শিরোনাম
সিলেটসহ আট জেলায় ঝড়-বৃষ্টির সতর্কতা রপ্তানি বাড়াতে চামড়া শিল্পে ২৩ উদ্যোগ নিয়েছে সরকার: সংসদে বাণিজ্যমন্ত্রী ৪,৮০০ ‘অবৈধ অভিবাসীকে’ বাংলাদেশে ফেরত, হোল্ডিং সেন্টারে আরও ৮৩৬ জন: পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী  ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা, শিশুসহ নিহ.ত ৪, আহ.ত অন্তত ৪০ সুনামগঞ্জে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকায় স্বজনপ্রীতির অভিযোগ সিলেটজুড়ে ব্যাপক অভিযানে আ/টক ১৭১: প্রায় ২শ গাড়ির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ে দুই চেয়ারম্যানের সমর্থকদের সংঘ.র্ষ, ওসিসহ আহ.ত অর্ধশতাধিক রাত ১০ টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখার দাবি ব্যবসায়ীদের ড. ইউনূসসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন খারিজ ড. ইউনূস-নুরজাহান বেগমসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন

https://www.emjanews.com/

16201

opinion

প্রকাশিত

০৮ জুন ২০২৬ ১৪:৩৬

মতামত

বিশ্বকাপ ২০২৬

আর্জেন্টিনা: আবেগ, অপেক্ষা ও অর্জনের গল্প

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬ ১৪:৩৬

ছবি: সংগৃহীত

যেভাবে আর্জেন্টিনার ভক্ত হলাম
বিশ্বকাপ ২০২৬-এর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে পৃথিবী আবার যখন ফুটবল উন্মাদনায় মেতে উঠছে, তখন আমার মন ফিরে যায় বহু বছর আগের সেই দিনগুলোতে। যে সময় ফুটবল ছিল না পরিসংখ্যানের বিষয়, ছিল না ট্যাকটিক্যাল বোর্ডের জটিল বিশ্লেষণ; ফুটবল ছিল নিখাদ আনন্দ, বিস্ময় আর আবেগের এক অনন্য জগৎ। সেই জগতেই আমার প্রথম পরিচয় আর্জেন্টিনার সঙ্গে।
ঘটনাটা আজও স্পষ্ট মনে আছে। কোনো এক জুম্মা বার নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বের হয়ে দেখি এলাকার কয়েকজন ভাই ও চাচা নীল-সাদা রঙের একটি ব্যানার টানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কিছুক্ষণ পরই রাস্তার দুই পাশের দুটি গাছের মাঝে টানিয়ে দেওয়া হলো সেই ব্যানার। নিচে লাল অক্ষরে লেখা কয়েকটি নাম-সালাম, কামরুল, শাহ মোস্তাফিজ, শাহজাহান, জাকের, শিরিল ও অমি।
কেন জানি না, মুহূর্তেই মুগ্ধ হয়ে গেলাম সেই আকাশি-সাদা রঙের প্রতি। মনে হলো, এ রঙের মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে অন্যরকম এক আকর্ষণ। সপ্তাহান্তে আমরাও উদ্যোগ নিলাম নিজেদের একটি ব্যানার বানানোর। গোলাপগঞ্জ থেকে পতাকার কাপড় কিনলাম, গেলাম আর্টের দোকানে। ব্যানারে লেখা হলো আমাদের নাম-সালমান, তাওহীদ, জাকারিয়া ও খালেদ। তারপর সেটিও টানিয়ে দেওয়া হলো গ্রামের রাস্তায়।
সেই সময় গ্রামগঞ্জে জার্সি কেনার প্রচলন ছিল খুবই কম। তাই বিশ্বকাপের উন্মাদনা প্রকাশ পেত অন্যভাবে— পতাকা টানিয়ে, দেয়ালে ছবি এঁকে, গ্রামের ছেলে-বুড়ো সবাই মিলে খেলা দেখে, আর প্রিয় দলের জয়-পরাজয়ের হিসাব কষে। তখন অফসাইড কী, তা বুঝতাম না। ৪-৩-৩ আর ৪-৪-২ ফরমেশনের পার্থক্যও জানা ছিল না। কিন্তু এটুকু বুঝতাম, আকাশি-সাদা জার্সি পরা দলটির প্রতি আমার এক অদ্ভুত পক্ষপাত জন্মেছে।
বিশ্বকাপ এলেই পাড়ার দেয়ালে পতাকা আঁকতাম, বন্ধুদের সঙ্গে তর্কে জড়াতাম, গভীর রাত পর্যন্ত জেগে খেলা দেখতাম। ধীরে ধীরে সেই সমর্থন রূপ নিল ভালোবাসায়। আর্জেন্টিনা তখন আর শুধু একটি দল ছিল না; ছিল আবেগের নাম, শৈশবের স্মৃতির নাম।
ম্যারাডোনার অসাধারণ সব কীর্তির গল্প শুনে বড় হয়েছি। তবে বয়স যখন একটু বাড়ল, তখন চিনলাম আরেক কিংবদন্তিকে; লিওনেল মেসিকে। তাঁর পায়ের জাদু, বিনয়, সংগ্রাম আর অবিশ্বাস্য প্রতিভা আর্জেন্টিনার প্রতি আমার ভালোবাসাকে আরও গভীর করে তুলল।
আজও যখন আকাশি-সাদা পতাকা বাতাসে উড়ে, তখন মনে হয় আমি যেন ফিরে গেছি সেই শৈশবের গ্রামে; যেখানে কয়েকজন মানুষের টানানো একটি ব্যানার অজান্তেই আমাকে আজীবনের জন্য আর্জেন্টিনার সমর্থকে পরিণত করেছিল।

ফুটবল বিশ্বে কেন আর্জেন্টিনা অনন্য
ফুটবল ইতিহাসে অসংখ্য মহান খেলোয়াড় জন্ম নিয়েছেন। কিন্তু লিওনেল মেসিকে দেখার অভিজ্ঞতা যেন অন্যরকম। তাঁর খেলা অনেক সময় ক্রীড়ার সীমানা পেরিয়ে শিল্পের পর্যায়ে পৌঁছে যায়। বল যেন তাঁর পায়ের কাছে কোনো জড় বস্তু নয়, বরং এক অনুগত সঙ্গী। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ চিরে এগিয়ে যাওয়া, অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলা কিংবা একটি নিখুঁত পাসে পুরো ম্যাচের চিত্র বদলে দেওয়া—এসব মুহূর্ত বারবার মনে করিয়ে দেয়, মানুষ কখনো কখনো নিজের সীমাবদ্ধতাকেও অতিক্রম করতে পারে।
তবে আর্জেন্টিনা কেবল মেসির গল্প নয়। আর্জেন্টিনা হলো এক সংগ্রামী জাতির গল্প, যারা বারবার প্রতিকূলতা পেরিয়ে নতুন করে দাঁড়িয়েছে। আর্জেন্টিনা মানে ডিয়েগো ম্যারাডোনার অগ্নিময় আত্মা; যিনি ফুটবলকে শুধু একটি খেলা হিসেবে দেখেননি, দেখেছিলেন আত্মমর্যাদা, প্রতিবাদ এবং স্বপ্নের ভাষা হিসেবে। আমাদের প্রজন্ম তাঁকে মাঠে খেলতে দেখার সৌভাগ্য পায়নি, কিন্তু তাঁর কিংবদন্তি শুনেই বড় হয়েছে। ফুটবলের ইতিহাসে যে কজন মানুষ সময়ের গণ্ডি অতিক্রম করে চিরকালীন হয়ে উঠেছেন, ম্যারাডোনা নিঃসন্দেহে তাঁদের একজন।
আর আছেন কার্লোস তেভেজ-সংগ্রাম আর আত্মবিশ্বাসের এক জীবন্ত প্রতীক। বুয়েনোস আইরেসের কুখ্যাত দরিদ্র এলাকা ‘ফুয়ের্তে আপাচে’ থেকে উঠে আসা এই মানুষটির জীবন ছিল কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াইয়ের গল্প। অপরাধ, দারিদ্র্য ও বৈষম্যে ঘেরা পরিবেশে বেড়ে ওঠা তেভেজ নিজেই বহুবার বলেছেন, ফুটবল না থাকলে হয়তো তাঁর জীবন অন্য কোনো অন্ধকার পথে মোড় নিতে পারত।
তেভেজের ফুটবলে ছিল না বাড়তি চাকচিক্য, ছিল না অলংকারময় সৌন্দর্যের প্রদর্শনী। কিন্তু ছিল অদম্য লড়াইয়ের স্পৃহা, ছিল হার না মানা এক মানসিকতা। তাঁর প্রতিটি দৌড়, প্রতিটি ট্যাকল, প্রতিটি গোল যেন উচ্চারণ করত একটি বার্তা; সংগ্রাম শেষ হয়নি, লড়াই চলবে। তাই তেভেজকে দেখলে আমার সবসময় মনে হতো, শুধু প্রতিভা নয়, দৃঢ় সংকল্প এবং কঠোর পরিশ্রমও মানুষকে সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে দিতে পারে।
সম্ভবত এ কারণেই আর্জেন্টিনা আমার কাছে শুধু একটি ফুটবল দল নয়। এটি এক আবেগের নাম, এক ইতিহাসের নাম, যেখানে প্রতিভা, সংগ্রাম, স্বপ্ন এবং আত্মমর্যাদা এক সুতোয় গাঁথা হয়ে আছে।

মেঘের পরে রোদ
সমর্থনের প্রকৃত পরীক্ষা কখনো জয়ের দিনে হয় না; হয় পরাজয়ের দিনে। বিজয়ের উল্লাসে সবাই পাশে থাকে, কিন্তু হারার বেদনা বয়ে নিয়ে চলতে পারে কেবল প্রকৃত সমর্থকেরাই।
২০১৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনাল তাই আমার প্রজন্মের আর্জেন্টিনা সমর্থকদের হৃদয়ে আজও এক অপূর্ণ অধ্যায় হয়ে রয়ে গেছে। অতিরিক্ত সময়ে মারিও গোটজের সেই গোল, লিওনেল মেসির নিস্তব্ধ ও শূন্য দৃষ্টি, আর কোটি কোটি সমর্থকের হতবাক নীরবতা-সেই রাতের স্মৃতি আজও সহজে ভোলা যায় না। মনে হয়েছিল, স্বপ্নটা ঠিক সামনে এসেও যেন হাতছাড়া হয়ে গেল।
এরপর আরও দুটি কোপা আমেরিকার ফাইনাল। আর দুবারই ব্যর্থতা। প্রতিবারই আশার প্রদীপ জ্বলে উঠেছিল, আবার নিভেও গিয়েছিল। তখন অনেকের মতো আমরাও ভাবতে শুরু করেছিলাম; সম্ভবত ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলার লিওনেল মেসির ভাগ্যে বিশ্বকাপ ট্রফি লেখা নেই। হয়তো তাঁর ক্যারিয়ারে এই একটি অপূর্ণতাই চিরকাল থেকে যাবে।
কিন্তু ইতিহাসেরও নিজস্ব এক সৌন্দর্য আছে। সে কখনো কখনো দীর্ঘ অপেক্ষা করায়, কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করায়, কিন্তু প্রকৃত প্রাপ্যকে শেষ পর্যন্ত বঞ্চিত করে না।
তাই ২০২২ সালের ডিসেম্বরের সেই রাত ছিল শুধু একটি ফুটবল ম্যাচের সমাপ্তি নয়; ছিল এক দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান। ছিল ব্যর্থতা, সমালোচনা, অপমান, হতাশা আর অসমাপ্ত স্বপ্নের বিরুদ্ধে এক মহিমান্বিত জয়। সেই রাতে যখন লিওনেল মেসি দুই হাতে বিশ্বকাপ ট্রফি তুলে ধরলেন, তখন মনে হয়েছিল ফুটবল যেন তার সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে ন্যায়সঙ্গত পরিণতি খুঁজে পেয়েছে।
আর সেই মুহূর্তে আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা জার্সিতে যুক্ত হলো তৃতীয় তারকা। কিন্তু আমাদের মতো সমর্থকদের কাছে সেই তারকা শুধু একটি শিরোপার প্রতীক নয়; এটি অপেক্ষার, বিশ্বাসের, ভালোবাসার এবং কখনো হাল না ছেড়ে দেওয়ার এক অনন্য স্মারক।

২০২২ বিশ্বকাপ জেতার স্মৃতি
সংক্ষেপে বললে, ২০২২ বিশ্বকাপ ফাইনালের রাতটি আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় রাতগুলোর একটি।
সেদিন গ্রামের ভাই-বন্ধুদের সঙ্গে বন্ধু রাসেলের বাড়িতে বসে খেলা দেখছিলাম। ম্যাচের প্রতিটি মুহূর্ত ছিল রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনায় ভরা। কখনো মনে হয়েছে আর্জেন্টিনা জয়ের খুব কাছে, আবার মুহূর্তেই ফ্রান্সের দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনে সবকিছু অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। অতিরিক্ত সময়ের নাটকীয়তা, গোলের পাল্টাপাল্টি আঘাত এবং টাইব্রেকারের প্রতিটি শট যেন হৃদস্পন্দন আরও দ্রুত করে দিচ্ছিল।
আজও স্পষ্ট মনে আছে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। যখন গনসালো মন্টিয়েল শেষ পেনাল্টিটি জালে জড়িয়ে দিলেন, তখন মনে হয়েছিল দীর্ঘ বছরের অপেক্ষা, অসংখ্য হতাশা আর না-পাওয়ার সব বেদনা এক মুহূর্তে মিলিয়ে গেছে। যেন একটি প্রজন্মের স্বপ্ন পূর্ণতা পেয়েছে।
খেলা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আনন্দের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ল পুরো গ্রামে। ঘর থেকে মানুষ বেরিয়ে এল রাস্তায়। চারদিকে শুধু উল্লাস, স্লোগান আর বিজয়ের উদ্‌যাপন। মধ্যরাতের নিস্তব্ধ গ্রাম হঠাৎ করেই রূপ নিল উৎসবের জনপদে।
একপর্যায়ে অচেনা একটি পিকআপে উঠে উন্মত্ত সমর্থকদের সঙ্গে যোগ দিলাম বিজয় মিছিলে। আকাশভরা জোছনার নিচে স্লোগানে স্লোগানে মুখর হয়ে উঠেছিল গ্রামের পথঘাট। চলন্ত মিছিলের সেই উচ্ছ্বাস, মানুষের মুখের নির্মল আনন্দ আর বিজয়ের আবেগ আজও স্মৃতিতে অমলিন হয়ে আছে।
সেই রাতটি আমার কাছে শুধু একটি বিশ্বকাপ জয়ের রাত নয়; বরং শৈশবের ভালোবাসা, দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর অগণিত স্বপ্ন পূরণের এক অবিস্মরণীয় রাত।

প্রেক্ষিতঃ ২০২৬ বিশ্বকাপ: কেমন আমার দল

সময় গড়িয়ে এখন ২০২৬, আসছে বিশ্বকাপ- উন্মাদনার ভাসছে পুরো পৃথিবী। আর্জেন্টিনা এখন টপ চার্টে থাকা দল হিসেবে যোগ দিতে যাচ্ছে বিশ্বকাপ মহারণে।  আমার মত একজন তৃতীয় বিশ্বের সমর্থকও ভাবছে- আর্জেন্টিনা কি আবারও বিশ্বমঞ্চ শাসন করতে পারবে?
একজন সমর্থক হিসেবে আবেগ আমাকে আশাবাদী করলেও পর্যবেক্ষক হিসেবে বাস্তবতা আমাকে সতর্ক করে। 

মেসিকে ঘিরে উচ্ছ্বাস থাকলেও বর্তমান আর্জেন্টিনা দলের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের সমষ্টিগত চরিত্র।  এই দল আর কোনো একক নক্ষত্রের আলোয় আলোকিত নয়; বরং বহু তারকার সম্মিলিত দীপ্তিতে উজ্জ্বল। গোলবারে এমিলিয়ানো মার্টিনেজ, রক্ষণে রোমেরো ও লিসান্দ্রো মার্টিনেজ, মাঝমাঠে ম্যাক অ্যালিস্টার, এনজো ফার্নান্দেজ ও ডি পল, আক্রমণে লাউতারো ও আলভারেজ- সব মিলিয়ে এটি একটি সুসংহত দলীয় কাঠামোই বলা চলে।


নির্মোহ বিশ্লেষণ 

তবে বিশ্বকাপের পথ কখনো মসৃণ নয়। ইউরোপের পরাশক্তিগুলো আরও শক্তিশালী হয়েছে। নতুন প্রজন্মের দলগুলো নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করছে। তাছাড়া বয়সের কারণে মেসির ভূমিকা আগের মতো থাকবে কি না সেটাও আনপ্রেডিক্টেবল। ফলে আর্জেন্টিনাকে এবার অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের সূক্ষ্ম ভারসাম্যের ওপর নির্ভর করতে হবে।

তবুও আমি বিশ্বাস করি, আর্জেন্টিনা সেমিফাইনাল তথা ফাইনালে পৌঁছানোর সামর্থ্য রাখে। কারণ বড় টুর্নামেন্টে প্রতিভার পাশাপাশি প্রয়োজন হয় মানসিক দৃঢ়তার। আর সেই জায়গায় বর্তমান আর্জেন্টিনা বিশ্বের অন্যতম সেরা দল। তবে ট্রফি জিতবে কি না, সেটিই আমার কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন নয়। কারণ সমর্থন কেবল সাফল্যের হিসাব,-নিকাশেই বিবেচিত হয় না। এটি এক ধরনের আত্মিক সম্পর্ক। আর্জেন্টিনা আমার কাছে একটি ফুটবল দলের চেয়েও অনেক বেশি কিছু। আমি আর্জেন্টিনার সমর্থক; এবং এই পরিচয় কোনো ট্রফির চেয়েও বড়।

২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য ঘোষিত আর্জেন্টিনা দলটি নিঃসন্দেহে শক্তিশালী ও ভারসাম্যপূর্ণ। অভিজ্ঞতা এবং তারুণ্যের সমন্বয়ে গড়া এই স্কোয়াডে রয়েছে বিশ্বকাপজয়ী বেশ কয়েকজন তারকা ফুটবলার, পাশাপাশি উঠে আসা প্রতিভাবান তরুণরাও। গোলপোস্টে এমিলিয়ানো মার্তিনেসের নির্ভরতা, মাঝমাঠে এনসো ফার্নান্দেস, রদ্রিগো দে পল ও আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের সৃজনশীলতা এবং আক্রমণভাগে লিওনেল মেসি, হুলিয়ান আলভারেজ ও লাউতারো মার্তিনেসের উপস্থিতি দলটিকে শিরোপার অন্যতম দাবিদারে পরিণত করেছে।

তবে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। দলের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় বয়সের ভারে প্রবীণ হয়ে উঠছেন, বিশেষ করে মেসি ও ওতামেন্দি। এছাড়া দীর্ঘ টুর্নামেন্টে ইনজুরি ও ফিটনেস বড় একটি বিষয় হয়ে উঠতে পারে। তারপরও স্কালোনির অধীনে দীর্ঘদিন ধরে একসঙ্গে খেলার অভিজ্ঞতা এবং দলের অসাধারণ বোঝাপড়া আর্জেন্টিনাকে অন্য অনেক প্রতিপক্ষের তুলনায় এগিয়ে রাখে।

সামগ্রিক মূল্যায়নে বলা যায়, এই স্কোয়াডে বিশ্বকাপ জয়ের সামর্থ্য রয়েছে। সব খেলোয়াড় সুস্থ থাকলে এবং মূল তারকারা নিজেদের সেরা ছন্দে খেলতে পারলে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখতেই পারে আলবিসেলেস্তেরা।


একনজরে স্কোয়াড 

১১ জুন থেকে ১৯ জুলাই-  যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে মাঠে গড়াচ্ছে ২৩তম ফুটবল বিশ্বকাপ। এবার আর্জেন্টিনা নামবে শিরোপা ধরে রাখার অভিযানে। ১৭ জুন আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে মহারণের সূচনা করবে আলবিসেলেস্তেরা।  এরপর  ২২ ও ২৮ জুন গ্রুপ পর্বের শেষ দুই ম্যাচে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ অস্ট্রিয়া ও জর্ডান। বিশ্বকাপ অভিযান শুরুর আগে হন্ডুরাস ও আইসল্যান্ডের বিপক্ষে দুটি প্রীতি ম্যাচ খেলবে আকাশী-নীলরা।

আর্জেন্টিনার ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের দলে গোলরক্ষক হিসেবে থাকছেন এমিলিয়ানো মার্তিনেস, হেরোনিমো রুইয়ি, হুয়ান মুসসো। 

গনসালো মন্তিয়েল, নাউয়েল মলিনা, লিসান্দ্রো মার্তিনেস, নিকোলাস ওতামেন্দি, লিওনার্দো বালের্দি, ক্রিস্তিয়ান রোমেরো, ফাকুন্দো মেদিনা, নিকোলাস তালিয়াফিকো থাকবেন রক্ষণভাগে।

মাঝমাঠে খেলবেন লেয়ান্দ্রো পারেদেস, রদ্রিগো দে পল, এসেকিয়েল পালাসিওস, এনসো ফার্নান্দেস, আলেক্সিস ম্যাক আলিস্তার, জিওভানি লো সেলসো, ভালেনতিন বার্কো৷ 

ফরোয়ার্ড হিসেবে লিওনেল মেসি, নিকো পাস, তিয়াগো আলমাদা, নিকোলাস গনসালেস, জিউলিয়ানো সিমিওনে, লাউতারো মার্তিনেস, হোসে মানুয়েল লোপেস, হুলিয়ান আলভারেস। 


 আমার  সম্ভাব্য সেরা একাদশ (৪-৩-৩)

গোলরক্ষক: এমিলিয়ানো মার্তিনেস
ডিফেন্ডার: নাউয়েল মলিনা, ক্রিস্তিয়ান রোমেরো, লিসান্দ্রো মার্তিনেস, নিকোলাস তালিয়াফিকো
মিডফিল্ডার: রদ্রিগো দে পল, এনসো ফার্নান্দেস, আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার
ফরোয়ার্ড: লিওনেল মেসি, হুলিয়ান আলভারেজ, লাউতারো মার্তিনেস।

শেষকথা

বিশ্বকাপ আসবে, বিশ্বকাপ যাবে। প্রজন্ম বদলাবে, বদলে যাবে তারকারা। কেউ জয়ের উল্লাসে ভাসবে, কেউ বেদনার ভার নিয়ে ফিরবে। কিন্তু স্মৃতিগুলো থেকে যাবে, ঠিক যেমন থেকে যায় শৈশবের কোনো বিকেল, কিংবা জীবনের কোনো অবিস্মরণীয় রাত।

কোটি কোটি সমর্থকের ভিন্ন ভিন্ন পছন্দ, তর্ক-বিতর্ক, আনন্দ-হতাশা; এসবই ফুটবলকে আরও জীবন্ত করে তোলে। প্রতিটি বিশ্বকাপ নতুন গল্পের জন্ম দেয়, আবার কিছু গল্পকে কিংবদন্তিতে পরিণত করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই টুকরো টুকরো স্মৃতিগুলোই একদিন ইতিহাসের সোনালি পাতায় স্থান করে নেয়।

আমার কাছে আর্জেন্টিনা শুধু একটি দল নয়; এটি শৈশব, আবেগ, অপেক্ষা, আনন্দ ও না-পাওয়ার বেদনা মিশ্রিত এক দীর্ঘ যাত্রার নাম। তবে এই ভালোবাসা কখনো অন্য কোনো দলের প্রতি বিদ্বেষ শেখায় না। কারণ ফুটবলের প্রকৃত সৌন্দর্য প্রতিদ্বন্দ্বিতায়, শত্রুতায় নয়।

তাই নিজের প্রিয় দলের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন রেখেও সকল প্রতিদ্বন্দ্বী দলের জন্য রইল আন্তরিক শুভকামনা। বিশ্বকাপের মঞ্চে সেরারাই জিতুক, আর আমরা উপভোগ করি ফুটবলের অনন্য শিল্প, সৌন্দর্য ও মানবিক আবেগকে।

দিনশেষে ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়; এটি মানুষকে একত্রিত করার, আনন্দ ভাগাভাগি করার এবং স্মৃতি তৈরির এক অনন্য উপলক্ষ। খেলা হোক নির্মল বিনোদনের আধার, আর ফুটবল ছড়িয়ে দিক সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও ভালোবাসার বার্তা।