https://www.emjanews.com/

16073

opinion

প্রকাশিত

০৩ জুন ২০২৬ ২১:৫৯

মতামত

পাঠাগার আর বিজ্ঞানাগারে অন্ধকার, শিক্ষাখাতে আলোর গল্প

প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬ ২১:৫৯

ছবি: সংগৃহীত

শিক্ষা শুধু পরীক্ষায় পাস করার মাধ্যম নয়; এটি মানুষকে জ্ঞানী, দক্ষ ও মানবিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার প্রক্রিয়া। একটি আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেবল শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। পাঠাগার, বিজ্ঞানাগার ও কম্পিউটার ল্যাবের মতো সহায়ক অবকাঠামোই শিক্ষাকে করে তোলে প্রাণবন্ত, বাস্তবমুখী ও সৃজনশীল। কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাস্তব চিত্র যেন ভিন্ন এক গল্প বলে।

গত দেড় দশক ধরে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ‘সৃজনশীল শিক্ষা’ শব্দটি ব্যাপকভাবে আলোচিত। শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তি, বিশ্লেষণ ক্ষমতা ও উদ্ভাবনী মনোভাব বিকাশের লক্ষ্যেই এ পদ্ধতি চালু করা হয়েছিল। কিন্তু প্রশ্ন হলো—সৃজনশীলতার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ ও উপকরণ ছাড়া কি সত্যিই সৃজনশীল শিক্ষা সম্ভব?

মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের ক্ষেত্রে পাঠাগার ও বিজ্ঞানাগার থাকা বাধ্যতামূলক। নিয়ম অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্তরভেদে একটি পাঠাগারে হাজার হাজার বই থাকার কথা। অথচ বাস্তবে অনেক প্রতিষ্ঠানে পাঠাগারের অস্তিত্ব কেবল অনুমোদনের নথিপত্রেই সীমাবদ্ধ। অনুমোদনের সময় ধার করা বই দিয়ে পাঠাগার দেখানো হলেও পরে সেই বই ফেরত দেওয়া হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পাঠাগার কক্ষই, খাবার ঘর কিংবা বড়জোর শ্রেণিকক্ষে রূপান্তরিত হয়, আবার কোথাও বছরের পর বছর তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকে। ফলে শিক্ষার্থীরা জ্ঞানচর্চার অন্যতম প্রধান উৎস থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

পাঠাগারকে বলা হয় জ্ঞানের ভাণ্ডার। এখান থেকেই শিক্ষার্থীরা পাঠ্যবইয়ের গণ্ডি পেরিয়ে সাহিত্য, ইতিহাস, বিজ্ঞান, দর্শন ও সমকালীন বিশ্ব সম্পর্কে জানতে পারে। পাঠাগার তাদের কৌতূহল জাগিয়ে তোলে, চিন্তার জগৎকে প্রসারিত করে এবং সৃজনশীলতা বিকাশে সহায়তা করে। কিন্তু যখন পাঠাগারের দরজাই বন্ধ থাকে, তখন শিক্ষার্থীদের সামনে জ্ঞানের সেই বিশাল পৃথিবীও অদৃশ্য হয়ে যায়।

একই চিত্র বিজ্ঞানাগার ও কম্পিউটার ল্যাবের ক্ষেত্রেও। আধুনিক বিশ্বে ব্যবহারিক শিক্ষা ছাড়া বিজ্ঞান শেখা প্রায় অসম্ভব। বিজ্ঞানাগার হলো সেই জায়গা, যেখানে বইয়ের তত্ত্ব বাস্তবে রূপ নেয়। পরীক্ষণ, পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞানকে অনুভব করে। কিন্তু দেশের অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞানাগার হয় নেই, নয়তো অচল। কোথাও যন্ত্রপাতির অভাব, কোথাও বছরের পর বছর তালা ঝুলছে দরজায়।

কম্পিউটার শিক্ষাও এখন সময়ের অপরিহার্য চাহিদা, এবং বাধ্যতামূলক। অথচ অনেক শিক্ষার্থী এমন প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছে, যেখানে কম্পিউটার ল্যাব থাকলেও তা শুধুমাত্র পরিদর্শনের দিন খোলা হয়, অথবা বিশেষ কোনো অনুষ্ঠানের হলরুম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মফস্বলের প্রায় শতভাগ এবং শহরের অধিকাংশ শিক্ষার্থী মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করেও বাস্তবে কখনো কম্পিউটার ব্যবহার করার সুযোগ পায় না।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ব্যবহারিক শিক্ষা ছাড়াই প্রতিবছর অসংখ্য শিক্ষার্থী বিজ্ঞান বিভাগ থেকে উত্তীর্ণ হচ্ছে। ব্যবহারিক পরীক্ষা সুযোগসন্ধ্যানী শিক্ষকদের ব্যবসা হয়ে ওঠেছে। পরীক্ষাগারে হাতে-কলমে শেখার পরিবর্তে তারা কেবল বই মুখস্থ করে, ব্যবহারিক খাতা তৈরি করে পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে, বিশেষ উপায়ে পাশও করছে। ফলে সনদ অর্জিত হলেও দক্ষতা ও বাস্তব জ্ঞানের ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। বিজ্ঞান শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য যেখানে অনুসন্ধান, পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োগ, সেখানে ব্যবহারিক অভিজ্ঞতাহীন শিক্ষা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দুর্বল করে তুলছে।

বিশেষ করে মফস্বল ও গ্রামীণ অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এ সংকট আরও প্রকট। অনেক শিক্ষার্থী পাঠাগার, বিজ্ঞানাগার কিংবা আইটি ল্যাবের প্রকৃত ব্যবহার সম্পর্কে জানেই না। অথচ বিশ্বব্যাপী জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের ক্ষেত্রে এসব সুবিধাকে মৌলিক অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিকীকরণও এ সংকটের অন্যতম কারণ। অধিক শিক্ষার্থী ভর্তি করিয়ে আর্থিক লাভ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে অনেক প্রতিষ্ঠান পাঠাগার ও পরীক্ষাগারের স্থানকে শ্রেণিকক্ষে রূপান্তর করছে। এতে শিক্ষার মৌলিক উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং শিক্ষার্থীরা প্রকৃত শিক্ষার পরিবর্তে কেবল সনদনির্ভর ব্যবস্থার অংশ হয়ে পড়ছে।

গত কয়েক বছরে বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় পাসের হার বেড়েছে। কিন্তু যখন শিক্ষার্থীরা পাঠাগার, বিজ্ঞানাগার ও প্রযুক্তিগত সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকে, তখন সেই সাফল্যের প্রকৃত মূল্য নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। কারণ শিক্ষার লক্ষ্য কেবল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া নয়; বরং জ্ঞান, দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও মানবিক গুণাবলির বিকাশ ঘটানো।

শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে হলে পাঠাগার, বিজ্ঞানাগার ও কম্পিউটার ল্যাবকে কেবল অনুমোদনের শর্ত হিসেবে নয়, শিক্ষার অপরিহার্য ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুমোদন, নবায়ন ও মূল্যায়নের সময় এসব সুবিধার বাস্তব উপস্থিতি ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে আরও সচেতন হতে হবে।

কারণ পাঠাগারহীন, বিজ্ঞানাগারহীন ও প্রযুক্তিবিমুখ শিক্ষাব্যবস্থা কখনোই দক্ষ, উদ্ভাবনী ও জ্ঞানভিত্তিক প্রজন্ম গড়ে তুলতে পারে না। সময়ের দাবি একটাই—শুধু পাসের সনদ নয়, শিক্ষার্থীরা চায় প্রকৃত শিক্ষা; এমন শিক্ষা যা তাদের ভবিষ্যৎ নির্মাণে সত্যিকার অর্থেই সহায়ক হবে।