ছবি: সংগৃহীত
সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার সুনাই নদীতে আগামী ২৮ আগস্ট অনুষ্ঠিতব্য নৌকাবাইচ বন্ধের দাবি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা চলছে। কয়েকটি গণমাধ্যমে ‘তৌহিদী জনতা’ নামের একটি পক্ষ নৌকাবাইচ বন্ধের দাবি জানিয়েছে- এমন খবর প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়।
তবে নৌকাবাইচ বন্ধের দাবি তোলা একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, এর সঙ্গে ধর্মীয় কোনো বিরোধের বিষয় নেই। মূলত নদীভাঙন, কৃষিজমির ক্ষতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং অতীতে নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে অপ্রীতিকর ঘটনার আশঙ্কা থেকেই তারা আয়োজনটি বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু করেন মাসুম বিন নুর উদ্দিন নামে এক যুবক। গত ১৮ আগস্ট রাত ৭টা ২৯ মিনিটে তিনি নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি পোস্টার শেয়ার করেন। সেখানে ‘তৌহিদী জনতা লাউতা ইউনিয়ন’ নামটি ব্যবহার করা হয়। পরে রাত ৮টা ৯ মিনিটে পোস্টটি সম্পাদনা করে তিনি আরেকটি পোস্টার যুক্ত করেন। এতে ‘সুনাই নদীতে আগত নৌকাবাইচ বন্ধের প্রতিবাদে পরামর্শ সভা’ লেখা ছিল।
শনিবার (২২ আগস্ট) বিকেলে কালবেলাকে দেওয়া বক্তব্যে নুর উদ্দিন জানান, পোস্টারে ‘বন্ধের প্রতিবাদে’ কথাটি ভুলবশত লেখা হয়েছিল। তিনি ব্যক্তিগতভাবে নৌকাবাইচ বন্ধের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তবে এর সঙ্গে ধর্মীয় কোনো বিষয় নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
নুর উদ্দিন বলেন, নদীভাঙন ঠেকানো এবং কৃষকদের ধান রক্ষার বিষয়টি বিবেচনা করেই নৌকাবাইচ বন্ধের দাবি জানানো হয়েছে। গণমাধ্যম কর্মীদের সঙ্গে কথা বলার পর তিনি ওই পোস্টারটি ফেসবুক থেকে সরিয়ে নেন। তার দাবি, পরামর্শ সভার আয়োজকেরাই তাকে পোস্টার তৈরি করতে বলেছিলেন।
গত ২০ আগস্ট বারিগ্রাম বাজার মসজিদে এ বিষয়ে একটি পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার পর নুর উদ্দিন ‘মুক্ত বাতাস’ নামে একটি ফেসবুক পেজে ভিডিও প্রকাশ করেন। পেজটি তিনি নিজেই পরিচালনা করেন বলে জানা গেছে।
ভিডিওতে স্থানীয় আলেম ও মুরব্বিদের বক্তব্যে নদীভাঙন ও কৃষকদের ধান রক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। কয়েকজন ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও বক্তব্য দিলেও নৌকাবাইচকে সরাসরি ধর্মবিরোধী বলা হয়নি। তবে নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে জুয়ার আসর বসার অভিযোগ তুলে সেটিকে হারাম হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
ভিডিওতে এক আলেম বলেন, এলাকার পরিবেশ সুন্দর রাখা, বিশৃঙ্খলা থেকে রক্ষা এবং নদীভাঙন ঠেকানোর জন্য নৌকাবাইচ বন্ধ করা প্রয়োজন।
আরেকজন স্থানীয় মুরব্বি অভিযোগ করেন, অতীতে নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি নদীর দুই পাড়ে থাকা ধানের জমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কার কথাও তিনি তুলে ধরেন।
প্রবীণ আলেম মাওলানা নুরুর রহমান মাসুক বলেন, এটি কোনো ধর্মীয় বিষয় নয়; বরং সামাজিক ও জনস্বার্থের বিষয়। ‘তৌহিদী জনতা’ কিংবা নাগরিক সমাজের নামে কারা ব্যানার করেছে, সে বিষয়ে তারা নিশ্চিত নন। তবে এলাকার সচেতন নাগরিকদের মূল দাবি হলো- এ অঞ্চলে আর নৌকাবাইচ আয়োজন না করা।
তিনি বলেন, অতীতে নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে দুই নৌকার সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে অনেকে আহত হয়েছেন। নৌকাবাইচের পাশের এলাকায় গানের আসরকে কেন্দ্র করেও গুরুতর অপরাধের ঘটনা ঘটেছে বলে তিনি দাবি করেন। ফলে বড় ধরনের আয়োজনকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে, নৌকাবাইচ বন্ধের দাবির বিপরীতে আয়োজনটির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন স্থানীয়দের আরেকটি পক্ষ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ব্যক্তি বলেন, নৌকাবাইচ আয়োজনের কারণে নদীর ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা নেই। জুয়ার আসর বসলে তা বন্ধ করার দায়িত্ব প্রশাসনের।
তাদের ভাষ্য, নৌকাবাইচ বিয়ানীবাজারের একটি ঐতিহ্যবাহী আয়োজন। কোনো অনিয়ম বা অপরাধের আশঙ্কা থাকলে তা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা না করে পুরো আয়োজন বন্ধ করে দেওয়া উচিত নয়। তাদের দাবি, ঐতিহ্যবাহী এই আয়োজন বন্ধের চেষ্টা মূলত একটি ষড়যন্ত্র।
