প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে জুড়ি থেকে সাফারি পার্কে ফিরছে সম্রাট ও নিহারকলি
প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬ ১৯:৪৮
ছবি: সংগৃহীত
মৌলভীবাজারের জুড়ীতে গাছ টানার কাজে ব্যবহারের সময় মাথা ও শুঁড়ে একাধিক ক্ষতসহ উদ্ধার করা হাতি ‘সম্রাট’কে আবারও গাজীপুর সাফারি পার্কে নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে কমলগঞ্জ থেকে উদ্ধার করা হাতি ‘নিহারকলি’কেও সাফারি পার্কে পাঠানো হবে।
বন বিভাগের অধীনে থাকা হাতি দুটি সম্প্রতি তাদের লালনপালনকারীদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তবে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর সোমবার আবারও হাতি দুটি বন বিভাগের হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার বাসিন্দা মনির মিয়া হাতি সম্রাট এবং কমলগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা আবদুল মজিদ নিহারকলিকে লালনপালন করতেন। সোমবার তাঁদের কাছ থেকে হাতি দুটি ফেরত নেয় বন বিভাগ।
সোমবার দুপুরে জুড়ীর লাঠিটিলা সংরক্ষিত বনের কাছে সম্রাটকে পাওয়া যায়। বন বিভাগের জুড়ী রেঞ্জ কর্মকর্তা সাদ উদ্দিন আহমেদ জানান, সিলেটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তার নির্দেশনায় হাতিটিকে উদ্ধার করা হয়। সেখানে সম্রাটকে দিয়ে গাছ টানার কাজ করানো হচ্ছিল। তার মাথা ও শুঁড়ে একাধিক আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে।
সাত থেকে আট কিলোমিটার পথ হেঁটে আসায় সম্রাট ক্লান্ত ও তৃষ্ণার্ত ছিল। তাকে জুড়ী রেঞ্জ কার্যালয়ে রাখা হয়। সেখানে নলকূপের পানি পান করানো হয় এবং কলাগাছ কেটে খেতে দেওয়া হয়। হাতিটিকে গাজীপুর সাফারি পার্কে পাঠানোর জন্য একটি ট্রাক ভাড়া করা হয়েছে। সাফারি পার্কের কর্মীরা পৌঁছালে তাদের কাছে সম্রাটকে হস্তান্তর করা হবে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ।
তবে সম্রাটের শরীরে থাকা ক্ষত নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেছে। হাতিটির মাহুত আবদুর রউফ দাবি করেন, জঙ্গলে প্রবেশের সময় লেবুগাছের কাঁটা লেগে ক্ষত হয়েছে।
অন্যদিকে লাঠিটিলা বিটের কর্মকর্তা মো. সাজন বলেন, হাতিকে দিয়ে কাজ করানোর সময় কথা না শুনলে মাহুতরা লোহার ধারালো ধরনের একটি বস্তু দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করেন। সম্রাটের শরীরেও এ ধরনের আঘাত করা হয়ে থাকতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা করেন।
এদিকে কমলগঞ্জ উপজেলার রাজকান্দি সংরক্ষিত বন থেকেও নিহারকলিকে নিজেদের হেফাজতে নিয়েছে বন বিভাগ। হাতিটির লালনপালনকারী ব্যক্তি এ সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন। সম্রাটের সঙ্গে নিহারকলিকেও গাজীপুর সাফারি পার্কে পাঠানোর কথা রয়েছে।
সিলেটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. আবদুর রহমান বলেন, হাতি দুটি ফেরত আনার জন্য প্রধান বন সংরক্ষককে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন। পরে প্রধান বন সংরক্ষকের নির্দেশনা পাওয়ার পর হাতি দুটি ফেরত নেওয়া হয়েছে। এগুলো পুনরায় গাজীপুর সাফারি পার্কে পাঠানো হবে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার পোলসার গ্রামে হাতি সম্রাটের পায়ের নিচে পিষ্ট হয়ে নজরুল ইসলাম নামের এক মাহুত মারা যান। কুড়িগ্রামের নজরুল ইসলাম ও পটুয়াখালীর হাসান নামের দুই ব্যক্তি কোটালীপাড়ার বিভিন্ন গ্রামে হাতিটি দিয়ে মানুষের কাছ থেকে টাকা তুলতেন। ওই ঘটনার পর বন বিভাগ সম্রাটকে উদ্ধার করে নিজেদের হেফাজতে নেয়। পরে পুনর্বাসনের জন্য তাকে গাজীপুর সাফারি পার্কে নেওয়া হয়।
অন্যদিকে ২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের ভুলতা এলাকা থেকে নিহারকলিকে উদ্ধার করা হয়। সেখানে এক ব্যক্তি হাতিটি দিয়ে রাস্তায় মানুষের কাছ থেকে টাকা তুলতেন। পাশাপাশি হাতিটিকে লালনপালনকারীদের লোকজন বেঁধে নির্যাতন করতেন- এমন একটি ভিডিওও তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
গত ৬ ও ৭ আগস্ট গাজীপুর সাফারি পার্কে পরপর দুটি হাতির মৃত্যু হয়। এতে পার্কে হাতির সংখ্যা কমে আটটিতে দাঁড়ায়। এর পরই সম্প্রতি সম্রাট ও নিহারকলিকে তাদের লালনপালনকারীদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, হাতি দুটি ফেরত নেওয়ার জন্য আগে থেকেই বন বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ে দৌড়ঝাঁপ করছিলেন লালনপালনকারীরা।
গত ১৯ আগস্ট ‘চাঁদা তোলা ও নির্যাতনের অভিযোগে উদ্ধার করা দুটি হাতি দেখভালকারীদের ফিরিয়ে দিল বন বিভাগ’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে একটি জাতীয় দৈনিক। এরপর হাতি দুটি ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
বন্য প্রাণিবিষয়ক সংগঠন পিপল ফর অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান রাকিবুল হকও বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর প্রশ্ন, অমীমাংসিত অপরাধকে ক্ষমা করে কোন অনুমোদন বা কোন ভিত্তিতে হাতি দুটি লালনপালনকারীদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। গোপনে ফিরিয়ে দেওয়ার পর আবার কেন ফেরত নেওয়া হচ্ছে, সেই সিদ্ধান্তের দায় কার এবং এ বিষয়ে বন বিভাগ কী ব্যবস্থা নেবে- এসব প্রশ্নেরও জবাব চান তিনি।
রাকিবুল হক আরও বলেন, সাফারি পার্কের অব্যবস্থাপনা ও শিকলবন্দী অবস্থায় এক দিনের ব্যবধানে দুটি হাতির মৃত্যু হয়েছে। সম্রাট ও নিহারকলিও প্রায় দুই বছর শিকলবন্দী ছিল। তাদের আবার শিকলবন্দী করা হবে কি না, নাকি সঠিক পুনর্বাসনের কোনো পরিকল্পনা রয়েছে—এ বিষয়েও স্পষ্টতা প্রয়োজন।
হাতি দুটি কোন শর্তে এবং কী প্রক্রিয়ায় লালনপালনকারীদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তা জানতে সংগঠনটির পক্ষ থেকে বন বিভাগের কাছে লিখিতভাবে তথ্য চাওয়া হয়েছিল বলেও জানান তিনি।
এ বিষয়ে প্রধান বন সংরক্ষক আমীর হোসাইন চৌধুরীর সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চল ঢাকার বন সংরক্ষক মো. ছানাউল্যা পাটওয়ারীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি দুবার পরে কথা বলবেন বলে জানান। পরে আর ফোন ধরেননি।
