ছবি: আরিফুল হক চৌধুরী
আহমাদুল কবির: মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থার পর নতুন করে আশার আলো জাগছে। বাংলাদেশসহ ১৪টি সোর্স কান্ট্রি থেকে শ্রমিক নিলেও ২০২৫ সাল থেকে বাংলাদেশ বাদে বাকি ১৩টি দেশ থেকে স্বল্প খরচে কর্মী নিয়োগ অব্যাহত রেখেছে মালয়েশিয়া। নানা জটিলতায় ২০২৪ সালের মে মাস থেকে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য এই বাজার বন্ধ রয়েছে।
বন্ধ শ্রমবাজার উন্মুক্ত করতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর নেতৃত্বে দুই সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল বুধবার (৮ এপ্রিল) রাত ২টায় মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের এমএইচ-১৯৭ ফ্লাইটে কুয়ালালামপুরের উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করবেন। প্রতিনিধি দলে রয়েছেন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মাহদি আমিন।
তাদের সফরে মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও মানবসম্পদ মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শ্রমবাজার পুনরায় চালুর লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সম্ভাবনাও রয়েছে।
বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ বছরে ওমান, বাহরাইন, লিবিয়া, সুদান, মিশর, রোমানিয়া, ব্রুনাই ও মালদ্বীপসহ বেশ কয়েকটি দেশে বাংলাদেশি শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে গেছে। ২০২৪ সালে ১০ লাখের বেশি কর্মী বিদেশে গেলেও ৯৫% গেছে মাত্র পাঁচটি দেশে যা বাজার সংকোচনের স্পষ্ট ইঙ্গিত।
অন্যদিকে নারী কর্মী প্রেরণেও বড় ধস নেমেছে । ২০১৬ সালের তুলনায় প্রায় ৬৬% কমেছে।
মালয়েশিয়ার কৃষি, নির্মাণ, প্ল্যান্টেশন, উৎপাদন ও সেবা খাতে বাংলাদেশি শ্রমিকদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে প্রায় ৭ লাখ বৈধ বাংলাদেশি কর্মী সেখানে কাজ করছেন এবং বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স দেশে পাঠাচ্ছেন। এছাড়া প্রায় দেড় লাখ অবৈধ কর্মীও সেখানে কাজ করছেন যাদের বৈধকরণের দাবিও জোরালো হচ্ছে।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বারবার বন্ধ হওয়ার পেছনে কিছু সাধারণ অভিযোগ উঠে এসেছে। অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য, দুর্নীতি, কাজ ও বেতন না পাওয়া। ২০০৭, ২০১৮ এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালে এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে নিয়োগ বন্ধ করা হয়।
শ্রম ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে মালয়েশিয়া ইতোমধ্যে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার শর্ত বাস্তবায়ন, শ্রমিকদের জন্য সহজ অভিযোগ ব্যবস্থা, কর্মস্থল ও আবাসন পরিদর্শন, আন্তর্জাতিক অডিট ও রেটিং ব্যবস্থা। তবে অভিবাসন ব্যয় ও দুর্নীতির অভিযোগ পুরোপুরি দূর হয়নি।
মালয়েশিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশিরা প্রতিনিধি দলের সফরে আশাবাদী। তাদের প্রধান দাবি, সিন্ডিকেটমুক্ত নিয়োগ ব্যবস্থা, কম অভিবাসন ব্যয়, সব বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির অংশগ্রহণ, ভুয়া কোম্পানিতে কর্মী পাঠানো বন্ধ, অবৈধ কর্মীদের বৈধকরণ।
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার সম্পর্ক এখন শুধু শ্রমনির্ভর নয় বিনিয়োগ অংশীদারিত্বেও উন্নীত হয়েছে। মালয়েশিয়া বর্তমানে বাংলাদেশের ৮ম বৃহত্তম বিনিয়োগকারী দেশ।
আবহাওয়া, খাদ্যাভ্যাস, ধর্মীয় মিল ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার কারণে মালয়েশিয়া বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য একটি নিরাপদ ও জনপ্রিয় গন্তব্য।
দীর্ঘদিনের অচলাবস্থার পর উচ্চপর্যায়ের এই সফরকে ঘিরে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে বাস্তব অগ্রগতি নির্ভর করবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং অভিবাসন ব্যয় কমানোর ওপর।
সবকিছু ঠিক থাকলে, আবারও মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে ফিরতে পারে বাংলাদেশ প্রত্যাশা প্রবাসী ও সংশ্লিষ্ট সবার।
