বিশ্বকাপে মুসলিম বিশ্বের প্রতিনিধিত্ব: স্বপ্ন, সংগ্রাম ও গৌরবের গল্প
প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬ ২১:১৫
ছবি: সংগৃহীত
ফুটবল বিশ্বকাপ শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়, এটি বিশ্ব সংস্কৃতি, ভ্রাতৃত্ব, জাতীয় গর্ব এবং কোটি মানুষের আবেগের মিলনমেলা। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপেও মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর অংশগ্রহণ বিশ্ব ফুটবলে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণে মাঠে নেমেছে বিশ্বের সেরা দলগুলোর বিপক্ষে।
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ শুধু অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যার দিক থেকে নয়, বৈশ্বিক ফুটবলের শক্তির ভারসাম্যের ক্ষেত্রেও একটি নতুন যুগের সূচনা করেছে। ৪৮ দলের এই সম্প্রসারিত আসরে প্রায় ১৩টি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে ফুটবল আর ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিয়ার একচেটিয়া আধিপত্যের খেলা নয়; বরং এটি এখন সত্যিকারের বৈশ্বিক খেলায় পরিণত হয়েছে।
এবারের বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে কাতার, মরক্কো, তিউনিসিয়া, মিসর, সৌদি আরব, ইরান, ইরাক, আলজেরিয়া, জর্ডান, উজবেকিস্তান এবং তুরস্ক। এছাড়া সেনেগাল ও ঘানার মতো দেশগুলোতেও মুসলিম জনগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে।
তবে মুসলিম দেশগুলোর এই অগ্রযাত্রাকে কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের আলোকে দেখলে ভুল হবে। এর পেছনে রয়েছে আধুনিক প্রশিক্ষণব্যবস্থা, ইউরোপীয় লিগে খেলোয়াড়দের অভিজ্ঞতা, একাডেমি সংস্কৃতি এবং ফুটবলকে জাতীয় উন্নয়নের অংশ হিসেবে দেখার মানসিকতা। আজকের মরক্কো, সেনেগাল বা ইরানের সাফল্য আসলে পরিকল্পিত ক্রীড়া উন্নয়নের সাফল্য।
২০২২ বিশ্বকাপে ইতিহাস গড়ে সেমিফাইনালে পৌঁছেছিল মরক্কো। প্রথম আফ্রিকান ও প্রথম আরব দেশ হিসেবে শেষ চারে ওঠার সেই কীর্তি মুসলিম বিশ্বে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। ফলে ২০২৬ বিশ্বকাপেও দলটিকে ঘিরে রয়েছে বিশেষ আগ্রহ ও প্রত্যাশা।
মধ্যপ্রাচ্যের ফুটবলে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করা দেশগুলোর মধ্যে সৌদি আরব অন্যতম। ২০২২ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে তারা বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল। অন্যদিকে কাতার, স্বাগতিক হিসেবে ২০২২ বিশ্বকাপ আয়োজনের মাধ্যমে বিশ্ব ফুটবলে নিজেদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করেছে।
এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ইরান দীর্ঘদিন ধরেই এশিয়ার অন্যতম সফল দল। যুদ্ধে জর্জরিত ইরানের জন্য এবারের বিশ্বকাপ মাইলফলক হয়ে থাকবে। নিরাপত্তা প্রশ্নে বিশ্বকাপের মূলেপর্বে অংশগ্রহণ নিয়ে জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ইরান মাঠে নামবে বলে সমর্থকরা আশা করছেন। এ পর্যন্ত ৭ বার বিশ্বকাপে জায়গা পেলেও আগের ৬ বারে তারা কখনো নকআউট পর্বে উঠতে পারেনি। তবে আসরগুলোতে তাদের বেশ কিছু স্মরণীয় জয় ও অবিস্মরণীয় পারফরম্যান্স রয়েছে। পাশাপাশি ইরাক, জর্ডান ও উজবেকিস্তানও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধারাবাহিক উন্নতি করে বিশ্বকাপের মঞ্চে জায়গা করে নিয়েছে। বিশেষ করে জর্ডান ও উজবেকিস্তানের অংশগ্রহণ তাদের ফুটবল ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
অন্যদিকে মিসর, আলজেরিয়া ও তিউনিসিয়া আফ্রিকান ফুটবলের পরিচিত শক্তি। ইউরোপীয় লিগে খেলা তারকাদের সমন্বয়ে দলগুলো বিশ্বকাপে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ফুটবল উপহার দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নেমেছে।
বিশ্বকাপে মুসলিম দেশগুলোর অংশগ্রহণ শুধু ক্রীড়ার সাফল্য নয়, বরং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও আন্তর্জাতিক সম্প্রীতিরও প্রতীক। বিভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও অঞ্চলের কোটি কোটি মুসলিম সমর্থক নিজ নিজ দলের সাফল্যে উচ্ছ্বসিত হলেও বিশ্বকাপের মঞ্চে তারা এক বৃহত্তর বৈশ্বিক ফুটবল পরিবারের অংশ হয়ে ওঠে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ব ফুটবলে মুসলিম দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান সাফল্য প্রমাণ করে যে ফুটবলের শক্তির ভারসাম্য ধীরে ধীরে আরও বৈচিত্র্যময় হয়ে উঠছে। পাশাপাশি এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোও এখন বিশ্বমঞ্চে নিজেদের দৃঢ় উপস্থিতি জানান দিচ্ছে।
ফুটবল যখন বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা, তখন মুসলিম দেশগুলোর এই উত্থান শুধু ক্রীড়ার সাফল্য নয়; এটি আত্মবিশ্বাস, বিনিয়োগ, পরিকল্পনা এবং জাতীয় অগ্রগতিরও প্রতীক। ২০২৬ বিশ্বকাপ সেই পরিবর্তনেরই এক উজ্জ্বল প্রতিফলন।