হালান্ডের মহাকাব্যে ব্রাজিলের হেক্সা স্বপ্নের সমাধি, নেইমারের শেষ আলোও রক্ষা করতে পারল না সেলেসাওকে
প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬ ০৪:২৩
ছবি: সংগৃহীত
পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের চোখে ছিল ষষ্ঠ তারকার স্বপ্ন। কিন্তু ফুটবল কখনো শুধু নামের, ইতিহাসের কিংবা জার্সির রঙের খেলা নয়। কখনো কখনো একটি রাত বদলে দেয় বহু বছরের গল্প। নিউজার্সির আলোঝলমলে স্টেডিয়ামে তেমনই এক রাত লিখল নরওয়ে। আর্লিং হালান্ডের দুর্দান্ত জোড়া গোলে ব্রাজিলকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে ফুটবল ইতিহাসে নিজেদের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায় রচনা করল স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশটি।
ম্যাচের শুরু থেকেই বোঝা যাচ্ছিল, নরওয়ে শুধু অংশ নিতে মাঠে নামেনি; তারা ইতিহাস লিখতে এসেছে। চতুর্থ মিনিটেই প্যাট্রিক বার্গ বল জালে পাঠিয়ে ব্রাজিল শিবিরে শীতল স্রোত বইয়ে দিয়েছিলেন। যদিও অফসাইডের কারণে সেই গোল বাতিল হয়। কিন্তু সেটিই ছিল আগাম বার্তা; এই রাতে ব্রাজিলকে সহজে নিঃশ্বাস নিতে দেওয়া হবে না।
প্রথমার্ধেই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার সুযোগ পেয়েছিল ব্রাজিল। ১১ মিনিটে বক্সের ভেতরে মাতেউস কুনিয়াকে ফাউল করলে ভিএআরের সহায়তায় পেনাল্টির বাঁশি বাজান রেফারি। পুরো স্টেডিয়াম যখন গোলের অপেক্ষায়, তখন স্পট কিক নিতে আসেন ব্রুনো গুইমারেস। কিন্তু নরওয়ের গোলরক্ষক ওরইয়ান নাইল্যান্ড যেন দুই হাত মেলে দাঁড়িয়েছিলেন এক অদৃশ্য প্রাচীর হয়ে। অসাধারণ সেভে ফিরিয়ে দেন ব্রুনোর শট। সেই মুহূর্তে শুধু একটি গোলই নয়, যেন ব্রাজিলের আত্মবিশ্বাসেরও একটি অংশ আটকে যায় তার গ্লাভসে।
এরপর একের পর এক আক্রমণে নরওয়ের রক্ষণভাগকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে সেলেসাওরা। ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের গতি, কুনিয়ার চেষ্টা, মার্তিনেল্লির দূরপাল্লার শট; সবই বারবার থেমে যায় নাইল্যান্ডের দৃঢ়তায়। দ্বিতীয়ার্ধে গোলের খোঁজে এনদ্রিককে নামান ব্রাজিল কোচ। মাঠে নেমেই ভিনিসিয়ুসের নিখুঁত পাসে গোলরক্ষককে একা পেয়েও অবিশ্বাস্যভাবে লক্ষ্যভ্রষ্ট হন এই তরুণ। সেই মিস যেন ভবিষ্যৎ ট্র্যাজেডির পূর্বাভাস হয়ে দাঁড়ায়।
এরপর আসে ম্যাচের সবচেয়ে আলোচিত সিদ্ধান্ত। ব্রাজিল যখন গোলের জন্য মরিয়া, তখনও নেইমার ডাগআউটে। সময় গড়াতে থাকে, আর সমর্থকদের প্রশ্নও বাড়তে থাকে; বিশ্বমানের এই তারকাকে এত দেরিতে কেন? অবশেষে ৬৫ মিনিটের দিকে নেইমার মাঠে নামলেও ততক্ষণে ম্যাচের ছন্দ অন্যদিকে মোড় নিতে শুরু করেছে।
যেখানে ব্রাজিল সুযোগ নষ্ট করেছে, সেখানে আর্লিং হালান্ড সুযোগকে রূপ দিয়েছেন শিল্পে। ৭৯ মিনিটে দুর্দান্ত এক হেডে আলিসনকে পরাস্ত করে নরওয়েকে এগিয়ে দেন তিনি। ব্রাজিল ঘুরে দাঁড়ানোর আগেই যোগ করা সময়ে আরেকটি আক্রমণে নিজের দ্বিতীয় গোল করে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন ম্যানচেস্টার সিটির এই স্ট্রাইকার। বিশ্বকাপে এটি ছিল হালান্ডের সপ্তম গোল, যা তাকে সর্বোচ্চ গোলদাতাদের কাতারে তুলে দেয়।
শেষ মুহূর্তে কাসেমিরোর ওপর ফাউল হলে পেনাল্টি পায় ব্রাজিল। এবার স্পট কিকে দাঁড়ান নেইমার। ঠান্ডা মাথায় গোল করে ব্যবধান কমান তিনি। কিন্তু সেটি ছিল নিভে যাওয়ার আগে প্রদীপের শেষ আলো। কয়েক সেকেন্ড পরই শেষ বাঁশি বাজে, আর ব্রাজিলের হেক্সা স্বপ্ন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়।
এই ম্যাচে পার্থক্য গড়ে দিয়েছে শুধু স্কোরলাইন নয়, দুটি ভিন্ন বাস্তবতা। একদিকে ছিল ব্রাজিলের নান্দনিক ফুটবল, অসংখ্য সুযোগ সৃষ্টি, কিন্তু শেষ স্পর্শে ব্যর্থতা। অন্যদিকে নরওয়ের শৃঙ্খলা, শারীরিক শক্তি, আকাশে আধিপত্য এবং গোলরক্ষক নাইল্যান্ডের অবিশ্বাস্য দৃঢ়তা। কর্নার, ক্রস কিংবা উঁচু বল; প্রতিটি মুহূর্তে নরওয়ের দীর্ঘদেহী খেলোয়াড়রা যেন ব্রাজিলের সামনে অদৃশ্য এক দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
ফুটবল কখনো কখনো নিষ্ঠুর। পুরো ম্যাচে আধিপত্য করেও জয় মেলে না, আবার ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করলেই ইতিহাস ধরা দেয়। সেই ইতিহাসের পাতায় এবার সোনালি অক্ষরে লেখা থাকবে নরওয়ের নাম। আর ব্রাজিলের জন্য এই রাত হয়ে থাকবে আফসোসের; যেখানে পেনাল্টি মিস, এনদ্রিকের অবিশ্বাস্য সুযোগ নষ্ট, নেইমারকে দেরিতে নামানো এবং নরওয়ের গোলরক্ষকের অতিমানবীয় পারফরম্যান্স মিলেই শেষ করে দিল হেক্সা জয়ের স্বপ্ন।
