতের হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়।
রায়ের পর কেরালা-জুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ দেখা দেয়। মন্দিরে প্রবেশের চেষ্টা করা অনেক নারী বাধার মুখে পড়েন, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে হামলার ঘটনাও ঘটে।
পরবর্তীতে রায়টি পুনর্বিবেচনার দাবিতে আদালতে একাধিক আবেদন করা হয়। ২০১৯ সালে এসব আবেদন গ্রহণ করে বৃহত্তর বেঞ্চ গঠন করা হয়। ২০২০ সালে বিষয়টির সাংবিধানিক গুরুত্ব বিবেচনায় নয় সদস্যের বেঞ্চ গঠন করা হলেও কোভিড-১৯ মহামারির কারণে শুনানি স্থগিত হয়ে যায়।
সম্প্রতি নতুন করে বেঞ্চ গঠন করে প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত জানিয়েছেন, এই শুনানিতে মূলত ‘আইনি প্রশ্নগুলো’ নির্ধারণ করা হবে।
এই বেঞ্চে বিচারপতি বি.ভি. নাগরাথ্না-ও রয়েছেন, যিনি একমাত্র নারী বিচারক এবং আগামী বছরে ভারতের প্রধান বিচারপতি হওয়ার কথা রয়েছে। বিভিন্ন ধর্ম, জাতি ও অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করেই বেঞ্চটি গঠন করা হয়েছে।
এদিকে, সাবরিমালা মন্দির পরিচালনাকারী ত্রাভাঙ্কোর দেবস্বম বোর্ড আদালতের কাছে ধর্মীয় প্রথায় হস্তক্ষেপ না করার আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারও রায় পুনর্বিবেচনার পক্ষে মত দিয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বেঞ্চের সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের অনুরূপ মামলাগুলোর জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন ধর্মীয় স্থানে নারীদের প্রবেশে শতাব্দীপ্রাচীন নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে আন্দোলন জোরদার হয়েছে, যেখানে নারীরা তাদের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে আসছেন।
এই গুরুত্বপূর্ণ শুনানি আগামী ২২ এপ্রিল পর্যন্ত চলবে।
