সাদা পেলে খ্যাত জিকো (ছবি: সংগৃহীত)
১৯৮৬ সাল।
গ্রামের মাধ্যমিক স্কুলে তখন সবে পা রেখেছি। জীবন ছিল অনেক সরল, অনেক ধীরগতির। এখনকার মতো সন্তানদের পড়াশোনা নিয়ে মা-বাবার এত উদ্বেগ ছিল না। দিনের অধিকাংশ সময় কাটত ধুলোবালিতে মাখামাখি হয়ে, মাঠে-ঘাটে ছুটে বেড়িয়ে। পড়াশোনার জন্য নির্দিষ্ট ছিল সকাল-বিকেলের কিছু সময়। সময়টা হয়তো কম ছিল, কিন্তু সেই সময়টুকুতে মনোযোগে ফাঁকি দেওয়ার সুযোগও ছিল না। মা-বাবার তীক্ষ্ণ নজর সবসময়ই অনুসরণ করত।
বাকি পৃথিবী ছিল আমাদের।
খেলার মাঠ ছিল, গাছের ছায়া ছিল, ছিল বিশাল এক যৌথ পরিবার। আমাদের সৈয়দ পরিবার তখনও গ্রামের অন্যতম পরিচিত ও সম্মানিত পরিবার। এক পূর্বপুরুষের বংশধারা ছড়িয়ে শত শত মানুষের বসতি। বড় উঠানকে ঘিরে সারি সারি ঘর। চাচা, জ্যাঠা, ভাই, ভাতিজারা আলাদা ঘরে থাকলেও জীবন ছিল এক সুতোয় বাঁধা।
সেই বছর ঈদে বাড়িতে যেন উৎসবের মাত্রা একটু বেশি ছিল।
ঢাকায় ব্যাংকের চাকরি করা তসলিম ভাই পরিবার নিয়ে গ্রামে এলেন। সঙ্গে নিয়ে এলেন এক বিস্ময়কর যন্ত্র-একটি টেলিভিশন।
আজকের প্রজন্মের কাছে বিষয়টি হয়তো অবিশ্বাস্য মনে হবে, কিন্তু তখন পুরো গ্রামে সম্ভবত মাত্র দুটি বাড়িতে টেলিভিশন ছিল। তাই টেলিভিশন মানেই ছিল বিস্ময়, আকর্ষণ আর এক অদ্ভুত জাদু।
আমার টেলিভিশনের সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয়েছিল আশির দশকের শুরুতে, ঢাকায় মামার বাসায় গিয়ে। এরপর ১৯৮৪ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর পর তাঁর শেষকৃত্যের সরাসরি সম্প্রচার দেখতে গ্রাম থেকে মানুষ ছুটে গিয়েছিল পাটোয়ারী বাড়িতে। বড়দের সঙ্গে আমিও গিয়েছিলাম। সেদিন চন্দন কাঠের আগুনে দাহ হওয়া এক রাষ্ট্রনেতার শেষযাত্রা দেখেছিলাম ছোট্ট বিস্মিত চোখে।
তারপর আবার দীর্ঘ বিরতি।
কিন্তু ১৯৮৬ সালের সেই ঈদ যেন সবকিছু বদলে দিল।
কারণ এবার টেলিভিশন এসেছে আমাদেরই উঠানে।
তসলিম ভাইয়ের ছেলে কাউসার কাকার কাছ থেকেই প্রথম শুনলাম বিশ্বকাপ ফুটবলের কথা। জানতে পারলাম, ঈদের পরপরই শুরু হবে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ফুটবল উৎসব। তখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্যবইয়ে পড়া কালো মানিক খ্যাত পেলের জীবনী থেকেই শুধু ব্রাজিলকে চিনতাম। ফুটবল মানেই ছিল পেলে, আর পেলে মানেই ব্রাজিল।
কাউসার কাকা নতুন আরেকটি নাম শোনালেন-জিকো।
বললেন, পেলের পর ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় তারকাদের একজন।
সন্ধ্যা নামলে সবাই টেলিভিশনের সামনে ভিড় করত। সাপ্তাহিক নাটক, বাংলা সিনেমা আর মাঝেমধ্যে বিজ্ঞাপনের ফাঁকে ভেসে উঠত একটি নাম-‘মেক্সিকো এইটি সিক্স’।
নামটা কেমন যেন রহস্যময় লাগত।
বিশ্বকাপের খেলা শুরু হতো গভীর রাতে। বড়রা জেগে থাকত, অপেক্ষা করত। আমিও সেই অপেক্ষার অংশ হতে চাইতাম। কিন্তু শিশুর চোখের সঙ্গে ঘুমের লড়াইয়ে বেশিরভাগ সময়ই জিতে যেত ঘুম। মধ্যরাতের আগেই কখন যে বিছানায় ঢলে পড়তাম, টেরই পেতাম না।
সকালে ঘুম ভাঙলে প্রথম প্রশ্ন হতো-কে জিতেছে?
আর ভেতরে ভেতরে জন্ম নিত খেলা দেখতে না পারার আক্ষেপ।
তবু এক রাতে ঘুমের সঙ্গে আপস করিনি।
সেই ম্যাচে খেলছিল ব্রাজিল। প্রতিপক্ষের নাম আজ আর মনে নেই। কিন্তু একটি দৃশ্য এখনও স্মৃতির অ্যালবামে অমলিন।
জিকো।
বল পায়ে তার শিল্পীর মতো ছন্দ, মাঠজুড়ে তার উপস্থিতি, পাস আর আক্রমণের সৌন্দর্য; সবকিছু মুগ্ধ করেছিল গ্রামের এক কিশোরকে।
হয়তো সেদিনই জন্ম নিয়েছিল আমার ব্রাজিলপ্রেম।
তারপর কেটে গেছে চার দশক।
বিশ্বকাপ এসেছে, বিশ্বকাপ গেছে। পেলে বিদায় নিয়েছেন, জিকো ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নিয়েছেন। নতুন প্রজন্ম দেখেছে রোনালদো, রোনালদিনহো, কাকা, নেইমারকে।
কিন্তু আমার কাছে ব্রাজিলের গল্প শুরু হয় সেই মেক্সিকো ’৮৬ থেকেই।
যদিও সেই বিশ্বকাপের ফাইনালটা ঠিকমতো দেখা হয়নি।
১২ ভোল্টের ব্যাটারির চার্জ ফুরিয়ে আসছিল। টেলিভিশনের পর্দা ক্রমেই ছোট হয়ে যাচ্ছিল। তার ওপর ঝোড়ো বাতাসে কাত হয়ে গিয়েছিল অ্যালুমিনিয়ামের অ্যান্টেনা লাগানো বিশাল বাঁশের খুঁটি। ছবিগুলো ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল বারবার।
ফাইনালের অনেক কিছুই তাই হারিয়ে গেছে স্মৃতির বাইরে।
কিন্তু যা হারায়নি, তা হলো সেই অনুভূতি।
একটি গ্রামের উঠানে বসে, ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসা সাদা-কালো পর্দার দিকে তাকিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ফুটবল উৎসবকে আবিষ্কার করার অনুভূতি।
মেক্সিকো ’৮৬ আমার কাছে শুধু একটি বিশ্বকাপ নয়।
এটি এক টুকরো শৈশব, এক যৌথ পরিবারের উষ্ণতা, এক গ্রামের সরল জীবন আর জিকো নামের এক জাদুকরের হাত ধরে ব্রাজিলকে ভালোবেসে ফেলার গল্প।