রায়নগর ট্রিপল মার্ডার: বাসা ভাড়ার জন্য চুরি করতে বাসায় প্রবেশ, ধরা পড়ে একাই তিনজনকে খুন!
প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ ২৩:১০
ছবি: সংগৃহীত
সিলেট নগরের রায়নগর এলাকার মিতালী ১১১ নম্বর বাসায় তিনজনকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার রংমিস্ত্রি বাবুল মিয়া আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন।
চার দিনের রিমান্ড শেষে বুধবার (২০ আগস্ট) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তাকে অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়। পরে বিচারক ফারহানা সুলতানার আদালতে সন্ধ্যা ৬টা থেকে সাড়ে ৮টা পর্যন্ত সে জবানবন্দি প্রদান করেন।
তবে আদালতে দেওয়া বাবুলের জবানবন্দীর কপি গণমাধ্যম পায়নি। কোর্ট ইন্সপেক্টর মাহবুবুর রহমান রাতে গণমাধ্যমকে বলেছেন, বাবুল নিজে খুনের ঘটনার দোষ স্বীকার করে জবানবন্দী দিয়েছেন। তদন্তের সাপেক্ষে এর বেশি কিছু বলতে রাজি হননি তিনি।
এদিকে রিমান্ডের সময় পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল জানিয়েছিল, বাসা ভাড়ার জন্য সে অনেক চাপের মধ্যে ছিলো। এই টাকা জোগাড় করতেই সে এই বাসায় চুরি করতে প্রবেশ করেছিল। আর চুরি করতে গিয়েই ধরা পড়ে একাই ৩টি খুন করে বাবুল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা এই কথা জানান।
পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, বাসা ভাড়ার টাকা জোগাড় করতে চুরি করার উদ্দেশ্যেই ওই বাসায় প্রবেশ করেছিল বাবুল মিয়া। কিন্তু বাসায় ঢোকার পর গৃহকর্মী তাহমিনা বেগমের কাছে ধরা পড়ে যান তিনি। এরপর নিজের অপরাধ আড়াল করতে একে একে গৃহকর্মী তাহমিনা বেগম, গৃহকর্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও গৃহকর্তা প্রবীণ ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তারকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেন । আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতেও বাবুল একই রকম বক্তব্য দিয়েছেন বলে পুলিশের এই সূত্রটি দাবি করেছে।
এদিকে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ অনুযায়ী সকাল ৯টা ২৬ মিনিটের পর সে বাসায় প্রবেশ করে। বাসার মূল গেট দিয়ে প্রবেশের দৃশ্য সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়লেও বের হওয়ার দৃশ্য ক্যামেরায় পাওয়া যায়নি। কারণ তখন এলাকায় বিদ্যুৎ ছিল না। বিদ্যুৎ বিভাগের সূত্রেও এর সত্যতা মিলেছে।
তবে রায়নগর মিতালি ৮৩ নং বাসার সিসি ক্যামেরার ফুটেজ অনুযায়ী ২০ থেকে ২৫ মিনিটের মধ্যেই বাবুলকে টিভি গেইটের গলি দিয়ে দ্রুত বের হয়ে যেতে দেখা যায়। এলাকায় বিদ্যুৎ না থাকলেও ওই ক্যামেরাটি আইপিএসের সঙ্গে সংযুক্ত থাকায় সেই ক্যামেরায় পালিয়ে যাওয়ার দৃশ্যটি ধরা পড়ে। এসময় বাবুলকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে যেতে দেখা যায়। যাওয়ার সময় তার হাতে বারবার তাকানোর দৃশ্যটিও সিসি ক্যামেরায় দেখা যায়। খুনের দিন সন্ধ্যায় গ্রেপ্তারের সময় বাবুলের হাত ও আঙুলে আঘাতের চিহ্ন ও আঙুলে ব্যান্ডেজও ছিল। এই ছবি আগেই দেখা গেছে।
বাবুলের বক্তব্য অনুযায়ী, ঘরে ঢোকার পরপরই গৃহকর্মী তাহমিনার মুখোমুখি হন তিনি। তাঁকে দেখে তাহমিনা দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। এ সময় পেছন থেকে তাহমিনাকে ধরে ফেলেন বাবুল এবং হাতে থাকা ছুরি দিয়ে একের পর এক আঘাত করেন। তাহমিনা মেঝেতে পড়ে যাওয়ার পরও তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত করতে ছুরিকাঘাত চালিয়ে যান বাবুল।
তাহমিনার চিৎকার শুনে পাশের কক্ষ থেকে গৃহকর্ত্রী সুরাইয়া বেগম সেখানে ছুটে আসেন। তিনি বাবুলকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন এবং তাঁর পিঠে হাত দিয়ে আঘাত করতে থাকেন। এ সময় পেছনে না তাকিয়েই ছুরি চালান বাবুল। ছুরিটি সুরাইয়া বেগমের গলায় বিদ্ধ হয়। তিনি মেঝেতে পড়ে গেলে পরে আরও কয়েকবার ছুরিকাঘাত করে তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত করেন বাবুল।
এরপর একইভাবে গৃহকর্তা আব্দুস সাত্তারকেও ছুরিকাঘাত করে হত্যা করেন বলে বাবুল জানায়। আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতেও একই বক্তব্য দিয়েছেন বলেও পুলিশে এক কর্মকর্তা জানান।
পরপর তিনজনকে ছুরিকাঘাতের সময় বাবুলের নিজের হাত ও আঙুলেও আঘাত পায় বাবুল। তিনজনকে হত্যার পর তিনি বাথরুমে গিয় শরীর, পরনের জামাকাপড় এবং ছুরিতে লেগে থাকা রক্ত পরিষ্কার করেন। এরপর বাসার আলমারি ও ওয়ার্ডরোবে টাকা খুঁজতে থাকেন।
একপর্যায়ে তিনি মোট ১৫ হাজার টাকা পান। আরও কিছু নেওয়ার ইচ্ছা থাকলেও হঠাৎ দরজায় কারও নক করার শব্দ শুনতে পান। এতে আতঙ্কিত হয়ে দ্রুত বাসা থেকে বের হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। যে পথ দিয়ে বাসায় ঢুকেছিলেন, সেই একই পথে বেলকনি হয়ে সানশেড বেয়ে নিচে নেমে বাসা থেকে বের হয়ে যান বাবুল।
বাসা থেকে বের হওয়ার পর টিভি গেটের দিকের রাস্তা ধরে চলে যান বাবুল। বক্তব্য অনুযায়ী, যাওয়ার পথে কোনো এক স্থানে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরিটি ফেলে দেন তিনি।
পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, হত্যায় ব্যবহৃত ছুরিটি এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
তবে পালিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর চলাচলের দৃশ্য একটি সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়ে। বাসায় বিদ্যুৎ না থাকলেও ওই ক্যামেরাটি আইপিএসের সঙ্গে সংযুক্ত থাকায় সেটি সচল ছিল। তদন্তে ওই ফুটেজসহ বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করেই বাবুলকে শনাক্ত করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
বাবুল জানিয়েছেন, চুরি করা ১৫ হাজার টাকা তিনি বাসার মালিককে দেন। বাসা ভাড়ার টাকা পরিশোধের জন্যই মূলত অর্থের প্রয়োজন ছিল তাঁর। অর্থাৎ, চুরির উদ্দেশ্য ছিল বাসা ভাড়ার টাকা জোগাড় করা। কিন্তু চুরি করতে গিয়ে গৃহকর্মী তাহমিনার কাছে ধরা পড়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। নিজের অপরাধ গোপন রাখতে একে একে তিনজনকে হত্যা করেন তিনি; এমনটাই উঠে এসেছে তাঁর বক্তব্যে।
গ্রেপ্তারের সময় বাবুলের হাত ও আঙুলে আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। আঙুলে ব্যান্ডেজও ছিল। এ বিষয়ে রং করার কাজে ব্যবহৃত কাপড় দিয়েই নিজে আঙুলে ব্যান্ডেজ করেছিলেন বলে জানান। তাঁর দাবি, রং করার সময় গ্রীলের মরিচা পরিষ্কার করার কাজে ব্যবহৃত একটি ছুরি তাঁর কাছে ছিল। ওই ছুরি দিয়েই তিনজনকে হত্যা করেন তিনি। চুরি করতে যাওয়ার সময় ছুরিটি সঙ্গে নিয়েছিলেন বলেও জানান।
তিনজন হত্যার মাত্র পাঁচ ঘণ্টার মধ্যে বাবুল মিয়াকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সিসিটিভি ফুটেজসহ বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছিল। তবে গ্রেপ্তারের পর থেকেই বাবুল পুলিশকে বিভ্রান্ত করতে একাধিক ভিন্ন তথ্য দেন। প্রথমে তিনি দাবি করেছিলেন, গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে তাঁর প্রেমের সম্পর্ক ছিল। ঘটনার দিন সকালে বাসায় গিয়ে তাহমিনাকে শারীরিক সম্পর্কের প্রস্তাব দিলে তিনি বাধা দেন। এ নিয়ে একপর্যায়ে তাহমিনাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেন তিনি। পরে তাহমিনার চিৎকার শুনে সুরাইয়া বেগম ও আব্দুস সাত্তার এগিয়ে এলে তাঁদেরও হত্যা করেন বলে পুলিশকে জানিয়েছিলেন বাবুল।
পুলিশের পক্ষ থেকেও যাচাই-বাছাইয়ের আগেই ওই বক্তব্য গণমাধ্যমে তুলে ধরা হয়। এতে হত্যাকাণ্ডের মোটিভ নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দেয়। পরদিন বাবুলের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ হত্যায় ব্যবহৃত ছুরি উদ্ধারের দাবিও করেছিল। পরে ওই উদ্ধার নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
তাহমিনার বয়স, ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি, বাসার কাগজপত্র ও দলিলপত্র তছনছ অবস্থায় পাওয়া এবং আলমারি খোলা থাকার বিষয়গুলো সামনে আসার পর শুধু প্রেমের সম্পর্ককে হত্যাকাণ্ডের কারণ হিসেবে মেনে নিতে পারেননি অনেকে।
প্রশ্নের মুখে পরে পুলিশও প্রেমের মোটিভ থেকে সরে এসে বাবুলের সঙ্গে তাহমিনার চেনাজানা সম্পর্ক ছিল বলে জানায়।
এদিকে নিহত দম্পতির সন্তানরা যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য থেকে দেশে এসে তাঁদের বাবা-মায়ের মরদেহ দাফন করেন। পরে নিহত দম্পতির মেয়ে সেলিনা সুলতানা সিলেট কোতোয়ালি মডেল থানায় এজহার দায়ের করেন।
এজহারে তিনি সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের জেরে সিলেট বারের আইনজীবী সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে বিরোধের বিষয়টি উল্লেখ করেন। হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্য কোনো কারণ থাকতে পারে বলেও সন্দেহ প্রকাশ করেন তিনি। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত রহস্য উদঘাটন এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবি জানান সেলিনা সুলতানা।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তিনজনকে হত্যার পর তিনি বাসা থেকে টাকা নিয়ে পালিয়ে যান। পরে এলাকাতেই অবস্থান করছিলেন। তাঁর ধারণা ছিল, বাসায় কেউ জীবিত না থাকায় এবং তাঁকে কেউ না দেখায় হয়তো পুলিশ তাঁকে শনাক্ত করতে পারবে না। কিন্তু বাসা ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজের বিষয়ে তিনি জানতেন না।
সিসিটিভি ফুটেজ, ঘটনাস্থলের বিভিন্ন আলামত এবং অন্যান্য তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ দ্রুত তাঁকে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করে।
এখন বাবুলের দেওয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে আর কি কি বলেছে তার উপরেই নির্ভর করছে পুলিশের কাছে দেওয়া তথ্য সঠিক কিনা তা যাচাই করার। তাছাড়া খুনের আরও কোনো মোটিভ রয়েছে কিনা তাও এই জবানবন্দীর কপি পাওয়ার পরেই জানা যাবে।
